২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
বৈরুত বিস্ফোরণ

জাহাজ ভর্তি ভয়াবহ বিস্ফোরক বৈরুতে পৌঁছল যেভাবে


লেবানন সরকার বৈরুত বন্দরে ভয়াবহ বিস্ফোরণের জন্য বন্দরের গুদামঘরে ২,৭৫০ টন অ্যামোয়িাম নাইট্রেটের মজুতে আগুন ধরে যাওয়াকে দোষারোপ করেছে।

এত বিশাল পরিমাণ ভয়ানক দাহ্য পদার্থ ছয় বছরের ওপর শহর কেন্দ্রের এত কাছে কোন নিরাপদ ব্যবস্থা না নিয়ে এভাবে গুদামঘরে কীভাবে রেখে দেয়া হল তা নিয়ে দেশটির জনগণ ক্ষোভে ফুঁসছে। তারা এটা বিশ্বাস করতে পারছে না।

যে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে বন্দর নগরীর বিস্তীর্ণ জনপদ তার উৎসের নাম সরকার করছে না, কিন্তু এটা জানা যাচ্ছে যে মলডোভিয়ান পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ এমভি রোসাস ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে ঠিক ঐ পরিমাণ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট নিয়ে বৈরুতে নোঙর করেছিল।

রাশিয়ান মালিকানাধীন জাহাজটি জর্জিয়ার বাটুমি থেকে যাত্রা শুরু করে ২০১৩-র সেপ্টেম্বর মাসে। সেটির গন্তব্য ছিল মোজাম্বিকের বেইরা।

জাহাজটিতে ছিল ২,৭৫০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট। এই রাসায়নিক সাধারণত আসে ছোট গোল টুকরোর আকারে। কৃষিকাজে সারের জন্য এই রাসায়নিক ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। তবে জ্বালানি তেলের সঙ্গে মিশিয়ে এটা দিয়ে বিস্ফোরক তৈরি করা যায়, যা খনিতে বিস্ফোরণের কাজে এবং নির্মাণ শিল্পে ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে।

পূর্ব ভূমধ্যসাগর দিয়ে যাবার সময় রোসাস জাহাজটিতে কিছু "কারিগরি ত্রুটি" ধরা পড়ে এবং জাহাজটি বৈরুত বন্দরে নোঙর করতে বাধ্য হয়। এই তথ্য এসেছে জাহাজ শিল্পের সাথে জড়িত ২০১৫ সালের একটি প্রতিবেদনে, যেটি শিপিংঅ্যারেস্টেডডটকম নামে একটি নিউজলেটারে প্রকাশিত হয়েছিল। ঐ প্রতিবেদন লিখেছিলেন জাহাজের কর্মীদের পক্ষের লেবানীজ আইনজীবীরা।

বৈরুত বন্দরের কর্মকর্তারা রোসাস জাহাজটি পরিদর্শন করেন এবং সেটিকে "সমুদ্র যাত্রার জন্য নিষিদ্ধ" ঘোষণা করেন বলে জানাচ্ছেন আইনজীবীরা। জাহাজের বেশিরভাগ কর্মীকে তাদের দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়। পাঠানো হয়নি শুধু জাহাজের রুশ ক্যাপ্টেন বরিস প্রোকোশেফ এবং আরও তিনজনকে, যারা ইউক্রেনিয়ান বলে বলা হয়।

প্রোকোশেফ বৃহস্পতিবার রয়টার্স বার্তা সংস্থাকে বলেন যে, রোসাস-এ লিকেজের কিছু সমস্যা হচ্ছিল কিন্তু জাহাজটির সমুদ্র যাত্রার জন্য কোন সমস্যা ছিল না।

তিনি আরও বলেন, জাহাজটির মালিক জাহাজটিকে বৈরুতে পাঠান সেখান থেকে ভারী যন্ত্রপাতির বাড়তি কিছু মাল জাহাজে তোলার জন্য। উদ্দেশ্য ছিল দেশটির অর্থনৈতিক অসুবিধার মধ্যে তাদের সহায়তা করা।

কিন্তু জাহাজের কর্মীরা ওইসব ভারী যন্ত্রপাতি নিরাপদে জাহাজে তুলতে পারেনি। এরপর জাহাজের মালিক বন্দরের যে ভাড়া তা যখন দিতে ব্যর্থ হন, তখন লেবাননের কর্তৃপক্ষ জাহাজটি সেখানে জব্দ করে সেটি বসিয়ে দেয় বলে তিনি জানান।

এর অল্প কিছুদিন পর, রোসাস-এর মালিক জাহাজটি সেখানে পরিত্যাগ করেন। আইনজীবীরা বলছেন মালবাহী জাহাজটি যারা চার্টার বা ভাড়া করেছিলেন এবং জাহাজটি নিয়ে যারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন তারা সব পক্ষই জাহাজটি নিয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। পাওনাদারদের দিক থেকেও নানাধরনের আইনী দাবিদাওয়া ছিল।

ইতোমধ্যে, জাহাজের ভেতর তখনও যেসব নাবিক ও কর্মী ছিলেন তাদের রসদ ও খাবার দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল।

আইনজীবীরা বলেছেন তারা বৈরুতের জরুরিকালীন বিচারকের কাছে আবেদন করেন, যাতে ঐ ক্রু-দের নিজেদের দেশে ফিরে যাবার অনুমতি দেয়া হয়। আইনজীবীরা বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলেন "ওই জাহাজে যে রাসায়নিক রয়েছে তা খুবই 'বিপজ্জনক' প্রকৃতির এবং ক্রুরা জাহাজে ঝুঁকির মধ্যে থাকছেন"।

