১৪ আগস্ট ২০২২
`
ঘাটতি পূরণে নতুন উদ্যোগ

মসলা আমদানিতে ব্যয় ৭ হাজার কোটি টাকা

৫০ ধরনের মসলার ব্যবহার, বেশির ভাগই বিদেশনির্ভর
-

ঈদ এলেই গরম হয় দেশের মসলার বাজার। আগামী ১০ জুলাই ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে আগের মতোই বাড়ছে বিভিন্ন মসলার দাম। দেশে বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার মসলার বাজার রয়েছে। ৫০ ধরনের মসলার ব্যবহার হয়। এর মধ্যে ৭-৮ ধরনের মসলাজাতীয় ফসল দেশে উৎপাদিত হয়। বাকিগুলো আমদানি করতে হয় বিভিন্ন দেশ থেকে। আমদানিনির্ভরতা কমাতে ইতঃপূর্বে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় মসলাজাতীয় ফসল উৎপাদন বাড়াতে কাজ করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরসহ (ডিএই) সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। সর্বশেষ জুনে শেষ হলো ‘কৃষক পর্যায়ে উন্নতমানের ডাল, তেল ও মসলা বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ’ (তৃতীয় পর্যায়) প্রকল্পের কাজ। কিন্তু দেশের মসলাবাজার এখনো বিদেশনির্ভরতায় আটকে আছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) মসলা গবেষণা কেন্দ্রের তথ্যমতে, দেশে ৫৮.৫০ লাখ টন মসলাজাতীয় ফসলের চাহিদা রয়েছে। উৎপাদন হয় ৪৪ লাখ ৯৬ হাজার টন। ঘাটতি রয়েছে ১৪ লাখ ৯০ হাজার টন। ঘাটতির এই মসলা আমদানি করতে হয় ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে। এতে খরচ হয় ৬ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা।
দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার্য মসলার নাম পেঁয়াজ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর এবং বারি’র তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ৩৬ লাখ টন। বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৩২ লাখ টন। তবে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, পেঁয়াজ উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ২৩ লাখ টন। চাহিদা প্রায় ২৬ লাখ টনের মতো। বিবিএস-এর তথ্যের সাথে বারি এবং ডিএই’র তথ্যের গরমিল প্রসঙ্গে বাংলাদেশে মসলাজাতীয় ফসলের গবষেণা জোরদারকরণ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) ড. শৈলন্দ্র নাথ মজমুদার বলেন, ২৬ লাখ টন হলো ব্যবহার্য চাহিদা। এই পরিমাণ পেঁয়াজ জোগান দিতে হলে ৩৫-৩৬ লাখ টন উৎপাদন করতে হয়। কারণ পেঁয়াজ গড়ে ২৫ শতাংশ পোস্ট হার্ভেস্ট লস হয়। ১ মণ পেঁয়াজ ঘরে রাখলে ৬ মাস পর ৩০ কেজি টিকে (পচে যায়, শুকিয়ে যায়)। একই অবস্থা রসুন, আদাসহ আরো কিছু মসলার ক্ষেত্রেও।
বাংলাদেশে মসলাজাতীয় ফসলের গবষেণা জোরদারকরণ প্রকল্প সূত্র জানায়, দেশে দৈনন্দিন পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধে মসলা ফসলের গুরুত্ব অপরিসীম। ২০২০-২১ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৫৮ লাখ ৫০ হাজার টন মসলার চাহিদা রয়েছে। উৎপাদন ৪৪ লাখ ৯০ হাজার টনের মতো। প্রায় ১৪ লাখ টন ঘাটতি রয়েছে, যা আমদানি করে মেটাতে হয়। এই আমদানিতে বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা চলে যায়। আর আমদানি করতে না পারলে মুনাফালোভীদের কারসাজিতে বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। ভোক্তারা বিপাকে পড়েন।
সূত্র জানায়, দেশে পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে চার বছর মেয়াদি রোডম্যাপ প্রণয়ন এবং সে অনুযায়ী চাষাবাদ চলছে। গতবার প্রথমবারের মতো গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় ১৮ হাজার কৃষককে বীজ ও সার প্রণোদনা হিসেবে দিয়েছিল। এবারও সেই প্রণোদনা দিয়ে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশে মসলাজাতীয় ফসলের গবেষণা জোরদারকরণ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) ড. শৈলন্দ্র নাথ মজমুদার বলেন, গত বছর এবং চলমান বছরে পেঁয়াজের ঘাটতি অনেকটাই কমে এসেছে। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ৩ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে আরো কমে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছাকাছি চলে এসেছি আমরা।
মসলা গবেষণার সাথে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পেঁয়াজে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে হাঁটলেও আদা, রসুন, মরিচসহ আরো কিছু অপ্রধান মসলা ফসলের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।
