২৮ অক্টোবর ২০২০

কারাগারে চিকিৎসক সঙ্কট

কারাগারে চিকিৎসক সঙ্কট - ছবি : সংগৃহীত

গাজীপুরের কাশিমপুরে একমাত্র মহিলা কারাগারসহ দেশের ৬৮ কারাগারে ডাক্তার সঙ্কট মারাত্মক আকার ধারণ করায় অধিকাংশ বন্দী সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অপর দিকে প্রতিদিন কারাগারে যেসব বন্দী নতুন করে যাচ্ছেন, চিকিৎসক না থাকায় তাদেরও শারীরিক অবস্থা কারা কর্মকর্তারা জানতে পারছেন না। পরবর্তীকালে ওইসব বন্দীর মধ্য থেকেই কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেয়ার পথে অথবা পরে মারা যাচ্ছেন।

‘অনাকাক্সিক্ষত’ এসব ঘটনার পর কোনো কোনো কারাগারের জেলার-সুপারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আসামি করে বন্দীর স্বজনরা মামলা করছেন। এতে মামলার আসামি হিসেবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জেলও খাটতে হচ্ছে। তাই অসুস্থ বন্দীদের নিয়ে কারা কর্মকর্তাদের থাকতে হচ্ছে ‘বন্দী মৃত্যু নামক আতঙ্কে’।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনা বিভাগের যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারসহ মোট ১০টি কারাগারে বর্তমানে আনুমানিক ৭ হাজার বন্দী অবস্থান করছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এসব কারাগারে নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন বয়সী বন্দীদের চিকিৎসা করার জন্য একজনও ডাক্তার নেই। যার কারণে আটক বন্দীদের স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় কোনো রকমে কর্তৃপক্ষকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। এর মধ্যে ঘটে যাচ্ছে অসুস্থ বন্দীর মৃত্যুর ঘটনাও।

সম্প্রতি খুলনা বিভাগের মেহেরপুর জেলা কারাগারে একজন বন্দী মৃত্যুর ঘটনায় ওই কারাগারের জেলারসহ ৪-৫ জন কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীকে মামলার আসামি হয়ে কারাগারে যেতে হয়েছে বলে ঊর্ধ্বতন কারা কর্মকর্তারা নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় খুলনা বিভাগের ডিআইজি প্রিজন্স মো: ছগীর মিয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, আমার বিভাগে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারসহ ১০টি কারাগারে ৭ হাজারের মতো বন্দী অবস্থান করছে। কিন্তু এ ১০টি কারাগারের একটিতেও কোনো ডাক্তার নেই। তাহলে কিভাবে এসব কারাগারে অসুস্থ হওয়া বন্দীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে-জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে কোনো রকমে চিকিৎসা দেয়া হয়। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার ১০ কারাগারে ৭ হাজারের মতো বন্দী আছে। কিন্তু প্রতিদিন নতুন করে যেসব আসামির কারাগারে আগমন ঘটছে তাদের শারীরিক অবস্থা তখন কেমন থাকে, তাদের মধ্যে কারো পাবলিক ইনজুরি আছে নাকি পুলিশ অ্যাসল্ট আছে, নাকি সত্যিই ওই আসামি অসুস্থ তা আমাদের বোঝার কোনো উপায় নেই। এ নিয়ে আমাদের সার্বক্ষণিক টেনশনে থাকতে হয়। দুই মাস আগে মেহেরপুর কারাগারে একজন বন্দী অসুস্থ অবস্থায় মারা যায়। এই ঘটনার পর মারা যাওয়া বন্দীর স্বজনরা জেলার আখতার হোসেনসহ আরো সংশ্লিষ্ট ৪-৫ জনের নামে মামলা দেন। ওই মামলায় তারা জেলও খেটেছেন। আমরা এখন কারাগারে আপডাউন আসামিদের নিয়েও টেনশনে আছি।’ কারাগারে যত দ্রুত ডাক্তার নিয়োগ হবে ততই কারাগারসহ সবার ভালো হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এ দিকে গত ১৪ জানুয়ারি দেশের কারাগারগুলোতে কতজন চিকিৎসক প্রয়োজন রয়েছে তা জানাতে কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সাথে কারা চিকিৎসক নিয়োগের বিধিমালা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে তা-ও জানাতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হাইকোর্ট থেকে নির্দেশনা দেয়ার পর গত ২০ জানুয়ারি সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে ১২ জেলা কারাগারে সহকারী সার্জনদের সংযুক্ত করে পাঠানো হয়েছে বলে দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার কারা অধিদফতরের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, বর্তমানে ৬৮ কারাগারে মোট ৮-৯ জন ডাক্তার আছেন। হাইকোর্ট থেকে নির্দেশনা দেয়ার পর সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে ১২টি জেলা কারাগারে সহকারী সার্জনকে সংযুক্ত করে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি। এর মধ্যে গাজীপুর সদর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কড্ডা (বাসন) ইউনিয়নের সহকারী সার্জন উম্মে সালমা পিয়াকে কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার ১, পাবনা বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিক্যাল অফিসার ডাক্তার মো: জাহাঙ্গীর হোসেনকে পাবনা জেলা কারাগার, কিশোরগঞ্জ বাজিতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিক্যাল অফিসার ডা: সঞ্জয় দাশকে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার, রাজবাড়ী সদর মূলঘর ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন/ইকুইভালেন্ট ডা: মো. গিয়াস উদ্দিন খানকে রাজবাড়ী জেলা কারাগার, দিনাজপুর ফুলবাড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সহকারী সার্জন ডা: সঞ্জয় কুমার গুপ্তকে দিনাজপুর জেলা কারাগার, গাইবান্ধা কঞ্চিপাড়া ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মেডিক্যাল অফিসার ডা: মো. কামরুল হাসানকে গাইবান্ধা জেলা কারাগারে, ময়মনসিংহ ফুলপুর বানিহালা ইউনিয়ন সেন্টারের মেডিক্যাল অফিসার ডাক্তার প্রবীর পালকে ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগার, মাদারীপুর সদর বাহাদুরপর ইউনিয়ন সেন্টারের সহকারী সার্জন ডা: মো. রিয়াদ মাহমুদকে মাদারীপুর জেলা কারাগার, টাঙ্গাইল দেলদুয়ার দেওজান (পাথরাইল) ইউনিয়নের মেডিক্যাল অফিসার ডাক্তার মো: আবিবুর রহমানকে টাঙ্গাইল জেলা কারাগার, ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালের ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল অফিসার ডাক্তার মো: জয়দেব কুমারকে ফরিদপুর জেলা কারাগার, মানিকগঞ্জ ঝিটকা হরিরামপুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মেডিক্যাল অফিসার ডা: অজয় কুমার বোসকে মানিকগঞ্জ জেলা কারাগার এবং নেত্রকোনা দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার চণ্ডীগড় ইউনিয়ন সেন্টারের অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন ডা: মো: রকিবুল হাসানকে নেত্রকোনা জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। জানা গেছে, যশোর, ফেনী ও কক্সবাজার কেন্দ্রীয়/জেলা কারাগারে এখনো ডাক্তার যোগ দেননি।

গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগের ৬৮ কারাগারে ৪০ হাজার ৯৪৪ জন বন্দীর ধারণক্ষমতার জায়গায় ৮৭ হাজার ২৬৬ জন বন্দী অবস্থান করছিলেন। এর মধ্যে নতুন বন্দীর সংখ্যা হচ্ছে ১ হাজার ৬৭০ জন। অপর দিকে জামিন ও মুক্তির অপেক্ষাধীন বন্দী ২ হাজার ৪২৩ জন।


আরো সংবাদ