১৬ আগস্ট ২০২২
`

পদ্মা সেতুতে ৯ দিনে যান পারাপার ১ লাখ ৮৮ হাজার ৫২১

পাল্টে গেছে ঈদে ফেরিঘাটে চিরচেনা দুর্ভোগের দৃশ্য
-

আসন্ন ঈদে ঘরমুখো দক্ষিণবঙ্গের ২১ জেলার যাত্রীদের বাড়ি ফিরতে আর নেই বাড়তি ঝক্কি ঝামেলা। ঈদে ঘরমুখো এসব যাত্রীকে প্রমত্তা পদ্মা পাড়ি দিতে এখন মাত্র ৬ মিনিট লাগছে। স্বপ্নের পদ্মা সেতু দিয়ে দূরপাল্লার যানবাহনগুলো চলাচল করছে নির্বিঘেœ। সেতু চালুর পর থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত গত ৯ দিনে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে মোট যানবাহন পারাপার হয়েছে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৫২১টি। ৯ দিনে মোট টোল আদায় হয়েছে ১৯ কোটি ৫৪ লাখ ৮৭ হাজার ৩৫০ টাকা। সেতু চালু হওয়ায় ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাসড়ক দিয়ে এ পথে পদ্মা পাড়ি দিতে আর নেই সেই টানা দুর্ভোগ। নেই ঘাটে ঘাটে যাত্রীদের ৮-১০ ঘণ্টার অপেক্ষার প্রহরও।
গত ২৬ জুন রোববার ভোর ৬টার সময় পদ্মা সেতুর উভয় প্রান্ত থেকে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। আগের দিন ২৫ জুন শনিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সেতুর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। গত আট দিন ধরে এ মহাসড়কে চলাচলকারী বাস, ছোট গাড়িসহ পণ্যবাহী ট্রাকের চালক ও যাত্রীদের মধ্যে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে। উদ্বোধনের পরের দিন থেকেই মাওয়া অংশের টোলপ্লাজা হয়ে দিনভরই পদ্মা পাড়ি দিচ্ছেন এসব যানবাহনের যাত্রীরা। এবারই প্রথম পদ্মা সেতু দিয়ে পরিবার-পরিজনদের সাথে ঈদের ছুটিতে আনন্দ ভাগাভাগি করতে যাচ্ছেন তারা। পদ্মা সেতু যেন এসব ঘরমুখো যাত্রীদের যোগ করেছে এক নতুন মাত্রা। মাওয়া প্রান্তের টোলপ্লাজায় ছয়টি বুথের মধ্যে পাঁচটি ও জাজিরা প্রান্তে ছয়টি বুথই চালু ছিল। টোল কাটার পর পদ্মা পাড়ি দিতে প্রতিটি যানবাহনকে প্রকার ভেদে ৬ থেকে সর্বোচ্চ ৮ মিনিট সময় লাগছে। ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাসড়কের ধলেশ্বরী টোল প্লাজায় যানবাহনের কোনো চাপ লক্ষ করা যায়নি। নির্বিঘেœ মহাসড়ক ও সেতু পাড়ি দিচ্ছে যানবাহনগুলো।
সেতু বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমান গতকাল বুধবার নয়া দিগন্তকে জানান, পদ্মা সেতুতে যান চলাচল শুরুর প্রথম দিনে (২৬ জুন) ৫১ হাজার ৩১৬টি যানবাহন চলাচল করেছে। এসব যানবাহন থেকে টোল আদায় করা হয়েছে ২ কোটি ৯ লাখ ৩১ হাজার ৫৫০ টাকা। উদ্বোধনের দিন যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। যান চলাচলের দ্বিতীয় দিনে ২২ হাজার ৭৮০টি যানবাহন পারাপার করা হয়। টোল আদায় করা হয়েছিল ২ কোটি ১৯ লাখ ২৬ হাজার ৯৫০ টাকা। ১ জুলাই গত শুক্রবার সর্বাধিক ৩ কোটি ১৬ লাখ ৫৩ হাজার ২০০ টাকা টোল আদায় করা হয়েছে। চালুর পর এটাই টোল আদায়ের রেকর্ড। এ দিন সেতু দিয়ে যানবাহন পারাপার করেছে ২৬ হাজার ৩৯৮টি। পরদিন ২ জুলাই যানবাহন পারপার করা হয়েছে ১৮ হাজার চারটি। আর টোল আদায় করা হয়েছে ২ কোটি ৩২ লাখ ৭১ হাজার টাকা। তবে প্রথম সপ্তাহের শেষ দিনে আবার যানবাহন বেড়েছে। এরপর ৩ জুলাই যানবাহন পারপার হয়েছে ১৩ হাজার ৩৯১টি। টোল আদায়ের পরিমাণ ১ কোটি ৯১ লাখ ৯৬ হাজার ৩৫০ টাকা। ৪ জুলাই মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে গাড়ি পারপার হয়েছে ১৩ হাজার ৬২৪টি। এ দিন টোল আদায় হয়েছে ১ কোটি ৯৯ লাখ ৬৪ হাজার ৩০০ টাকা। এ নিয়ে গত ৯ দিনে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে মোট যানবাহন পারাপার হয়েছে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৫২১টি। ৪ জুলাই পর্যন্ত ৯ দিনে মোট টোল আদায় হয়েছে ১৯ কোটি ৫৪ লাখ ৮৭ হাজার ৩৫০ টাকা।
