২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২ আশ্বিন ১৪২৯, ৩০ সফর ১৪৪৪ হিজরি
`

মাদরাসার জনবল কাঠামোতে বৈষম্য : শিক্ষক অসন্তোষ

-

মাদরাসার বিদ্যমান জনবল কাঠামো ও এমপিওকরণের বিভিন্ন বৈষম্যের কারণে শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষের দানা বাঁধছে। বিশেষ করে মাদরাসার জনবল কাঠামো ও এমপিওকরণের নীতিমালায় নানা অসঙ্গতির কারণে ইতোমধ্যে শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়াও শুরু হয়েছে। জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০১৮-এর সংশোধনী পুনর্বিবেচনা ও ৫০ শতাংশ হারে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি অনতিবিলম্বে কার্যকর করার দাবি উঠেছে মাদরাসার জেনারেল টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে। সম্প্রতি এসব দাবি সম্বলিত একটি চিঠি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরানা শিক্ষা বিভাগের সচিব বরাবরে জমা দেয়া হয়েছে।
বৈষম্যের শিকার বিভিন্ন মাদরাসার শিক্ষকরা জানান, মাদরাসার জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০১৮ এবং ২৩ নভেম্বর ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত সংশোধনীর বিভিন্ন ধারা, উপধারার ব্যাখ্যা অস্পষ্ট এবং স্কুল/কলেজের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালার সাথে বেশ কিছু বৈষম্য তৈরি হয়েছে। একই যোগত্যা, অভিজ্ঞতা ও একই নিয়োগ পদ্ধতিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও মাদরাসায় কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদেরকে পদে পদে বৈষম্যের শিকার হতে হয়, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ ছাড়া স্কুল-কলেজের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০১৮-এর সাথে মাদরাসার জনবল কঠামো ও এমপিও নীতিমালারও বেশ ফারাক তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, স্কুল-কলেজের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০১৮-তে শিক্ষায় অর্জিত ডিগ্রি বা বিএড স্কেল উচ্চতর গ্রেড হিসেবে বিবেচিত হবে না এবং বিএড স্কেল বাদেই সহকারী শিক্ষকরা চাকরিজীবনে দু’টি উচ্চতর গ্রেড পাবেন। এই বিষয়ে স্পষ্টভাবে বলা থাকলেও মাদরাসার জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০১৮-তে এবং সংশোধনীতে এ বিষয়ে পরিষ্কার কোনো ব্যাখ্যা নেই। এ ছাড়াও স্কুলে সিনিয়র শিক্ষক পদ সৃষ্টি করা হলেও মাদরাসায় এই পদ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
এ ছাড়া স্কুল-কলেজের নীতিমালায় উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তিতে কোনো শিক্ষকের বেতন কমলে বা ধাপ না মিললে পরবর্তী উচ্চ ধাপে বেতন নির্ধারণের নির্দেশনা দেয়া আছে; কিন্তু মাদরাসার নীতিমালায় এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেয়া নেই। স্কুল-কলেজের নীতিমালায় ৫০ শতাংশ হারে প্রভাষকদের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক/সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ০.৫ বা তার বেশি হলে পরবর্তী পূর্ণ সংখ্যা বিবেচনা করার নির্দেশনা দেয়া আছে; কিন্তু মাদরাসার নীতিমালায় স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই।
এ ছাড়া স্কুল-কলেজের নীতিমালায় চাকরিকাল ১৬ বছর পূর্তিতে সব প্রভাষককে জ্যেষ্ঠ প্রভাষক/সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির সুযোগ রাখা হয়েছে; কিন্তু মাদরাসার নীতিমালায় ১৬ বছর পূর্তিতে প্রভাষকদের পদোন্নতির সুযোগ দেয়া হয়নি।


