০৪ জুলাই ২০২২, ২০ আষাঢ় ১৪২৯, ৪ জিলহজ ১৪৪৩
`
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তিন বছরমেয়াদি খসড়া রোডম্যাপ

তেলজাতীয় ফসলের আবাদ তিন গুণ উৎপাদন ৪ গুণ বাড়ানোর টার্গেট

-

দেশে ভোজ্যতেলের সঙ্কট থেকে উত্তরণে শেষ পর্যন্ত নড়েচড়ে বসেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। সরকার আগামী তিন বছরের মধ্যে চাহিদার ৪০ ভাগ ভোজ্যতেল স্থানীয়ভাবেই উৎপাদনের লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপের খসড়া প্রস্তুত করেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে, বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ হেক্টর জমিতে তেলজাতীয় ফসল উৎপাদন হচ্ছে। যার বেশির ভাগই সরিষা। আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়িয়ে চাহিদার ৪০ শতাংশ পূরণ করতে হলে তিন গুণ তথা প্রায় ২৪ লাখ হেক্টর জমির প্রয়োজন। দেশে এই রকম জমি খালি নেই। তবে বোরো ও আমন ধানের মওসুমের মাঝখানে পতিত থাকে প্রায় ২০ লাখ হেক্টর জমি, এর বাইরে দেশের নদী তথা চর এলাকা এবং উপকূলীয় এলাকার জমিগুলোতে তেলজাতীয় ফসল আবাদের পরিধি বাড়ানো হবে। এ ছাড়া কোন এলাকার জমি কখন খালি পড়ে থাকে সেটার তালিকা করে তেল ফসল চাষের আওতায় আনার পরিকল্পনা নিতে যাচ্ছে সরকার। বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর তথা ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রায় ৮ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষাসহ অন্যান্য তেলজাতীয় ফসল চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। গত অর্থবছরে (২০২০-২১) দেশে ৮ লাখ ৫৪ হাজার ৪৫ হেক্টর জমিতে তেলজাতীয় ফসল চাষ হয়েছে। এতে ফলন হয়েছে ১১ লাখ ৯৯ লাখ টনের কিছু বেশি। তেলজাতীয় ফসলের মধ্যে সরিষাই মুখ্য। এর বাইরে চীনাবাদাম, তিসি, তিল, সয়াবিন ও সূর্যমুখী অন্যতম। এর মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে সরিষা আবাদ হয়েছিল প্রায় পাঁচ লাখ ৮৯ হাজার হেক্টর জমিতে; যাতে ফলন হয়েছিল প্রায় সাত লাখ ৮৭ হাজার মেট্রিক টন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সূত্রের খবর, দেশে প্রতি বছর প্রায় ২৪ লাখ মেট্রিক টন ভোজ্যতেল প্রয়োজন হয়। যার বেশির ভাগই সয়াবিন ও পামওয়েল। ভোজ্যতেলের বিপুল চাহিদার বিপরীতে দেশে মাত্র তিন লাখ মেট্রিক টন বা ১০ শতাংশের মতো অভ্যন্তরীণভাবে মেটানো হয়। যার ৯৮ ভাগই সরিষার তেল। যেহেতু দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ ভোজ্যতেলই আমদানিনির্ভর, তাই বরাবরই বাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকে। তবে গত পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগে ও পরে হঠাৎই চরম অস্থিরতা দেখা দেয় ভোজ্যতেলের বাজারে। প্রতি লিটার সয়াবিনে ৩৮-৪০ টাকা বাড়ানোর পরেও কয়েক দিন তেল পাননি ভোক্তারা।

