০৫ আগস্ট ২০২০

যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবিলা : ইরানের ব্যাপক প্রস্তুতি

যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবিলা : ইরানের ব্যাপক প্রস্তুতি - ছবি : সংগ্রহ
24tkt

মানববিহীন একটি ইরানি নৌকা বড় বড় ঢেউ ঢেলে ঝড়ো গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এরপর মার্কিন রণতরীতে ধাক্কা দিয়ে কমলা রঙের একটি আগুনের বল ছুড়ে মারল। কুণ্ডলী পাকিয়ে সেটি থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে।

২০১৫ সালে দেশটির বিপ্লবী গার্ডস বাহিনীর ব্যাপক নৌযুদ্ধ মহড়ার অংশ ছিল এই দৃশ্য। নকল মার্কিন রণতরীতে হামলা করে যুদ্ধের মহড়া দিয়েছিল ইরানি বাহিনী। ভিডিওতে দেখা গেছে, কয়েক ডজন স্পিডবোট ও জাহাজ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হচ্ছে। হেলিকপ্টারও জড়িত এতে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে কয়েক ঘণ্টা ধরে এই মহড়ার ভিডিও প্রচার করা হয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, নৌযুদ্ধের এই কৌশল ও দক্ষতা আঞ্চলিক ছায়া বাহিনীর কাছেও ছড়িয়ে দিতে পারে ইরান। গত রোববার আরব আমিরাতের উপকূলে চারটি তেল ট্যাংকারে হামলায় ইরানের ওপর দোষ চাপাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ইরানি কর্তৃপক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ভিত্তি তৈরি করতে তাদের শত্রুরা এ হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। তবে ছায়া বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয়ার বিষয়টি নিষ্পত্তি করেনি ইরান। দেশটি হুঁশিয়ারি করে বলেছে, তার আঞ্চলিক মিত্রদের কাছে অস্ত্র রয়েছে। ইরানি স্বার্থ হুমকিতে পড়লে তারা শত্রুদের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে সক্ষম। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা দিনে দিনে বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত সামরিক শক্তি মোতায়েন করেছে। যার মধ্যে বিমানবাহী রণতরী, বি-৫২ বোমারু বিমান ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। মার্কিন বাহিনী ও আঞ্চলিক স্বার্থের ওপর ইরানি হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে নিজের শক্তি প্রদর্শন করতেই এমন সিদ্ধান্ত বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।

বছরখানেক আগে ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানি তেল রফতানি সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করা হয়েছে, যাতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমর্থন রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই দুই দেশের দাবি, বিশ্ববাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে তারা উত্তোলন বাড়িয়ে দেবে।

গত মাসে বিপ্লবী গার্ডস বাহিনীকে বিদেশী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ দিকে ইরান যদি তেল রফতানি করতে না পারে তবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছে বিপ্লøবী গার্ডস। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেলের প্রবাহ এই প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হয়। ইরানি হুমকি অনুভূত হওয়ায় চলতি সপ্তাহে বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস ও ইরলিবের কন্স্যুলেট থেকে অগুরুত্বপূর্ণ কর্মচারীদের সরিয়ে নেয়া শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্যাংকার হামলায় যদি ইরান কিংবা তার ছায়াবাহিনী জড়িত থাকে, তবে তারা কেন এগুলো সাগরে ডুবিয়ে দেয়নি কিংবা কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি প্রশ্নের জবাবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটা হচ্ছে সতর্কবার্তা।

মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ও সিআইএর সাবেক সিনিয়র কর্মকর্তা নরম্যান রুল বলেন, পদক্ষেপগুলো এমনভাবে পরিচালনা করে ইরান যে তা বোঝা গেলেও যুক্তরাষ্ট্র সেই পরিসরে জবাব দেয়ার ন্যায্যতা নির্ধারণ করতে পারছে না। অর্থাৎ ইরান এমনভাবে পদক্ষেপ নেয় যে তা সহজেই অস্বীকার করতে পারে কিন্তু দেশটির ওপর দোষ চাপানোও সম্ভব। তিনি বলেন, তেল ট্যাংকার হামলার ঘটনায় ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার হয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে। তেলের দাম বৃদ্ধি সাময়িক হলেও তা চীন ও পশ্চিম ইউরোপের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। ইরানের বিশ্বাস এতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়াতে বাধ্য হবে চীন ও ইউরোপ, যাতে ভবিষ্যতে এমন হামলা থেকে বাঁচতে ইরানকে ছাড় দেয়া হয়। ট্যাংকার হামলার দুই দিন পরে বুধবার সৌদি আরমাকো কোম্পানির দু’টি পাম্পিং স্টেশনে সশস্ত্র ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম চার শতাংশ বেড়ে গেছে।
আরব আমিরাত বলছে, তেল ট্যাংকারে নাশকতামূলক হামলার ঘটনায় একটি তদন্ত চলছে। ইরানের আচরণের কারণে আঞ্চলিক সঙ্কট কমিয়ে আনতে দেশটি চেষ্টা করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলার জন্য ইরানকে নির্দেশদাতা হিসেবে দোষী করছে সৌদি আরব। ইরানঘেঁষা হুতি বিদ্রোহীরা ওই হামলার দায় স্বীকার করেছে। গত চার বছর ধরে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে আসছে হুতিরা।

