২৫ মে ২০২২
`
একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রবাসী কল্যাণ সচিব ড. মুনিরুছ সালেহিন

শ্রমবাজারে বিকল্প দরজা খোলা রাখতে হবে


মালয়েশিয়ার সাথে হওয়া এমওইউর চুক্তি অনুযায়ী এক হাজার ৫২০টি রিক্রুটিং এজেন্সির নামের তালিকা পাঠিয়ে দিয়েছি। এখান থেকেই মালয়েশিয়া সরকার অটোমেটিক্যালি মেইনটেন্যান্স, ফেয়ারনেস অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সি অনুযায়ী নাম সিলেক্ট করবে। এটাই হচ্ছে এমওইউর শর্ত। এর বাইরে আমাদের আর কোনো বক্তব্য নাই। বাংলাদেশ কোনো সিলেকটেড টিমের পার্টি হবে না। কাকে সিলেক্ট করল, ২৫০ জনকে না কি ২৫ জনকে, সে দিকে যাবে না। এমওইউতে যা উল্লেখ আছে সেটাই করবে। এই হচ্ছে আমাদের অবস্থান। বুধবার বিকেলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহিন তার দফতরে নয়া দিগন্তকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন।

দেশের শ্রমবাজারের ইতিহাসে ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে রেকর্ড পরিমাণ সোয়া লাখেরও বেশি কর্মী বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। এ প্রসঙ্গ ছাড়াও সৌদি আরব, মিসর, ইতালিসহ অন্যান্য দেশের শ্রমবাজারের সার্বিক অবস্থা বলা ছাড়াও কি কারণে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স পাঠানোর হার কম তারও ব্যাখ্যা দেন তিনি। তার বক্তব্যের সেই চুম্বক অংশ নয়া দিগন্তের পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো।

আপনি সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০২১ সালে ৬ লাখেরও বেশি কর্মী বিদেশে গেছে। এর মধ্যে নভেম্বর মাসে গেছে এক লাখ দুই হাজার পরের মাসে (ডিসেম্বর) এক লাখ ৩১ হাজার কর্মী পাঠানোরও রেকর্ড গড়েছেন। করোনা পরবর্তী সময়ে হঠাৎ কর্মী যাওয়ার হার বাড়ার কারণ কী। আবার নতুন করে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী যাওয়া শুরু হলে তখন এই হার আরো বাড়বে। এটাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহিন বলেন, আমাদের মাইগ্রেশনে মালয়েশিয়াকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা বেশি। মালয়েশিয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ একটি শ্রমবাজার। কিন্তু এই বাজার না হলে যে আমাদের মাইগ্রেশন সেক্টর স্থবির হয়ে যাবে, বিষয়টা কিন্তু তেমনও না। বরং সবসময় অলটারনেটিভ দরজাগুলো খোলা রাখতে হবে এবং খোলা রাখার চেষ্টা করতে হবে। যেটা আমরা করছি। ২০২১ সালের নভেম্বরে এক লাখ দুই হাজার এবং ডিসেম্বরে এক লাখ ৩১ হাজার কর্মী বিদেশে গেছে। এটা ভালো খবর। তবে এটা যে সবসময় ঐকিক নিয়মে যেতে থাকবে সেটাও কিন্তু আমরা আশা করি না। এটা আপস অ্যান্ড ডাউন হবে। মূল কথা হচ্ছে আমরা সুযোগ-সুবিধাগুলোকে সুন্দরভাবে ব্যবহার করে আমাদের কাছে যে ডিমান্ড লেটার আসছে সেগুলোর প্রক্রিয়া সহজ করলে আশা করি দিন শেষে আমাদের অর্জন ভালো হবে। এটা হচ্ছে আমাদের এক্সপেকটেশন। আমরা চাই, আমাদের এখান থেকে প্রসেস ক্যাপাসিটিটা সহজ করা, ডিজিটাইলজড করার মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর ফ্লোটাকে অক্ষুন্ন রাখা।

তিনি বলেন, বিদেশে যাওয়ার সংখ্যাটার চেয়ে কোয়ালিটিটাকে আমি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।

কর্মী বেশি গেলেও সেই তুলনায় দেশে রেমিট্যান্স কম আসছে এর কারণ কি জানতে চাইলে তিনি ব্যাখা করে বলেন, আমাদের মাথাপিছু রেমিট্যান্স কম। সন্তোষজনক না। আমি এক কোটি ২০ লাখ লোকের বিপরীতে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স পাচ্ছি আমাদের চেয়ে কম লোক পাঠিয়ে বেশি রেমিট্যান্স পাচ্ছে ফিলিপিন্স। নেপালের মাথাপিছু রেমিট্যান্স আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। সো আমাদের টার্গেট হবে মাথাপিছু রেমিট্যান্স বাড়ানো। যাতে আমি কম লোক দিয়ে, ১০ জন লোক দিয়ে যা আর্ন করি সেটা যাতে এক দুইজন লোক দিয়ে অথবা পাঁচজন লোক দিয়ে করতে পারি। এর জন্য আমাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে লোকজনকে দক্ষ করতে হবে। তারা যখন বিদেশ যাবে সেই চাকরির শর্তগুলোকে সুন্দর করা। আজকে যদি আমি সব দেশের মিনিমাম ওয়েজগুলোকে (মজুরি) বাস্তবায়ন করতে পারি। কেউই মিনিমাম ওয়েজের নিচে পাবে না। কিন্তু এখন তো একজনকে বিদেশ নিয়ে যাচ্ছে। সেই কর্মী ঠিকমতো বেতন পাচ্ছে না। আবার যেটা পাচ্ছে সেটা সাবসিসটেন্স অ্যালাউন্সও যদি তারা না পায় তাহলে সে সেভ করবে কিভাবে? সো এই জিনিসগুলোর ওপর আমাদের দৃষ্টিটা বেশি। আমরা সবাইকে বলে দিয়েছি, সরকারের যেখানে মিনিমাম ওয়েজ আছে সেই ওয়েজগুলোকে আমাদের এনসিওর করতে হবে। এইগুলো করতে পারলে দেখা যাবে আমাদের মাথাপিছু রেমিট্যান্স অনেক বেড়ে যাবে।

সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক যাচ্ছে। এখন সৌদি সরকার বাংলাদেশীদের জন্য ভিসার সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে। এর কোনো প্রভাব আমাদের শ্রমবাজারে পড়বে কি না। এমন প্রশ্নের উত্তরে সচিব বলেন, এটার কিছু তো প্রভাব পড়বেই। আপনি ইন্টারন্যাশনালি বা বড় সময় ধরে যদি চিন্তা করেন তাহলে দেখা যাবে সৌদি আরবের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের রেসটিকশন আরোপিত হচ্ছে। তাদের নিজস্ব পলিসি। তারা তাদের নিজেদের লোকজনদের নিয়োগ করতে চায়, অনেকগুলো ক্ষেত্র বাড়াচ্ছে। যেমন- ক্যাশ রেজিস্টারে কোন নন সৌদি বসতে পারবে না। এ রকম ১০-১৫টি সেক্টর আছে, যেখানে আগে বিদেশীরা কাজ করত। এটা একটা বড় বাধা। সৌদি তেলের অবস্থা খারাপ। তাদের এমপ্লয়মেন্টের অবস্থা খারাপ। তাদের নিজস্ব কিছু ট্যাক্স পলিসি আছে। আগে যে ট্যাক্সটা একজন বিদেশীকে দিতে হতো না। এখন সেটা দিতে হচ্ছে। আপনাকে যদি বাড়তি ট্যাক্স দিতে হয়, সেভিংস কমে যায় তখন আপনি উৎসাহিত কম হবেন। আমি ১০০ টাকা আর্ন করেছি। আমি ঘরে কতটাকা নিতে পারব? তো আপস অ্যান্ড ডাউন থাকবেই। কিন্তু আমাদের মার্কেটে এখনো মূল যে শক্তিটা, সেটা হচ্ছে আমাদের কর্মীরা অনেষ্ট, কমিটেড। সো এই জায়গাগুলোতে থাকার ফলে আমাদের খুব বেশি শংকিত হওয়ার কারণ নেই।

মিসর সফর করে এলেন সেখানকার কি সম্ভাবনা দেখে এলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, মিসরে আমাদের জন্য কিছু স্পেশাইলজড সেক্টর আছে। সেটা হচ্ছে গার্মেন্ট সেক্টর। এখানে আমাদের লোক পাঠানোর সুযোগ আছে। এখানেও তারা অলিখিত রেসটিকশন দিয়ে রেখেছে। তারা এই মুহূর্তে ভিসা দিচ্ছে না। এটাকে আমরা কূটনৈতিকভাবে সমাধান করব। এখানে সংখ্যা অনেক হবে না। তবে কোয়ালিটি হাই স্কিল বা মিডিয়াম স্কিল লোক যাবে। তিনি বলেন, মিসরে দ্বিতীয় যে সমস্যা গিয়ে দেখলাম সেটা হচ্ছে সেখানকার শ্রমিকরা ব্যাংকিং চ্যানেল না থাকায় বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠাতে পারে না। আমাদের এখন এসব সমস্যা উৎরানোর চেষ্টা করতে হবে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের সর্বশেষ অবস্থা কি। এ নিয়ে ঢাকায় রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক ও তাদের প্রতিনিধিরা প্রতিনিয়ত ‘সিন্ডিকেট’ ঠেকাতে প্রতিবাদ সভা ও সংবাদ সম্মেলন করছেন। তাদের আশ্বস্ত করতে আপনি কী বলবেন- জানতে চাইলে সচিব ড. মুনিরুছ সালেহিন বলেন, আমাদের যে এমওইউ আছে এর বাইরে আমরা কিছু করব না। আমাদের নিয়ন্ত্রণ যেখানে আছে আমরা এটুকুই করব। মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে ডাটাবেজ কবে থেকে শুরু হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা আমরা খুব তাড়াতাড়ি শুরুর ঘোষণা দেবো। ডাটাবেজ টিকে থাকবে কি না এমন আশঙ্কার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, টিকে থাকার জন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। ডাটাবেজটা আজকে যদি পপুলেটেড হয় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী এখানে অন্তর্ভুক্ত থাকে তাহলে না টেকার তো কোনো কারণ নেই। এ ধরনের কাজ তো এমন না আমরা করি নাই। করেছি। করোনার সময়ও আমাদের ডাটাবেজ থেকে কর্মীদের নাম পাঠালাম। তারা লিস্টেট হলো। টিকা পেলো। এটা নিয়ে আশাবাদী হওয়াটাই উচিত আমাদের।


আরো সংবাদ


premium cement