১০ ডিসেম্বর ২০২২, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

ধর্ম ও আইনের দৃষ্টিতে মা, স্ত্রী ও মেয়ের সম্পত্তি বণ্টন, উইল ও মোহরানা

ধর্ম ও আইনের দৃষ্টিতে মা, স্ত্রী ও মেয়ের সম্পত্তি বণ্টন, উইল ও মোহরানা - ছবি : সংগৃহীত

আর আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই জালেম। (সূরা মায়েদা, আয়াত : ৪৫)

ইসলাম পূর্বকালে আরব ও অনারব জাতিগুলোর মধ্যে দুর্বল শ্রেণি, ইয়াতিম বালক-বালিকা ও অবলা নারী জুলুম-নির্যাতনের শিকার ছিল। সম্পত্তিতে তারা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হতো। বর্তমানেও অনেকেই নানা কৌশলে সম্পদের অধিকার থেকে নারীদের ঠকাতে সুযোগ খোঁজেন। অথচ ধর্ম বা আইন অনুযায়ী মা, স্ত্রী ও মেয়ে এই তিন শ্রেণির নারীদের কোনো অবস্থাতেই সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা বা অংশ অস্বীকার বা নষ্ট করার অনুমতি কাউকে দেয়া হয়নি।

পবিত্র কুরআনে ৪র্থ সূরা আন-নিসায় আল্লাহ নারীদের সম্পত্তির অধিকার বিষয়ে বলেন,

মা-বাবা ও আত্মীয় স্বজনরা যে ধন-সম্পত্তি রেখে গেছে তাতে ছেলেদের অংশ রয়েছে আর মেয়েদেও অংশ রয়েছে উত্তরাধিকারগত সম্পদ কম বা বেশি যাই হোক না কেন তাতে নারীর অংশ নির্দিষ্ট। (সূরা নিসা, আয়াত-০৭)

নারীদের সম্পত্তিতে অংশ পাওয়ার বিষয়ে কয়েকটি সূরায় আলোচনা করা হয়েছে। সূরা নিসার ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

‘আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন, এক ছেলের জন্য দুই মেয়ের অংশের সমপরিমাণ। তবে যদি দু’য়ের অধিক মেয়ে হয়, তাহলে তারা পাবে তিন ভাগের দু’ভাগ। আর যদি একজন মেয়ে হয় তখন সে পাবে অর্ধেক। মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে, মৃতের মা-বাবা উভয়ের প্রত্যেকে পাবে ছয় ভাগের এক ভাগ। আর যদি মৃতের সন্তান না থাকে এবং তার ওয়ারিশ হয় তার মা-বাবা তখন তার মা পাবে তিন ভাগের এক ভাগ। আর যদি মৃতের ভাই-বোন থাকে তবে তার মায়ের জন্য ছয় ভাগের এক ভাগ। এ বন্টন হবে মৃত ব্যক্তির ওসিয়ত পালন অথবা ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের মা-বাবা ও তোমাদের সন্তানদের মধ্য থেকে তোমাদের উপকারে কে বেশি কাছের তা তোমরা জানো না। আল্লাহর তরফে এ বন্টন নির্ধারিত। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছুর বিষয়ে খবর রাখেন, তার চেয়ে জ্ঞানী আর কেউ নেই।’

এখানে শরিয়তের নীতি হচ্ছে, মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে প্রথমে শরিয়ত অনুযায়ী তার কাফন-দাফনের ব্যয় নির্বাহ করা হবে। এতে অপব্যয় ও কৃপণতা উভয়টি নিষিদ্ধ। এরপর তার ঋণ পরিশোধ করা হবে। যদি ঋণ সম্পত্তির সমপরিমাণ কিংবা তারও বেশি হয়, তবে কেউ ওয়ারিশি স্বত্ব পাবে না এবং কোনো ওসিয়ত কার্যকর হবে না। পক্ষান্তরে যদি ঋণ পরিশোধের পর সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকে কিংবা ঋণ একেবারেই না থাকে, তবে মৃত কোনো ওসিয়ত করে থাকলে এবং তা অন্যায়মূলক ওসিয়ত না হলে অবশিষ্ট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ থেকে তা কার্যকর হবে। যদি মৃত ব্যক্তি তার সমস্ত সম্পত্তি ওসিয়ত করে যান তবুও এক-তৃতীয়াংশের অধিক ওসিয়ত কার্যকর হবে না।

মোটকথা ঋণ পরিশোধের পর এক-তৃতীয়াংশ সম্পত্তিতে ওসিয়ত কার্যকর করে অবশিষ্ট সম্পত্তি শরিয়ত সম্মত ওয়ারিশদের মধ্যে বন্টন করতে হবে। ওসিয়ত না থাকলে ঋণ পরিশোধের পর সমস্ত সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে বন্টন করতে হবে। বন্টনের ব্যাপারে হাদিসে এসেছে, মিকদাম ইবন মাদিকারব বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, আল্লাহ তোমাদেরকে সবচেয়ে নিকটতমের ব্যাপারে নির্দেশ দিচ্ছেন, তারপর পরের নিকটতম ব্যক্তি। [মুসনাদে আহমদ: ৪/১৩১]