এ নিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত কথা বলেছেন। নিজস্ব উৎপাদন বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন, কিভাবে এই তেলজাতীয় ফসল উৎপাদন বাড়ানো যায়। এ অবস্থায় নড়েচড়ে বসেছেন কৃষি মন্ত্রণালয় ও অধিনস্থ বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা। বিশেষ করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ‘তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রকল্পের পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টরা প্রায় ১০ দিন ধরে বিভিন্ন অংশীজনের সাথে সিরিজ বৈঠক করছেন। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের কাছে দৌড়ঝাঁপ করছেন। ২৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২০-২৫ মেয়াদে ২৫০টি উপজেলায় প্রকল্পটির কার্যক্রম চলমান। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রচলিত শস্য বিন্যাসে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষিত স্বল্পমেয়াদি তেলফসলের আধুনিক জাত অন্তর্ভুক্ত করে সরিষা, তিল, সূর্যমুখী, চীনাবাদাম, সয়াবিনসহ তেল ফসলের উৎপাদন ও আবাদ ১৫-২০ শতাংশ বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ) বলাই কৃষ্ণ হাজরা গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, আগামী তিন বছরের মধ্যে চাহিদার ৪০ ভাগ ভোজ্যতেল যাতে স্থানীয়ভাবেই উৎপাদন হয়, সে লক্ষ্যে একটা রোডম্যাপ প্রস্তুত করা হচ্ছে। মূলত সরিষাকেই অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। এর বাইরে চালের কুড়ার তেল, তিল, সূর্যমুখী, বাদাম, নারিকেল তেল, তিসি, ভেরেন্ডা ইত্যাদি তেল জাতীয় ফসল উৎপাদন বৃদ্ধিতে জোর দেয়া হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, তিন বছর তথা স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় সরিষাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় উপকূলীয় এলাকায় প্রায় এক কোটি নারিকেল গাছ রোপণের চিন্তা করা হচ্ছে। যেখান থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নারিকেল তেল আসবে, উপরন্তু উপকূল ঝড় ঝাপ্টা হতেও সুরক্ষা পাবে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের এই কর্মকর্তা বলেন, কৃষকদের কাছ থেকে বিএডিসি সরিষা বীজ হিসেবে কিনে নেবে। এরপর তা প্রণোদনা হিসেবে কৃষককে দেবে। সাথে সারও দেয়া হবে। তার মতে, সারা দেশে ৫৬ লাখ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়। এরপর এসব জমিতে বোরো চাষ করেন কৃষক। এই দুই ধানের মাঝখানে অনেক দিন প্রায় ২০ লাখ হেক্টর জমি পতিত পড়ে থাকে। এই পতিত জমিতেই স্বল্প মেয়াদের সরিষা আবাদের পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। কৃষককে স্বল্প মেয়াদের আমন ধান চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। কৃষক এই আমন কেটে যাতে জমি ফেলে না রাখে। স্বল্পমেয়াদি বারি ১৪, বারি ১৭ ও বিনা ৯ জাতের সরিষার আবাদ করতে পারবেন তারা। এই সরিষা তুলে বোরো ধান রোপণ করতে পারবেন। এর বাইরে চর এলাকায় বাদাম চাষে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। একই সাথে নোয়াখালীসহ লবণাক্ত উপকূলীয় এলাকায় সয়াবিনের আবাদ বাড়ানোতেও রোডম্যাপে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

‘তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রকল্পের পরিচালক মো: জসিম উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা তিন বছর মেয়াদি একটা কর্মপরিকল্পনা নিচ্ছি। সরিষার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছি। আমাদের দু’টি ধান ফসল আমন ও বোরোর মাঝখানের সময়ে কিভাবে সরিষা দেয়া যায় (চাষ), চরাঞ্চল, উপকূলীয় অঞ্চলে অনাবাদি অনেক পতিত জমি আছে। তা ছাড়া একটা প্রধান ফসল রোপা আমন শুধু হয়, এমন এলাকা যেখানে রবি মওসুমে কোনো কিছু হয় নাÑ এসব জমিতে সয়াবিন, চীনাবাদাম, সরিষা চাষের ব্যবস্থা করব আমরা। তিনি বলেন, আমাদের তেলের উৎপাদন এখন অনেক কম। সরিষা ছাড়া তো আর সয়াবিন বা বাদাম থেকে ওইভাবে তেল হয় না। চাহিদা ২৪ লাখ মেট্রিক টন। তবে তিন লাখ টন ভোজ্যতেল অভ্যন্তরীণভাবে আসে। বাকি ২১ লাখ টনই আমদানি করতে হয়। আমাদের টার্গেট হলো আগামী তিন বছরের মধ্যে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে এনে নিজস্ব উৎস থেকে ৪০ শতাংশ ভোজ্যতেল সরবরাহ করা। এ জন্য ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে বর্তমানে যে তেল ফসলের আবাদি জমি আছে তা তিনগুণ বাড়িয়ে ২৪ লাখ হেক্টরে নিয়ে আসব। এসব নিয়েই কর্মকৌশল বানানো হচ্ছে।