ডিএই এবং মসলা গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য বলছে, দেশে মরিচের (সব ধরনের) চাহিদা ৮ লাখ ৬৩ হাজার টন। বিপরীতে উৎপাদন হয় ৬ লাখ ৭৬ হাজার টন। অর্থাৎ ১ লাখ ৮৭ হাজার টনের ঘাটতি রয়েছে, যা আমদানি করতে হয়। আদার চাহিদা ৪ লাখ ৮১ হাজার টন। বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ২ লাখ ৮৮ হাজার টন। অর্থাৎ ১.৯৩ লাখ টনই আমদানি করতে হয়। ধনিয়ার চাহিদা ৭০ হাজার টন। বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ৫৬ হাজার টন। অর্থাৎ ১৪ হাজার টন আমদানি করতে হয়। কালোজিরার চাহিদা ২০ হাজার টন। উৎপাদন হয় ১৪ হাজার টন। ৬ হাজার টন আমদানি করতে হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে ব্যবহৃত অনেক মসলাই রয়েছে যে দেশে উৎপাদন খুব কমই হয়। তার মধ্যে দারুচিনি। ২০২১-২২ অর্থবছরে ১০ হাজার ৪৫৩ টন আমদানি করতে হয়েছে। একইভাবে লবঙ্গ, মিষ্টি জিরা, গোল মরিচসহ বিভিন্ন মসলা আমদানি করতে হয়েছে।
ড. শৈলন্দ্র নাথ মজমুদার বলেন, গতবার ৩ লাখ টন পেঁয়াজের ঘাটতি ছিল। বর্তমানে দেড়-দুই লাখ টনে নেমে এসেছে। সর্বশেষ উৎপাদন মৌসুমে ২ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমোদন দেয় সরকার। কিন্তু ব্যবসায়ীরা আনেন ৪৪ হাজার টন। এটিও তারা ঠিক মতো বিক্রি করতে পারেনি। কারণ মানুষ তো আর দেশী বাদ দিয়ে ইন্ডিয়ার পেঁয়াজ খাবে না। তিনি বলেন, রসুনের ঘাটতিও দেশে খুব কম। তবে রসুনের উৎপাদন গত বছর কমে গেছে। কারণ আগের বছর ঘাটতির চেয়ে বেশি আমদানি করায় বিশেষ করে চাইনিজ রসুন আনায় কৃষক নিরুৎসাহিত হয়েছে। আবাদ কম করেছে। রসুনের ব্যবহার্য চাহিদা প্রায় ৬ লাখ টন। অল্প কিছু রসুনের ঘাটতি থাকে। তবে অতিরিক্ত আমদানি করায় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।
বেশি ঘাটতি হচ্ছে আদাতে। চাহিদা প্রায় ৪ লাখ টন। উৎপাদন প্রায় আড়াই লাখ টন। প্রায় অর্ধেকই আমদানি করতে হয়। আদাতে সিস্টেম লস আরো বেশি। পচে যায়। তবে মাটির ভেতর রাখলে নষ্ট হয় না। প্রসেসিংয়ে নষ্ট হয়। শুকিয়েও কমে যায়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৯ লাখ ৫৩ হাজার ৮০০ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ২২ লাখ ৬৮ হাজার ৭৫৪ টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৪৪৮ টন রসুন উৎপাদন হয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ৫ লাখ ১ হাজার ৬১১ টনে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে হলুদ উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৮৬ হাজার ১৫৮ টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা কমে হয় ২ লাখ ১৭ হাজার ৭৩৭ টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে আদা উৎপাদন হয় ৮৪ হাজার ৮৮৭ টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা কমে হয় ৮১ হাজার ৭১৫ টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ধনে বীজ হয় ২১ হাজার ৩৪৬ টন। ২০২০-২১ বছরে তা হয় ২১ হাজার ৫১৮ টন। একইভাবে ২০১৯-২০ বছরে ধনে পাতা হয় ৫ হাজার ৬১৬ টন; ২০২০-২১ বছরে তা বেড়ে হয় ৬ হাজার ৩০৯ টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে কালোজিরা হয় ১ হাজার ৫ টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে হয় ১ হাজার ৬৮ টন।
ক্যাপসিকাম ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ১৭৬ টন এবং মেথি হয় ১৮৫ টন। পুদিনা হয় ৩.৯৩ টন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, মসলার আমদানিনির্ভরতা কমাতে ১১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকার নতুন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশে মসলার আবাদ ৫ শতাংশ বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উন্নত জাতের মসলার বছরব্যাপী উৎপাদন বাড়ানো, আমদানি ব্যয় হ্রাস এবং মসলাজাতীয় ফসল চাষে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে গতিশীলতা আনতে এর উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে ৫ বছরে এটি বাস্তবায়ন করা হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, মসলার অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চাহিদা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর বাজারমূল্য অন্যান্য ফসলের তুলনায় বেশি। দেশে প্রায় ৫০ ধরনের মসলা ব্যবহার করা হলেও পেঁয়াজ, রসুন বা আরো কিছু মসলা বাদে খুব কম মসলারই সেভাবে চাষ হচ্ছে দেশে। ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদার অধিকাংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়ে থাকে। আমদানি নির্ভরতা কমাতে স্থানীয়ভাবে মসলার উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন। বাংলাদেশ মসলা গবেষণা কেন্দ্র এ পর্যন্ত ২২টি মসলা জাতীয় ফসলের ৪৭টি জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। এছাড়া মৃত্তিকা ও পানি ব্যবস্থাপনা, পোকামাকড় ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, পোস্ট-হারভেস্ট প্রযুক্তিসহ ৬৬টি উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে। এসব জাত ও প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশে মসলার উৎপাদন ও কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং আমদানিনির্ভরতা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।


আরো সংবাদ


premium cement