ওসিয়ত বা উইল বিষয়ে ধর্মীয় ও আইনগত নিয়ম হলো, অসিয়তের মাধ্যমে কোনো ওয়ারিশকে বঞ্চিত করা অথবা কারো অংশে কম-বেশি করা কিংবা কেবল ওয়ারিশদের ক্ষতি করার জন্য বলে দেয়া ওমুকের কাছ থেকে এত ঋণ নিয়েছি, অথচ তিনি কিছুই নেননি এ পন্থায় কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করা নিষেধ ও মহাপাপ। এ রকম ওসিয়তও বাতিল বলে গণ্য হবে। যদি কেউ উইল করে কাউকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়, তাহলে আপত্তি জানানোর অধিকার রয়েছে। যার বা যাদের অনুকূলে ওই উইল করা হয়েছে, অধিকার বুঝে নিতে উইলকারীর মৃত্যুর পরে প্রোবেট (প্রোবেট হলো একটি আইনি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একটি আদালত একটি উইলকে মৃত উইলকারীর শেষ উইল হিসেবে বৈধ করে) নিতে হয়। আইন অনুযায়ী প্রোবেট নেয়ার সময়ে নির্দিষ্ট এলাকার বা জুরিসডিকশনের অন্তর্ভূক্ত আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়। এর জন্য সকল ভাই বোনদের বা বাকি সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীদের আইনি নোটিশ পাঠানো বাধ্যতামূলক। ওই সময়ে বঞ্চিত মেয়ে বা ব্যক্তি ওই নির্দিষ্ট আদালতে নির্দিষ্ট সময়ে হাজির হয়ে উইলটির বিরুদ্ধে আপত্তি দাখিল করতে পারেন। জানাতে পারেন নিজের যুক্তি।

এছাড়াও নাবালিকা হয় বা সাবালিকা, যত দিন না বিয়ে হচ্ছে, সাধারণত তত দিন মেয়েরা বাবার কাছ থেকে খোরপোষ পাওয়ার অধিকারী।

বাবা-মায়ের সম্পত্তিতে মেয়েদের অংশ :

বাবা ও স্বামীর সম্পত্তিতে মেয়েদের অধিকার যারা নষ্ট বা অস্বীকার করে তারা ধর্ম ও আইন মতে অপরাধী। মুসলিম সম্পত্তি আইন অনুযায়ী একজন মেয়ে ৩ নিয়মে মৃতের সম্পদ পেয়ে থাকে। যদি একজন মেয়ে হয় তবে দু’ ভাগের একভাগ (১/২) পাবে। যদি একাধিক মেয়ে হয় তবে সবাইকে তিন ভাগের দু’ভাগ (২/৩) দেয়া হবে। যদি মৃত ব্যক্তির ছেলে মেয়ে উভয়েই থাকে তবে ছেলে যে পরিমাণ পাবে মেয়ে তার অর্ধেক পাবে।

একজন বিবাহিতা নারীর বিয়ের পরেও বাবার বাড়িতে পূর্ণ অধিকার থাকে। শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে আসা, বিবাহ বিচ্ছেদ, বিধবা সকলেই বাবার সম্পত্তির সম্পূর্ণ হকদার। টাকা-পয়সা, জমি-বাড়ি, শেয়ার অর্থাৎ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি যাই থাকুক না কেন, একক সন্তান হলে এবং মায়ের অবর্তমানে পুরোটাই দাবি করতে পারেন মেয়ে।

বিয়ের পরে স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রীর অংশ :

বিবাহ শব্দের মানে ‘বিশেষ ভাবে বহন করা’। ম্যারেজ রেজিস্টারে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে সিলমোহর পড়ার মুহূর্তেই পাকা হয়ে যায় স্ত্রী হিসেবে মেয়েটির আর্থিক অধিকার। তাই বিয়ের পর স্ত্রীর ভরণপোষণের পূর্ণ দায়িত্ব স্বামীর।

এছাড়া স্ত্রী দু’ভাবে তার মৃত স্বামীর সম্পত্তি পেয়ে থাকেন। বিধবা স্ত্রী কোনোভাবে তার স্বামীর সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে না। মৃত স্বামীর কোনো সন্তান বা তাদের ছেলের সন্তান থাকলে স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তির ১/৮ অংশ পাবেন। যদি মৃত স্বামীর কোনো সন্তান বা ছেলের সন্তান কেউই না থাকলে তবে স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তির ১/৪ অংশ পাবেন। স্ত্রী একাধিক হলেও সবাই মিলে ১/৪ অংশ সমান ভাগেই পাবে।

অর্থাৎ যদি স্বামী মারা যান এবং কোনো সন্তান না থাকে, তবে ঋণ পরিশোধ ও ওসিয়ত কার্যকর করার পর স্ত্রী মোট সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ পাবে। আর যদি মৃত স্বামীর সন্তান থাকে, এ স্ত্রীর গর্ভজাত হোক কিংবা অন্য স্ত্রীর, তবে ঋণ পরিশোধ ও ওসিয়ত কার্যকর করার পর স্ত্রী আট ভাগের এক ভাগ পাবে।