স্কুল-কলেজের নীতিমালায় উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ ডিগ্রি কলেজে উন্নিত হলে জ্যেষ্ঠ প্রভাষক পদ সহকারী অধ্যাপক পদে পরিবর্তন হবে বলা থাকলেও মাদরাসার নীতিমালায় আলিম মাদরাসা ফাজিল মাদরাসায় উন্নীত হলে জ্যেষ্ঠ প্রভাষক পদ সহকারী অধ্যাপক পদে পরিবর্তন হবে কি না এ রকম কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। এ ছাড়াও এবতেদায়ি প্রধান নিয়োগেও প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতায় রয়েছে গরমিল। যে কারণে এই পদে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।
স্কুল-কলেজের নীতিমালায় উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের অধ্যক্ষ ও ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ পদে জ্যেষ্ঠ প্রভাষকদের আবেদনের সুযোগ থাকলেও মাদরাসার নীতিমালায় আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ ও ফাজিল মাদরাসার উপাধ্যক্ষ পদে জ্যেষ্ঠ প্রভাষকদের আবেদনের সুযোগ রাখা হয়নি। পাশাপাশি এই নীতিমালায় প্রভাষকদের বঞ্চিত করে এবতেদায়ি প্রধান, দাখিল মাদরাসার সহ-সুপার ও সুপারকে উপাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষ পদে নিয়োগের সুযোগ রেখে একটি লজ্জাজনক অধ্যায়ের জন্ম দেয়া হয়েছে, যা বিশ্বের কোনো দেশে আছে বলে জানা যায়নি। এই নীতিমালায় মাদরাসার জেনারেল (নন অ্যারাবিক) শিক্ষকদেরকেও প্রশাসনিক পদে নিয়োগের সুযোগ দেয়া হয়নি।
উল্লেখ্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক ২০১০ সালে জারিকৃত পরিপত্রে সহকারী শিক্ষককে (নন অ্যারাবিক) দাখিল মাদরাসার সহ-সুপার ও সুপার পদে এবং প্রভাষক/সহকারী অধ্যাপককে (নন অ্যারাবিক) আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ ও ফাজিল মাদরাসার উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেয়ার বিধান রাখা হয়েছিল, যা বর্তমান সরকারের একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হিসেবে সুধী মহলে প্রশংসিত হয়। কিন্তু ২০১৩ সালে জারিকৃত সংশোধিত পরিপত্রে প্রশাসনিক (সহ-সুপার, সুপার, উপাধ্যক্ষ, অধ্যক্ষ) পদের জন্য আরবি বিষয়গুলোয় শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়, যার মাধ্যমে দাখিল, আলিম, ফাজিল, কামিল সব পর্যায়ের মাদরাসার প্রশাসনিক (সহ-সুপার, সুপার, উপাধ্যক্ষ, অধ্যক্ষ) পদে জেনারেল (নন অ্যারাবিক) শিক্ষক নিয়োগের বিধান স্থগিত হয়ে যায়।
অপর দিকে কলেজে নতুন এমপিও নীতিমালা অনুসারে প্রভাষকদেরকে সহকারী অধ্যাপক/জ্যেষ্ঠ প্রভাষক পদে পদোন্নতি দেয়া হলেও মাদরাসায় এখনো সহকারী অধ্যাপক/জ্যেষ্ঠ প্রভাষক পদে পদোন্নতি চালু হয়নি। তাই ৫০ শতাংশ হারে সহকারী অধ্যাপক/ জ্যেষ্ঠ প্রভাষক পদে পদোন্নতি অনতিবিলম্বে কার্যকর করার দাবি জানানো হয়েছে।
মাদরাসা জেনারেল টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি জহির উদ্দিন হাওলাদার নয়া দিগন্তকে জানান, আমরা কোনো বৈষম্য চাই না। তাই আমরা প্রস্তাব করেছি, শিক্ষায় অর্জিত ডিগ্রি বা বিএড স্কেল উচ্চতর গ্রেড হিসেবে বিবেচনা না করে বরং বিএড স্কেল বাদেই সহকারী শিক্ষকদেরকে চাকরিজীবনে দু’টি উচ্চতর গ্রেড প্রদান করতে হবে। একই সাথে সহকারী শিক্ষকদেরকে পদোন্নতির নিমিত্তে সিনিয়র শিক্ষক পদে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করেছি। এ ছাড়া চাকরিকাল ১৬ বছর পূর্তিতে সব প্রভাষককে জ্যেষ্ঠ প্রভাষক/ সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির সুযোগ রাখার পক্ষেও দাবি জানাই।
অপর দিকে মাদরাসা জেনারেল টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন জানান, আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ ও ফাজিল মাদরাসার উপাধ্যক্ষ পদে জ্যেষ্ঠ প্রভাষকদের আবেদনের সুযোগ রাখা এখন সমায়ের দাবি। একই সাথে এবতেদায়ি প্রধান, দাখিল মাদরাসার সহ-সুপার ও সুপারকে উপাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষ পদে নিয়োগের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বাতিল করার দাবিও এখন বেশ জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে। তিনি বলেন, জ্যেষ্ঠ প্রভাষক পদ বিলুপ্ত করে সব প্রভাষককে পর্যায়ক্রমে সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদে পদোন্নতির সুযোগ রাখার বিষয়েও আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি।

 

 


আরো সংবাদ


premium cement