২৫ মে ২০২২
`

‘আংশিক’ ফর্মুলা ভোগাচ্ছে পদপ্রত্যাশীদের

বিএনপি ও বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের কমিটি
-

প্রায় ১৫ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুনভাবে দল পুনর্গঠন শুরু করে। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যেই সব সাংগঠনিক জেলা শাখায় সম্মেলন শেষ করে কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু তার আগে হঠাৎ করে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ হলে দল পুনর্গঠন থমকে যায়। এ দিকে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের ভোগাচ্ছে ‘আংশিক’ কমিটি গঠনের ফর্মুলা। একবার কোনো সংগঠনের ‘আংশিক’ কমিটি হলে আর কোনো কথা নেই। দিন যায় মাস যায় কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয় না। এভাবে মাস শেষে বছর গড়ালেও অদৃশ্য কারণে আলোর মুখ দেখেনি বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বেশির ভাগ জেলা কমিটি। বিএনপির বর্তমান জাতীয় নির্বাহী কমিটি থেকে শুরু করে একাধিক অঙ্গ সংগঠনের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও নতুন বা পূর্ণাঙ্গ করা হয়নি। কবে হবে তাও অনিশ্চিত। যে কারণে দলের মধ্যে যোগ্য নেতৃত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক জীবনে কোনো পদ না পেয়ে পদপ্রত্যাশী অসংখ্য নেতাকর্মী তাদের কপাল চাপড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলছেন, একে তো বিরোধী দল তারপর নেই পদ-পরিচয়! তাহলে এই যে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন তার মূল্য কী?
পদপ্রত্যাশী একাধিক নেতা আলাপকালে জানান, কমিটি গঠনে দীর্ঘসূত্রতা, শীর্ষপদে বারবার একই ব্যক্তির পদায়ন, টাকার বিনিময়ে পদ দেয়া, পকেট কমিটি গঠন এবং যোগ্য লোক বাছাইয়ের অভাবের কারণে দলের সঠিক নেতৃত্ব বিকশিত হচ্ছে না। যার চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে। এভাবে চলতে থাকলে দল সাংগঠনিকভাবে একসময় বিপর্যস্ত হবে। এমনিতেই বহুদিন রাজনীতি করে কোনো পদ না পেয়ে অসংখ্য তরুণ মেধাবী ছাত্রনেতা রাজনীতি বিমুখ হয়েছেন। অনেকেই নিষ্ক্রীয় হয়ে দূর থেকে রাজনীতিতে রয়েছেন। এমনো আছেন যারা একেবারেই রাজনীতি ছেড়ে ব্যবসা করছেন বা উন্নত ও নিরাপদ জীবন যাপনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। কয়েকজন বলেন, বছরের পর বছর পূর্ণাঙ্গ কমিটির অপেক্ষায় থাকা ভুক্তভোগীরাই শুধু জানেন যে, এই অপেক্ষার প্রহর কতটা যন্ত্রণাদায়ক।
জানা যায়, ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের পর বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটি ঘোষণা করা হয় ৬ আগস্ট। এরপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর কমিটি ঘোষণা করা হয়। ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগর বিএনপি, যুবদল ও কেন্দ্রীয় কৃষক দলের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে অন্যতম অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দল, তাঁতী দল, মৎস্যজীবী দল এবং ওলামা দলের কমিটিও মেয়াদোত্তীর্ণ। যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি যেকোনো সময় বিলুপ্ত করা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে শীর্ষ পদে আসতে পারে নতুন মুখ।
মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দফায় দফায় সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত রাখে বিএনপি। গত বছরের মাঝামাঝি ও শেষ দিকে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু হ্রাস পাওয়ায় গত ১২ সেপ্টেম্বর সেই স্থগিতাদেশ তুলে নেয়া হয়। তবে এই সময়েও জরুরি কিছু সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কমিটি দিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড। তারই ধারাবাহিকতায় গত বছরের ২ আগস্ট ঢাকা মহানগর উত্তরে ৪৭ সদস্য ও দক্ষিণে বিএনপির ৪৯ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। ঢাকা উত্তরে বিএনপির আহ্বায়ক হয়েছেন ডাকসুর সাবেক ভিপি আমানউল্লাহ আমান এবং সদস্যসচিব জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক। ঢাকা দক্ষিণে বিএনপির আহ্বায়ক হন দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুস সালাম আর সদস্যসচিব যুবদল নেতা রফিকুল আলম মজনু। মহানগরীর সব ওয়ার্ড ও থানা কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। গত বছরেরই ২১ আগস্ট শফিকুল ইসলাম মিল্টনকে আহ্বায়ক ও মোস্তফা জগলুল পাশা পাপেলকে সদস্যসচিব করে ঢাকা মহানগর উত্তর এবং গোলাম মাওলা শাহিনকে আহ্বায়ক ও খন্দকার এনামুল হক এনামকে সদস্যসচিব করে ঢাকা দক্ষিণ যুবদলের নতুন কমিটি দেয়া হয়। এ ছাড়া ২৩ বছর পর গত বছর ২০ সেপ্টেম্বর কৃষক দলের সাত সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় আংশিক এবং ৭ ডিসেম্বর পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া গত বছর ১২ আগস্ট জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি বিলুপ্ত করা হয়।
