১৬ জানুয়ারি ২০২২, ০২ মাঘ ১৪২৮, ১২ জমাদিউস সানি ১৪৪৩
`
মেজর সিনহাকে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে গুলি করা হয়

‘সিফাতকে হেফাজতে না নিলে তিনিও শেষ হয়ে যেতেন’

আদালতে আসামি এস আই শাহহাজান
মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা-আর্মড পুলিশ-মেজর সিনহা
-

আদালতের প্রশ্নের জবাবে চাঞ্চল্যকর মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার অন্যতম আসামি আর্মড পুলিশের এস আই শাহজাহান আলী বলেছেন, ‘দশ সেকেন্ডের মধ্যে মেজর সিনহাকে গুলি করা হয়েছে কিছু বোঝার মতো অবস্থা ছিল না।’

মঙ্গলবার মামলার দিনের কার্যক্রমের শুরুতে পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম আদালতের কাছে আসামি আর্মড পুলিশের তিন সদস্য যথাক্রমে শাহজাহান আলী, রাজিব ও আবদুল্লাহর ৩৪২ ধারায় মৌখিক বক্তব্য নেয়ার অনুরোধ করেন। পরে আদালত তাদের কাছে জানতে চান ‘আপনারা মেজর সিনহাকে স্যালুট দিয়ে হাতে ইশারা করে চলে যেতে বলেছেন। ঘটনাস্থল তো এপিবিএন চেকপোস্ট। ওখানে লিয়াকত কেন গেল এবং আপনারা বাধা দিলেন না কেন?

জবাবে আসামি শাহাজাহান আলী উপরোক্ত বক্তব্য দিয়ে আরো বলেন, ‘মেজর সিনহার সাথী সিফাতকে আমরা হেফাজতে না নিলে তিনিও শেষ হয়ে যেতেন। লিয়াকত স্যার আমাদের কাছে কিছুই জিজ্ঞেস করেননি। ঘটনার তাৎক্ষণিকতায় কিছু বুঝে ওঠার মতো অবস্থা আমাদের ছিল না।’

এ সময় লিয়াকত ও প্রদীপ একসাথে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এই মামলার প্রধান আসামি যথাক্রমে বহিস্কৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ অন্য আসামিদের আদালতে নিজেদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে মৌখিক ও লিখিতভাবে দেয়া বক্তব্যকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখান করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌশলী ও পিপি অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম।

তিনি আদালতে বলেন, ‘মেজর সিনহা নিহত হওয়ার পর টেকনাফ থানায় দায়ের করা পুলিশের মামলায়ও উল্লেখ আছে যে সিনহা পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন। ওই মামলার (মামলা নং ৬৯৫/২০) বাদি ছিলেন এস আই নন্দ দুলাল রক্ষিত (পরে আসামি)।

আসামি প্রদীপ-লিয়াকত সাক্ষীদের ইয়াবা ব্যবসায়ি হিসেবে চিহ্নিত করে দেয়া লিখিত বক্তব্যকে প্রত্যাখান করে পিপি আরো বলেন, মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে উপস্থাপিত সাক্ষীদের মধ্যে আইনশৃঙখলা বাহিনীর কর্মকর্তা, মসজিদের ইমাম, কোরআনের হাফেজসহ ২০ থেকে ২২জন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী আদালতে পরিস্কারভাবে জবানবন্দী দিয়েছেন। এসব সাক্ষীরা কী ইয়াবা ব্যবসায়ি ? অবশ্যই নয়।

তিনি বলেন, সাদা কাগজে সই নেয়ার লিয়াকত আলীর দাবি মিথ্যা কেন না ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী গ্রহণের কাগজটি সাদা নয়, এটি একটি ছাপানো প্রেসক্রাইব ফরম। তাই আসামীদের কাছ থেকে সাদা কাগজে সই নেয়ার প্রশ্নই অবান্তর। আদালতের বিচারক মঙ্গলবার ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ধারার বিধানমতে আসামিদের মৌখিক ও লিখিত বক্তব্যগুলো আমলে নিয়ে পর্যালোচনাপূর্বক আসামিদের নানা প্রশ্ন করেন। পরে আসামিরা এসব বক্তব্যের আদালত কর্তৃক টাইপ কপিতে স্বাক্ষর করেন। আদালতের বিচারক কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল মঙ্গলবারও আসামিদের দেয়া বক্তব্য নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। জবাবে আসামিরা সকলেই নির্দোষ দাবি করেন। আদালত এ সময় আসামিদের বক্তব্যগুলো পর্যালোচনা করেন।

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ফরিদুল আলম জানান, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাব-১৫-এর তৎকালীন জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার খায়রুল ইসলামকে নজিরবিহীন (পাঁচ দিনব্যাপী) আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জেরা করেছেন। এ মামলায় এখন পর্যন্ত ৬৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে দীর্ঘ পাঁচদিন ধরে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জেরা করেন। আজ সকাল সাড়ে ৯টায় ওসি প্রদীপসহ মামলার ১৫ আসামিকে কড়া নিরাপত্তায় আদালতে নিয়ে আসা হয়।

উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। হত্যার পাঁচদিনের মাথায় ৫ আগস্ট সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস টেকনাফ থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশসহ ৯ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চার মাসের বেশি সময় ধরে চলা তদন্ত শেষে গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর ৮৩ জন সাক্ষীসহ আলোচিত মামলাটির অভিযোগপত্র দাখিল করেন র‌্যাব-১৫-এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম। ১৫ জনকে আসামি করে দায়ের করা অভিযোগপত্রে সিনহা হত্যাকাণ্ডকে একটি ‘পরিকল্পিত ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।


আরো সংবাদ


premium cement