১০ এপ্রিল ২০২০

বন্ধের উপক্রম মক্কা-মদীনায় বাংলা কমিউনিটি স্কুল

মক্কা-মদীনায় বাংলা কমিউনিটি স্কুল আর্থিক সংকটে বন্ধের উপক্রম - নয়া দিগন্ত

সৌদি আরবের মক্কা-মদীনাস্থ বাঙ্গালী কমিনিউনিটি স্কুল আর্থিক সংকটে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এরই মধ্যে মক্কার স্কুলটির কার্যক্রম একবার বন্ধ করে দিয়ে পুনরায় তিনটি ভাড়া বাসায় ঘরোয়াভাবে চালু রাখা হয়েছে।

সৌদি সরকারের নতুন করারোপের ফলে প্রবাসীদের দেশে ফিরে আসার মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় সেখানে শিক্ষার্থী কমে আসায় স্কুলগুলোর আয় হ্রাস পেয়ে এই পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক সহযোগিতা না পেলে দুটি স্কুল বন্ধ করে দিতে হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সৌদি আরববে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ বলেন, মক্কা ও মদীনার বাংলা স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রম যে কোন মূল্যে অব্যাহত রাখার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কড়া নির্দেশনা রয়েছে। সে অনুযায়ী দূতাবাসের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।

গত সপ্তাহে ওমরাহ পালন করতে যাওয়া বাংলাদেশের কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে মক্কাস্থ বাংলাদেশ হজ মিশনে মতবিনিময়কালে তিনি আরো জানান, সৌদি আরবে অবস্থিত ৯টি স্কুলের মধ্যে বর্তমানে মক্কার বাংলা স্কুলটি সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। স্কুলটির পাঠদানের অনুমতি থাকলেও স্কুলটিকে এখনো সরকারি আর্থিক সহযোগিতা দেয়া যায়নি। সৌদি আরবে বাংলা স্কুলগুলোর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে প্রবাসী কল্যাণ তহবিল থেকে ১০ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে।

মক্কায় বাংলা কমিউনিটি স্কুলের প্রধান পরিচালক ও পৃষ্ঠপোষক আব্দুল জব্বার জানান, মক্কার বাংলা কমিউনিটি স্কুলটির ছাত্র সংখ্যা ২০১৮ সালেও এক হাজার ১০০জন ছিল। ভাড়া করা ভবনে অত্যন্ত সুন্দরভাবেই পাঠ কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল। কিন্তু সৌদি সরকার কর্তৃক প্রবাসীদের ওপর নানাধরণের করারোপ হওয়ায় অনেক প্রবাসী পরিবার সৌদি আরব ত্যাগ করায় ছাত্র সংখ্যা কমে আসে। যারা পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন তারাও সহযোগিতা দিতে অপারগ হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় আর্থিক সংকটের কারণে স্কুলটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়ে আবার নতুনকরে বাসাভাড়িতে চালু করতে হয়। অনেক শিক্ষককে বিদায় করে দিতে হয়। আর ছাত্র সংখ্যাও প্রায় দুই তৃতীয়াংশ কমে গেছে।

তিনি আরো জানান, বর্তমানে মক্কার তিনটি পাহাড়ী এলাকার বাসায় ঘরোয়াবাবে ৩০০শিক্ষার্থী নিয়ে স্কুলটি পরিচালিত হচ্ছে। স্কুলটির পাঠদানের অনুমোদন রয়েছে এবং গত বছরও অস্টম ও ৫ম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় স্কুলটির শিক্ষার্থীরা জেদ্দায় গিয়ে পরীক্ষা দিয়েছে। পরীক্ষার ফলাফলও ভালো।

তিনি বলেন, মক্কায় সৌদি সরকারের আইন অনুযায়ী স্কুলের জন্য নিজস্ব জমি কেনার কোন সুযোগ নেই। তবে সৌদি আরবে স্থানীয় কোন স্কুলের সঙ্গে যৌথভাবে স্কুল পরিচালনার অনুমোদন রয়েছে। কিন্তু সেক্ষেত্রে ওই স্কুলকে তাদের ভবন ব্যবহারের জন্য বছরে ভাড়া পরিশোধ করতে হবে। সেই ভাড়ার অর্থ স্কুলের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি দিয়ে কোনভাবেই পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তবে স্কুলটি কেন্দ্র অনুমোদনসহ সরকারের আর্থিক সহযোগিতা পাওয়ার জন্য সকল রকমের প্রচেষ্টা ও সরকারের সংর্শ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি জানান।

তিনি সফরত সাংবাদিকদের স্কুলটির কার্যক্রম ঘুরে দেখান। তাতে দেখা যায়, দুর্গম পাহাড়ী এলাকায় তিনটি ভাড়া বাসায় ড্রয়িং রুমে পর্যায়ক্রমে ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠদান করা হচ্ছিল। যা কোনভাবেই স্কুলের পাঠদানের উপযোগি নয়।