এর আগে ২৬ জুন সেতু চালু হলে এক দিনে ৬১ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচল করেছিল। আর টোল আদায় হয়েছিল প্রায় পৌনে তিন কোটি টাকা। তবে ওই দিন পার হওয়া যানবাহনের ৭৫ শতাংশ ছিল মোটরসাইকেল। এর আগে সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু হওয়ার প্রথম দিন সেতুতে মোটরবাইকের ব্যাপক আধিক্যে সেতুতে ঘটে নানা অনিয়ম ও দুর্ঘটনা। সেতুতে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয় মোটরযানের চালক ও আরোহীসহ দু’জন। এ সময় রাতেই সেতু বিভাগ তথ্য অধিদফতরের এক তথ্যবিবরণীতে পদ্মা সেতু দিয়ে মোটরসাইকেল চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করলে ২৭ জুন থেকে সেতু দিয়ে মোটরসাইকেল পারাপার বন্ধ করে দেয়া হয়।
এ দিকে শিমুলিয়া ও মাঝিকান্দি ঘাটে একেবারে বন্ধ রয়েছে নৌরুটের ফেরিগুলো। পদ্মার উভয় প্রান্তের লঞ্চ, স্পিডবোট ঘাটগুলোতে যাত্রীশূন্য হয়ে পড়ায় পাল্টে গেছে আসন্ন ঈদে ঘরমুখো মানুষের সেই দুর্ভোগের চিরচেনা দৃশ্য। ঘাটগুলোতে ১০ জন যাত্রীও একসাথে আর দেখা যাচ্ছে না।
শিমুলিয়া বিআইডব্লিউটিসির একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, সেতু চালু হওয়ার পর শিমুলিয়ায় থাকা ফেরি সুফিয়া কামালকে আরিচা-কাজীরহাট নৌরুটে স্থানান্তর করা হয়। পরে বেগম রোকেয়া ফেরিটিকে পাঠানো হয় চাঁদপুর- শরীয়তপুর নৌরুটে। সেতু চালুর দিনও এ রুটে এখন মোট আটটি ফেরি থাকলেও এখন রয়েছে ছোট কে টাইপ ও টানা ফেরিসহ ছয়টি ফেরি। চলতি ঈদুল আজহা পর্যন্ত এ ফেরিগুলো শিমুলিয়া অবস্থান করলেও ধীরে ধীরে এগুলো সরিয়ে নেয়া হবে বলে জানা যায়। আর পাটুরিয়া ঘাটেও সেতুর প্রভাব পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রটি জানায়। বর্তমানে ওই নৌরুটের ফেরিগুলোও যানবাহনের অপেক্ষায় ঘাটে বসে থাকতে হচ্ছে বলে জানা যায়।
বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক (বাণিজ্য) এস এম আশিকুজ্জামান গতকাল বুধবার নয়া দিগন্তকে জানান, সেতু চালু হলেও জরুরি প্রয়োজনের দিক বিবেচনা করে ছয়টির মতো ফেরি শিমুলিয়ায় রয়েছে। তবে এ রুট থেকে দুইটি ফেরি সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ফেরিগুলো অলস বসে থাকলে কর্তৃপক্ষ ক্ষতির মুখে পড়বে। তাই আগামীতে অন্যান্য নতুন নতুন নৌরুট চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তখন পর্যায়ক্রমে এগুলো সরিয়ে নেয়া হবে বলে তিনি আরো জানান।
গতকাল বিকেলে কথা হয় স্পিডবোট ঘাটের স্টাফ যশলদিয়া গ্রামের বাদলের সাথে। তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, যাত্রী না থাকার কারণে সকাল থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ৫টি স্পিডবোটও চলেনি। মাত্র ১২ জন যাত্রী হতে সময় লাগছে ১ থেকে দেড় ঘণ্টা। এ ছাড়া গত সাত দিন ধরে একটিও লঞ্চ চলেনি। অন্য দিকে শিমুলিয়া ঘাট এলাকার অর্ধশতাধিক হোটেল- রেস্টুরেন্ট খোলা থাকলেও ক্রেতা উপস্থিতি একেবারেই আগের মতো নেই। ঈদের মধ্যে সেতু দেখতে আসা দর্শনার্থীদের চাপ বাড়বে বলে হোটেল ব্যবসায়ীরা মনে করছেন।


আরো সংবাদ


premium cement