এই অতিরিক্ত জমি কিভাবে সংস্থান হবেÑ জানতে চাইলে জসিম উদ্দিন বলেন, বোরো চাষের রোপা আমন চাষের আগে মাঝখানে দেশের প্রায় ২০ লাখ হেক্টর জমি পতিত থাকে। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলের রংপুর, দিনাজপুর যেখানে আমন ধান বেশি হয়। এসব জায়গায় আমরা সরিষা আবাদ বৃদ্ধি করব। আর বরিশাল, সাতক্ষীরা অঞ্চলে শুধু রোপা আমন করে, স্যালাইনিটির জন্য এখানে বোরো ধান করতে পারে না। সেখোনে আমরা সূর্যমুখী, সয়াবিন চাষ করব। বাদামের ক্ষেত্রে চরাঞ্চল বিশেষ করে যমুনা, পদ্মা বিধৌত অঞ্চল, নোয়াখালী, ভোলা, হাতিয়া-এসব জায়গায় বাদাম চাষ সম্ভব। ওই সব এলাকায় আবার পতিত জমিও আছে, সেটাও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

তেলজাতীয় ফসলের পিডি বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে তো ১৫-২০ শতাংশ তেলজাতীয় ফসল উৎপাদন বাড়ানোর টার্গেট রয়েছে। সুতরাং আমাদের প্লানিং শুধু প্রকল্প না, আমাদের সাথে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সরেজমিন উইং, বিএডিসি, বিনা সব প্রতিষ্ঠান মিলেই আমরা রোডম্যাপটা বানাচ্ছি। অর্থায়নের বিষয়ে বলেন, প্রণোদনা প্যাকেজের সুপারিশ রাখছি। বীজ যাতে কৃষকদের কাছ থেকে কিনে নেয়। বিএডিসিকে অধিক পরিমাণ বীজ উৎপাদন করতে হবে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। কারণ চাষাবাদের এরিয়া যেহেতু বাড়বে, তাই বীজের চাহিদাও বেড়ে যাবে। বীজ যাতে বেশি উৎপাদন হয়, এ বিষয়ে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, প্রথম বছর অর্থাৎ ২০২২-২৩ অর্থবছরে বেশি বাড়াতে পারব না। সরিষার প্রায় ৪৮ হাজার হেক্টর জমি বাড়াতে পারব। পরবর্তী বছর তথা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমরা বাড়াব। কারণ বীজের পরিকল্পনা কমপক্ষে এক বছর আগে থেকেই নিতে হয়। এই মুহূর্তে বিএডিসির তেল ফসল এত বাড়ানোর পরিকল্পনা ছিল না। তাদের হাতে মাত্র ৯৫০ মেট্রিক টন সরিষা বীজ আছে। ডিএইর প্রকল্পে এই রকম প্রায় এক হাজার টন বীজ আছে। বাকি যে বীজ সেগুলো কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহের চেষ্টা করছি। কৃষকের কাছে সংরক্ষিত কী পরিমাণ বীজ আছে, সেটা আবার গুণগত মানের কি না খুঁজে বের করে এবার যতটুকু চাহিদা পূরণ করা যায়, করব। আর আগামী বছর থেকে (২০২৩-২৪) বিএডিসি, ডিএই প্রকল্প, গবেষণা প্রতিষ্ঠান-সবারই চাহিদা থাকবে বীজ প্রায় ডাবল করার। এভাবে আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি। যাতে ২০২৪-২৫-এ ভোজ্যতেলের ৪০ শতাংশ আমরা অভ্যন্তরীণভাবে সরবরাহ করতে পারি।


আরো সংবাদ


premium cement