আব্দুল জব্বার জানান, স্কুলের শিক্ষক শিক্ষার্থদের বেতন এবং বাসা ভাড়া পরিশোধের টাকাও শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি থেকে আসছে না। এই অবস্থায় সরকারের আর্থিক সহায়তা না পেলে স্কুলের কার্যক্রম পরিচালনা আরো কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যেই সৌদি আরবের অন্য স্কুলের সঙ্গে যৌথভাবে স্কুল পরিচালনার ব্যাপারে সৌদি সরকারের অনুমোদন পাওয়া গেছে। এখন বাংলাদেশ সরকার স্কুলের ভবন ব্যবহারের ভাড়াসহ প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা নিশ্চিত করলে মক্কার স্কুলটির কার্যক্রম আগের মতোই সুন্দরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। গত প্রায় দেড় যুগ ধরে তিনি মক্কার বাংলা কমিউনিটি স্কুলটির কার্যক্রম পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, স্কুলটি পরিচালনায় সবসময় দলমত নির্বিশেষে সকলের সহযোগিতা পেয়েছি। তবে স্কুলটি টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক সহযোগিতা বড় ফ্যাক্টর।

পবিত্র মদীনায় অবস্থিত বাংলা কমিউনিটি স্কুলটির নাম মদীনা বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ। স্কুলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মূসা আব্দুল জলিল জানান, এই স্কুলটিতে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী ছিল। কিন্তু বর্তমানে তা কমে প্রায় ১০০জনে ঠেকেছে। বসবাসের ক্ষেত্রে ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া প্রবাসীদের দেশে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই শিক্ষার্থী কমে গেছে বলে তিনি জানান। মদীনার শোরান রোডস্থ আরাওধাবীতে সৌদি আরবের একটি আরবী স্কুলেই বাংলা স্কুলটির কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে বিকালের শিফটে। এজন্য স্কুলটির কর্তৃপক্ষকে বছরে দেড় লাখ সৌদি রিয়াল পরিশোধ করতে হচ্ছে। গত বছর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এই ভাড়ার অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু
এই বছর সেই ভাড়া পরিশোধ করা না গেলে স্কুল পরিচালনাকারিদের পক্ষে এই অর্থ পরিশোধকরা দু:সাধ্য বলে তিনি জানান। তিনি সরকারের আর্থিক সহযোগিতা অব্যাগত রাখার আহবান জানিয়ে বলেন, অন্যথায় স্কুলটির কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকবেনা।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, সৌদি আরবের স্থানীয় স্কুলেই অত্যন্ত মনোরম পরিবেশে প্রশস্ত ও পরিপার্টি শ্রেণি কক্ষে বাংলাদেশী স্কুলটির পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। স্কুলটির ছাদে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলাসহ বিনোদনের সকল ব্যবস্থা রয়েছে। স্কুলটিতে প্লে থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্র ছাত্রী রয়েছে। সৌদি আরবের নিয়ম অনুযায়ী ছাত্র ও ছাত্রীদের আলাদাভাবে পাঠদানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সংকটের কারণে একই সঙ্গে একাধিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বসিয়ে পাঠদান করতেও দেখা গেছে। ৯জন শিক্ষকের অধিকাংশই নারী।

মুসা আব্দুল জলিল জানান, মদীনার বাংলা স্কুলটির পরীক্ষা কেন্দ্রেরও অনুমোদন রয়েছে। ২০১৯ সালে অস্টম শ্রেণি সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৩ জন। ২০০৯ সাল থেকে স্কুলটির কার্র্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে।

প্রসঙ্গত, সৌদি আরবে সর্বমোট ৯টি বাংলাদেশী কমিউনিটি স্কুল রয়েছে। সেগুলো হলো- রিয়াদ বাংলা মিডিয়াম ও ইংলিশ ভার্সন স্কুল, জেদ্দা বাংলা ও ইংলিশ ভার্সন স্কুল, দাম্মাম ইংলিশ ভার্ষন স্কুল, আলকাছিম বুরাইদা বাংলা স্কুল, তাবুক বাংলা স্কুল, মক্কা বাংলা স্কুল ও মদীনা বাংলা স্কুল। রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ জানান, মক্কা মদীনার বাইরে বাংলাদেশী স্কুলগুলোর অবস্থা তুলনামুলক ভালো। প্রায় সবগুলো স্কুলকেই প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বরাদ্দকৃত টাকার অনুদান দেয়া হয়েছে। মক্কা-মদীনার স্কুল দুটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য স্কুল পরিচালনাকারিদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয়ার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।


আরো সংবাদ