০৮ মার্চ ২০২১
`

ক্রমেই `শ্বাস গ্রহণের অনুপযোগী’ হচ্ছে তেহরানের বাতাস

ক্রমেই `শ্বাস গ্রহণের অনুপযোগী’ হচ্ছে তেহরানের বাতাস - ছবি - সংগৃহীত

বায়ু দূষণের কারণে কয়েক সপ্তাহ থেকেই তেহরান ও ইরানের প্রধান প্রধান নগরীগুলোর বাতাস ক্রমেই ’শ্বাস গ্রহণের অনুপযোগী’ হয়ে উঠছে।

বায়ু দূষণের মাত্রা তদারক করা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেস্ক (একিউআই) জানিয়েছে, ইরানের রাজধানীতে সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে বায় দূষণের পরিমাণ আশঙ্কাজনক মাত্রায় বেড়ে ২০০ একিউআই ছাড়িয়েছে, বায়ুর গুণগত মাত্রায় যা ‘প্রচণ্ড দূষিত’।

সুবিশাল আলবুরজ পর্বতমালায় ঘিরে থাকা ব্যস্ত অর্থনৈতিক কেন্দ্র তেহরান পৌর পরিকল্পনাকারী, সরকারি সংস্থা ও পরিবেশবিদদের জন্য দুর্দশাগ্রস্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতকালে ‘তাপের বিপরীতমুখী’ আচরণের কারণে নগর আচ্ছাদন করে থাকা ঘন ধোঁয়ার স্তর আটকে থাকে। শুষ্ক আবহাওয়ার দীর্ঘ সময়সীমায় অবস্থা শুধুই শোচনীয় হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০১৮ সালে তেহরানকে বিশ্বের সর্বাধিক দূষিত শহরগুলোর তালিকাতে রেখেছিল। একই বছর বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বার্ষিক ১২ হাজার মৃত্যুর মধ্যে চার হাজার মৃত্যু তেহরানের বায়ু দূষণের কারণে ঘটে।

এই বছরের পরিস্থিতি আরো শোচনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা ও পরিবেশবিদদের দেয়া তথ্য অনুসারে শুধু তেহরানেই নয় বরং তাবরিজ, ইসফাহান ও মাশহাদসহ অন্যান্য প্রধান শহরের বায়ু দূষণের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

দূষিত বায়ুর প্রভাবের ফলাফল সম্পর্কে সাম্প্রতিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের বছরের তুলনায় এই বছর বায়ু দূষণের কারণে সৃষ্ট রোগে আরো বেশি মানুষের মৃত্যু হবে।

কোভিড-১৯ মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মাঝেই সরকারি সংস্থা ও চিকিৎসা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বায়ু দূষণ মাত্রার বেড়ে যাওয়া বড় এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করবে।

তেহরান এয়ার কোয়ালিটি কন্ট্রোল কোম্পানির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরানের বাসিন্দারা বিগত কয়েক মাসে যে পরিমাণ দূষিত বায়ুতে শ্বাস নিয়েছেন, তা আগের বছরের একই সময়ের দূষিত বায়ুর পরিমাণের চেয়ে বেশি।

পুরো ডিসেম্বর মাসে তেহরানের বাতাসে দূষণের মাত্রা ছিল ১৫১-২০০ একিউআই-এর ভেতর, যা‘অস্বাস্থ্যকর’। কখনো কখনো তা তিন শ’ একিউআই ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যা বায়ু দূষণের ‘বিপজ্জনক’ মাত্রা।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, যানবাহন, তেল শোধনাগার, জ্বালানি কেন্দ্র ও শিল্প-কারখানার ধোঁয়া ইরানের বায়ু দূষণের মূল কারণ।

সম্প্রতি দেশটির তেলমন্ত্রী বিজান নামদার জানগানেহের এক মন্তব্য চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। তিনি বলেন, জ্বালানির সংকটের কারণে জ্বালানি কেন্দ্র চালু রাখার জন্য পরিশোধিত ডিজেলের সাথে সাথে নিম্নমানের মাজুট জ্বালানি তেল ব্যবহার করা হবে।

জনসাধারণের উচ্চ মাত্রায় বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘এটি আদর্শ কোনো বিকল্প না। জ্বালানি কেন্দ্রের জন্য মূলত ইউরো-৭ ডিজেল ব্যবহার করা হয় কিন্তু সরবরাহ চালু রাখার জন্য মাজুটও ব্যবহার করা হচ্ছে।’

ইরানি পরিবেশ বিশেষজ্ঞ মাসুদ ফারামান্দ বলেন, কর্তৃপক্ষের উচিত ব্যক্তিগত বাহন ও জ্বালানি তেলের ব্যবহারসহ জরুরিভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

আনাদোলু এজেন্সির কাছে তিনি বলেন, ‘পরিবেশগত সকল মানের বিবেচনায় এটি জরুরি পরিস্থিতি। প্রতি বছরই এই সমস্যার আবর্তন হচ্ছে। এই বছর পরিস্থিতি ভয়াবহ মাত্রায় দাঁড়িয়েছে।’