সামরিক ও গোয়েন্দা বিষয়ক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, আমিরাত উপকূলে ট্যাংকার হামলায় যে কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে তা আধুনিক না। একদল ডুবুরির বসানো ভাসমান কিংবা চৌম্বুক মাইনের মাধ্যমে জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
বিপ্লবের আগে ও পরে ইরানি নৌবাহিনীতে ১৮ বছর কাজ করা সামরিক বিশ্লেষক হোসেইন আরিয়ান বলেন, ইরানের অভিজ্ঞ নৌশক্তি রয়েছে, যারা এ ধরনের হামলা চালাতে সক্ষম। কিংবা স্থানীয় ছায়া বাহিনীর মাধ্যমেও তারা এমনটা ঘটাতে পারে।
তিনি বলেন, আমরা এ ধরনের হামলার ব্যাপক মহড়া দিয়েছি। এটা স্বাভাবিক হামলা। লিমপিট মাইন বা জাহাজের বিস্ফোরক লাগিয়েও এমন অভিযান চালানো সম্ভব। কাজেই ইরানি নৌবাহিনীর এমন দক্ষতা রয়েছে। এ ছাড়া নিজস্ব কিংবা গুরুত্বপূর্ণ লোক পাঠিয়ে স্থানীয়দের সাহায্যে তারা এমন কাজ করতে পারেন। এটা হচ্ছে সফট টার্গেট।

এ ছাড়া মানববিহীন নৌকা দিয়েও জাহাজে হামলা চালাতে পারে ইরান, চার বছর আগে যেটার মহড়া দিয়েছে তারা। ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের এক কর্মকর্তা বলছেন, মিত্র সামরিক বাহিনীর কাছে নিজেদের মানববিহীন নৌ ও ড্রোন অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিচ্ছে ইরান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছিুক ওই কর্মকর্তা বলেন, লেবাননের হিজবুল্লাহ আন্দোলনের অর্ধশত গেরিলা ইরান থেকে প্রশিক্ষিত। এ ছাড়া হুতি বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিচ্ছে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। সৌদি নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্র জানায়, হাউছি যোদ্ধারা সাগরে নৌকা থেকে ড্রোন হামলা চালাতে পারে। তবে ইয়েমেন যুদ্ধে কোনো ভূমিকা রাখছে না বলে জানিয়েছে ইরান।

পারস্য উপসাগরে ইরান ও মার্কিন উত্তেজনা নতুন কিছু না। জাহাজ রুটে ইরানের বিরুদ্ধে মাইন ব্যবহারের অভিযোগ তোলার পর আশির দশকের শেষ দিকে মার্কিন ও ইরানি নৌবাহিনীর সঙ্ঘাত হয়েছে। এর পর থেকে উপসাগরে নিয়মিত সামরিক মহড়া ও অভিযানের মাধ্যমে নিজেদের নৌশক্তি প্রদর্শন করে আসছে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। ২০০৪ ও ২০০৭ সালে ব্রিটিশ সেনা সদস্যদের আটক করেছে বিপ্লবী গার্ডস। পরে ২০১৬ সালে ১০ মার্কিন নাবিক ইরানি বাহিনীর হাতে আটক হয়েছে। যদিও পরে তাদের সবাইকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
সূত্র : রয়টার্স


আরো সংবাদ

হিজবুল্লাহর জালে আটকা পড়েছে ইসরাইল! (৩৬১৭৯)আবারো তাইওয়ান দখলের ঘোষণা দিল চীন (১৪৮৮১)মরুভূমির ‘এয়ারলাইনের গোরস্তানে’ ফেলা হচ্ছে বহু বিমান (১২২৫৯)হামলায় মার্কিন রণতরীর ডামি ধ্বংস না হওয়ার কারণ জানালো ইরান (৮৩১৯)সিনহা নিহতের ঘটনায় পুলিশ ও ডিজিএফআই’র পরস্পরবিরোধী ভাষ্য (৭২৫৯)সহকর্মীর এলোপাথাড়ি গুলিতে ২ বিএসএফ সেনা নিহত, সীমান্তে উত্তেজনা (৬৯০২)চীনের বিরুদ্ধে গোর্খা সৈন্যদের ব্যবহার করছে ভারত : এখন কী করবে নেপাল? (৫০৩৬)বিবাহিত জীবনের বেশিরভাগ সময় জেলে এবং পালিয়ে থাকতে হয়েছে বাবুকে : ফখরুল (৪৭১১)করোনায় আক্রান্ত এমপিকে হেলিকপ্টারে ঢাকায় আনা হয়েছে (৪৪৩৩)তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকবে : আবহাওয়া অধিদপ্তর (৪৩৫৩)