স্ত্রী একাধিক হলেও উপরিউক্ত বিবরণ অনুযায়ী এক অংশ সকল স্ত্রীর মধ্যে সমহারে বন্টন করা হবে। অর্থাৎ প্রত্যেক স্ত্রীই এক-চতুর্থাংশ কিংবা এক-অষ্টমাংশ পাবে না, বরং সবাই মিলে এক-চতুর্থাংশ কিংবা এক-অষ্টমাংশে অংশীদার হবে। স্ত্রীর অংশ দেয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকবে, তা অন্য ওয়ারিশদের মধ্যে বন্টন করা হবে।

তবে যদি স্ত্রীর মোহর পরিশোধ করা না হয়ে থাকে, তবে অন্য ঋণের মতই প্রথমে মোট পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে মাহর পরিশোধ করার পর ওয়ারিশদের মধ্যে বন্টন করা হবে। মোহারানা দেয়ার পর স্ত্রী ওয়ারিশি স্বত্বে অংশীদার হবার কারণে এ অংশও নেবে। মোহর পরিশোধ করার পর যদি মৃত স্বামীর সম্পত্তি অবশিষ্ট না থাকে, তবে অন্য ঋণের মত সম্পূর্ণ সম্পত্তি মোহর-বাবদ স্ত্রীকে সমর্পণ করা হবে এবং কোনো ওয়ারিশই অংশ পাবে না।

মায়ের অংশ : এ বিষয়ে ওপরে উল্লেখিত আয়াতে বলা হয়েছে,

‘মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে, মৃতের মা-বাবা উভয়ের প্রত্যেকে পাবে ছয় ভাগের এক ভাগ। আর যদি মৃতের সন্তান না থাকে এবং তার ওয়ারিশ হয় তার মা-বাবা তখন তার মা পাবে তিন ভাগের এক ভাগ। আর যদি মৃতের ভাই-বোন থাকে তবে তার মায়ের জন্য ছয় ভাগের এক ভাগ।’

যদি মৃত ব্যক্তির সন্তানাদি না থাকলে (পোতা-পুতীরাও সন্তানাদির মধ্যেই শামিল) মা পাবেন এক তৃতীয়াংশ। অবশিষ্ট দু’ভাগ ‘আসাবাহ’ হিসেবে বাবা পাবেন। আর যদি বাবা-মার সাথে মৃত পুরুষের স্ত্রী বা মৃত নারীর স্বামীও জীবিত থাকে, তবে প্রাধান্য প্রাপ্ত উক্তি অনুযায়ী স্ত্রী বা স্বামীর অংশ বের করে নেয়ার পর অবশিষ্ট মাল থেকে মায়ের হবে এক তৃতীয়াংশ এবং বাকি যা থাকে তা হবে বাবার।

যদি বাবা-মার সাথে মৃত ব্যক্তির ভাই-বোন জীবিত থাকে তাতে তারা সহোদর অর্থাৎ, এক মাতৃগর্ভজাত হোক অথবা বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় ভাই-বোন হোক। যদিও এই ভাই-বোন মৃত ব্যক্তির বাবার উপস্থিতিতে উত্তরাধিকারী হওয়ার অধিকার রাখে না, তবুও তারা মায়ের জন্য ‘হাজবু নুকসান’ (তার অংশ হ্রাসকরণের) কারণ হবে। অর্থাৎ তারা একাধিক হলে মায়ের এক তৃতীয়াংশকে এক ষষ্ঠাংশে পরিবর্তন করে দেবে। অবশিষ্ট সমস্ত মাল (ছ’ভাগের পাঁচভাগ) বাবার অংশে চলে যাবে। তবে শর্ত হলো আর কোনো ওয়ারিশ যেন না থাকে। দু’জন ভাইয়ের বিধানও দু’য়ের অধিক ভাইয়ের বিধানের মতোই। অর্থাৎ, ভাই বা বোন যদি কেবল একজন হয়, তাহলে মায়ের এক তৃতীয়াংশ সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে, তাতে কোনো পরিবর্তন সূচিত হবে না।

উপরিউক্ত নিয়ম পালনের বিষয়ে ১৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন- এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। কেউ আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য করলে আল্লাহ তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নদীসমূহ। জান্নাতিরা সেখানে স্থায়ী হবে। আর এটা তাদের মহা সাফল্য।

এ নিয়ম লঙ্ঘন বা অস্বীকার করার শাস্তি বিষয়ে ১৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা তথা ওয়ারিশি নীতির ব্যাপারে যে বিধান দেয়া হয়েছে তা লঙ্ঘন করবে তার জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। কেননা সে আল্লাহর হুকুমকে অমান্য করেছে, আল্লাহর বিধানের বিরোধিতা করেছে। তখনই কেউ এরূপ করতে পারে যখন সে আল্লাহর নির্দেশের ওপর অসন্তুষ্ট থাকে। এজন্য আল্লাহ তাকে চিরস্থায়ী লাঞ্ছনা দ্বারা শাস্তি দেবেন।

 

 

 

 

 

 

 


আরো সংবাদ


premium cement