৯০ লাখ বাসিন্দার তেহরান দিনের বেলা আরো বেশি ব্যস্ত ও জনাকীর্ণ হয়ে ওঠে। কাজের সন্ধানে কাছাকাছি শহর ও গ্রাম থেকে বিভিন্ন লোক এসে নগরীর ভিড় আরো বাড়িয়ে তোলে।

২০১৮ সালের গবেষণা অনুসারে, প্রতিনিয়ত অভিবাসনের ফলে জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়া, শিল্পায়নের দ্রুত বিস্তার ও উচ্চ মাত্রার যানজট দূষণের মাত্রাকে বাড়িয়ে ইরানের রাজধানী শহরের দূষণের মাত্রাকে বাড়িয়ে চলছে।

তেহরানের ডেপুটি গভর্নর আবদুল রেজা চেরাগআলীর আয়োজনে এক সভায় সমস্যা সমাধানের জন্য কঠোর ট্রাফিক আইন ও আংশিক লকডাউন দেয়ার বিষয়ে আলোচনা করা হয়।

অবশ্য কর্মকর্তারা বলছেন বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে নীতি নির্ধারনের প্রশ্নে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত মাসে ইরানের এয়ার পলিউশন ইমারজেন্সি কমিটি প্রস্তাব করেছিল তেহরানে সম্পূর্ণ দুই দিন লকডাউন দেয়ার। উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা এর বিরোধিতা করেন।

ইরানের ২০১৭ সালে প্রণীত বিশুদ্ধ বাতাস আইন প্রয়োগেও একই সমস্যা দেখা দেয়। পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, তেল মন্ত্রণালয়, জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও তেহরান নগর কর্তৃপক্ষের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয়ের অভাবে শেষ পর্যন্ত এই আইন প্রয়োগ করা যায়নি।

গবেষক ও পরিবেশকর্মী মোহাম্মদ জাফারি আনাদোলু এজেন্সির কাছে এক সাক্ষাতকারে বলেন, ‘আইন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে দূষণের মাত্রা জরুরি অবস্থার শ্রেণিতে পড়েছে। এই অবস্থায় সম্পৃক্ত সকল প্রতিষ্ঠানেরই জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।’

স্বাস্থ্যগত সমস্যার সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় তহবিলের ওপরও আঘাত হানছে বায়ু দূষণ ।

তেহরান এয়ার কোয়ালিটি কোম্পানির প্রধান হোসাইন শাহীদজাদেহ ২০১৮ সালের বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে বলেন, তেহরানের বায়ু দূষণের কারণে বছরে দুই দশমিক ছয় বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হচ্ছে। দৈনিক হিসেবে যার পরিমাণ সাত মিলিয়ন ডলার।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও পরিবেশবিদদের সতর্কতা সত্ত্বেও, আইনগত ব্যবস্থা প্রয়োগে সরকারি কর্তৃপক্ষের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতা ও মতবিরোধ কাজ করছে।

ইরানি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা একটি ঘোষণায় কার্ডোভাসকুলার ও রেসপেরেটরি স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে থাকা, বয়স্ক ও শিশুদের ঘরের বাইরে বের না হওয়ার আহ্বান জানান।

সম্প্রতি তেহরান, কাজভিন, ইসফাহান ও অন্যান্য শহরে রেসপেরেটরি ও কার্ডিয়াক সংক্রান্ত জটিলতায় হাসপাতালে রোগীর পরিমাণ বাড়ছে বলে সংবাদ প্রকাশ করা হয়।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার উল্লেখযোগ্য মাত্রায় হ্রাস পাচ্ছে, তখনই কর্মকর্তারা সতর্কতা করছেন দেশটিতে ইতোমধ্যেই যুক্তরাজ্যে সংক্রমিত ধরনের ভাইরাস ছড়িয়েছে।

বুধবার, ইরানের অভিভাবক পরিষদের প্রধান আয়াতুল্লাহ জান্নাতি বায়ু দূষণ বেড়ে যাওয়াকে ‘উদ্বেগজনক পরিস্থিতি’ আখ্যা দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জরুরি ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান।

তেহরান সিটি কাউন্সিলের এনভায়রনমেন্টাল কমিটির প্রধান আরাশ হোসাইনি আইন পরিষদের সদস্যদের কাছে আহ্বান জানান দূষণের উৎসগুলোকে শনাক্ত করে তার নিয়ন্ত্রণে আইন এবং আইন ভাঙার কারণে শাস্তি নির্ধারণ করার আহ্বান জানান।

জ্বালানি কেন্দ্রে মাজুট ব্যবহার বন্ধ করতে বিশুদ্ধ বাতাস আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের আহ্বান দিন দিন বাড়ছে। ইরানের দূষণ সমস্যায় একেও প্রধান এক কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সূত্র : ইয়েনি শাফাক



আরো সংবাদ