বিচারক শেষ পর্যন্ত ক্রুদের জাহাজ থেকে নামার অনুমতি দেন এবং ২০১৪ সালে বন্দর কর্তৃপক্ষ জাহাজ থেকে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের চালান "১২ নম্বর ওয়্যারহাউস"এ স্থানান্তরিত করেন। ওই গুদামঘরটি ছিল বিশাল শস্য গুদামগুলোর পাশে। আইনজীবীরা জানাচ্ছেন ওই রাসায়নিকের চালান "হয় নিলামে তোলার অথবা যথাযথভাবে নষ্ট করে ফেলার অপেক্ষায় ছিল"।

"ওই রাসায়নিক ছিল চরম বিস্ফোরক পদার্থ। সে কারণেই আমরা যখন জাহাজে ছিলাম সেগুলো জাহাজের মধ্যেই রাখা ছিল...ওই অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট খুবই উচ্চ ঘনত্বের ছিল," বলছেন প্রোকোশেফ।

তিনি আরও বলেছেন, "এই বিস্ফোরণে যারা হতাহত হয়েছে তাদের জন্য আমি দুঃখিত। কিন্তু স্থানীয় কর্তৃপক্ষের, দায়ী লেবানীজদের এর জন্য শাস্তি হওয়া উচিত। তারা এই মাল নিয়ে কোনরকম ব্যবস্থা নেয়নি, মোটেও মাথা ঘামায়নি।"

বন্দরের জেনারেল ম্যানেজার হাসান কোরায়েতেম এবং লেবাননের শুল্ক বিভাগের মহাপরিচালক, বদরি দাহের, দুজনেই বুধবার বলেন যে তারা এবং অন্যান্য কর্মকর্তারা বিচারবিভাগকে সেখানে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট মজুত রাখার বিপদ সম্পর্কে বারবার সতর্ক করে দিয়েছেন এবং সেখান থেকে এগুলো সরিয়ে ফেলার প্রয়োজনীয়তার কথা বারবার বলেছেন।

অনলাইনে যেসব নথিপত্র পোস্ট করা হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে শুল্ক কর্মকর্তারা বৈরুতের জরুরিকালীন বিচারকের (জাজ অফ আর্জেন্ট ম্যাটারস্) কাছে চিঠি লিখে কীভাবে ওই চালান বিক্রি করে দেয়া যায় বা নষ্ট করে ফেলা যায় সে বিষয়ে নির্দেশ চেয়েছেন। ২০১৪ থেকে ২০১৭-র মধ্যে তারা অন্তত ছয়বার এ ব্যাপারে চিঠি লিখেছেন।

স্থানীয় টিভি চ্যানেল ওটিভি-কে কোরায়েতেম বলেছেন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিভাগও সতর্ক বার্তা দিয়ে চিঠি লিখেছিল। গণপূর্ত মন্ত্রী মিশেল নাজির, যিনি এ বছরের শুরুতে দায়িত্ব নেন, তিনি আল জাজিরা টিভিকে বলেছেন এ বছরের জুলাইয়ের শেষ দিকে তিনি প্রথম বন্দরে এই অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের উপস্থিতির কথা জানতে পারেন। তিনি সোমবার এ ব্যাপারে কোরায়েতেমের সাথে এ নিয়ে কথা বলেন।

এর পরের দিনই, মঙ্গলবার অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের ওই গুদামে আগুন থেকে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এই বিস্ফোরণে অন্তত ১৩৭ জন এখন পর্যন্ত মারা গেছেন, আহতের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার। আরও বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট মিশেল আউন বলেছেন, রোসাস মালবাহী জাহাজের জব্দ করা কার্গো মোকাবেলায় এই ব্যর্থতা "অগ্রহণযোগ্য" এবং "দোষী ব্যক্তিদের ও যাদের গাফিলতি এজন্য দায়ী তাদের বিচারের এবং তাদের সর্বোচ্চ কঠোর শাস্তির" প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন।

তদন্ত কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওই অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট গুদামজাত করার এবং তা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে যেসব কর্মকর্তা ছিলেন তাদের গৃহবন্দী করার নির্দেশ দিয়েছে দেশটির সরকার। বিবিসি


আরো সংবাদ

নতুন বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সামনে আনলো ইরান (১৮৬৭০)ছাত্রাবাসে গণধর্ষণ : সেই রাতের ঘটনা আদালতকে জানালেন ভুক্তভোগী গৃহবধূ (১১২২১)ক্রিকেট ছেড়ে সাকিব এখন পাইকারি আড়তদার! (১০৩৭২)নর্দমা পরিষ্কার করতে গিয়ে ধরা পড়ল দৈত্যাকার ইঁদুর! (ভিডিও) (৮০৯৮)করোনার দ্বিতীয় ঢেউ : বাড়বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি (৭৮৮১)আজারবাইজানের পাশে দাঁড়ালেন এরদোগান, আর্মেনিয়াকে হুমকি (৭০৭০)যে কারণে আবারো ভয়াবহ যুদ্ধে জড়ালো আর্মেনিয়া-আজারবাইজান (৬১১৬)ড. কামাল ও আসিফ নজরুল ঢাবি এলাকায় অবা‌ঞ্ছিত : সন‌জিত (৫৫৪১)সিসিবিরোধী অব্যাহত বিক্ষোভে উত্তাল মিসর (৫৪৫৪)এবার মথুরা! ঈদগাহ মসজিদ সরিয়ে জমি ফেরানোর দাবিতে আদালতে ‘‌ভগবান শ্রীকৃষ্ণ’‌ (৫২৭২)