ছাত্রদল : ২৭ বছর পর ২০১৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ছাত্রদলের ষষ্ঠ কাউন্সিলে ফজলুর রহমান খোকন সভাপতি এবং ইকবাল হোসেন শ্যামল সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। কাউন্সিলের তিন মাস পর ওই বছরের ডিসেম্বরে সংগঠনটির ৬০ সদস্যবিশিষ্ট আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। ছাত্রদল বর্তমানে মেয়াদোত্তীর্ণ আংশিক কমিটি দিয়ে চললেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি।
যুবদল : ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি রাতে সাইফুল আলম নীরবকে সভাপতি ও সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে সাধারণ সম্পাদক করে যুবদলের পাঁচ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। এই কমিটিও এখন মেয়াদোত্তীর্ণ। এরই মধ্যে ২০২০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি আবারো ১১৪ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি (আংশিক) ঘোষণা করা হয়। তবে পাঁচ বছর পার করেও যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি আলোর মুখ দেখেনি।
স্বেচ্ছাসেবক দল : ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর শফিউল বারী বাবুকে সভাপতি এবং আবদুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েলকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাত সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি (আংশিক) ঘোষণা করা হয়। ২০১৯ সালের অক্টোবরের মধ্যেই সব পর্যায়ে কমিটি গঠন করে নতুন কমিটির হাতে দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশনা ছিল। ২০২০ সালের জুলাইয়ে শফিউল বারী বাবু ইন্তেকাল করলে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন মোস্তাফিজুর রহমান। মেয়াদ শেষের এক বছর পর গত বছর ১৯ সেপ্টেম্বর আবারো ১৮৬ সদস্যের আংশিক কমিটি দেয়া হয়। এই আংশিক কমিটিতেও সক্রিয়দের বাদ দিয়ে স্বজনপ্রীতি ও নিষ্ক্রিয়দের পদায়নের অভিযোগ ওঠে। স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণের পাঁচ বছর হলেও অদ্যাবধি পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি।
মহিলা দল : ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর আফরোজা আব্বাসকে সভাপতি ও সুলতানা আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করে পাঁচ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৫ মাসে তারা ৭৮টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ৩০টির কাউন্সিল সম্পন্ন করে। যার মধ্যে প্রায় ৪০টি জেলায় কমিটি দেয়া হয়। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর আর কাউন্সিল করা যায়নি। ২০১৯ সালের ৪ এপ্রিল সংগঠনটির ২৬৫ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়।
শ্রমিক দল : ২০১৪ সালের ১৯ ও ২০ এপ্রিল জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের জাতীয় কাউন্সিল হয়। সম্মেলনের প্রায় ১৫ দিন পর ৫ মে আনোয়ার হোসাইনকে সভাপতি এবং নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে সাধারণ সম্পাদক করে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি হয়। গঠনতন্ত্র লঙ্ঘনের অভিযোগে শ্রমিক দলের একটি অংশ ওই বছরের ৭ জুন এ এম নাজিম উদ্দিনকে সভাপতি এবং আবুল খায়ের খাজাকে সাধারণ সম্পাদক করে ৩১ সদস্যবিশিষ্ট পাল্টা কমিটি ঘোষণা দেয়। উভয় কমিটিই মেয়াদোত্তীর্ণ।
তাঁতী দল : ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল আবুল কালাম আজাদকে আহ্বায়ক, মো: মজিবুর রহমানকে সদস্যসচিব ১২৮ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি ইতোমধ্যে সারা দেশে অনেক সম্মেলন ও বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে। তবে বিভিন্ন শাখা কমিটি গঠনে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।
মৎস্যজীবী দল : ২০১৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রফিকুল ইসলাম মাহতাবকে আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা মো: আব্দুর রহিমকে সদস্যসচিব করে ১৫৪ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির আহ্বায়ক মাঝে মধ্যে নিষ্ক্রিয় থাকায় সংগঠনের বিরাট একটি অংশ সদস্যসচিবের সাথে একনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন।


আরো সংবাদ


premium cement