১৬ মে ২০২২
`

চালকদের অসুস্থ প্রতিযোগিতাতেই চাপা পড়ে নিহত হয় রাকিব

আজমেরী গ্লোরী বাসটি চালায় হেলপার
-

আজমেরী গ্লোরী নামে একই কোম্পানির দুই বাসের চালক কে কার আগে পরের স্টপেজে পৌঁছাবে চলছিল তারই প্রতিযোগিতা। আর সেই প্রতিযোগিতার মধ্যেই চাপা পড়ে প্রাণ হারায় ১৪ বছরের কিশোর রাকিবুল হাসান। অসুস্থ বাবা আর গৃহকর্মী মায়ের সংসার চলত পথে পথে মাস্ক বিক্রি করে রাকিবের উপার্জনে। কিন্তু দুই বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মুহূর্তেই সব শেষ হয়ে যায়। ঘটনার ছয় দিন পর আজমেরী গ্লোরী বাসের দুই চালককে গ্রেফতার করেছে র্যাব। গ্রেফতারকৃতরা হলেন- মো: মনির হোসেন (২৭) ও মো: ইমরান (৩৪)। র্যাব জানায়, মনির হোসেন আজমেরী গ্লোরী পরিবহনের একটি বাসের হেলপার। তার বৈধ কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না। চালকের অনুপস্থিতিতে তিনি বাসটি চালাচ্ছিলেন। এ ছাড়া অন্য বাসের চালক ইমরানের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকলেও তিনি ছিলেন মাদকাসক্ত। চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালানোর নিয়ম না থাকলেও অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ের কারণেই এমন সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে বলে দাবি করেছেন র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
গতকাল দুপুরে রাজধানীর কাওরানবাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, গত ২০ জানুয়ারি মগবাজার মোড়ে বিকেল ৫টার দিকে আজমেরী গ্লোরী পরিবহনের দু’টি বাসের মধ্যে চাপা পড়ে আহত হয় রাকিবুল হাসান (১৪) নামে এক কিশোর। ঘটনাস্থল থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। দুর্ঘটনা পরবর্তীতে দুই ঘাতক ড্রাইভার বাস দু’টি রেখে পালিয়ে যায়। নিহতের পরিবার ওই রাতেই সড়ক ও পরিবহন আইনে রমনা মডেল থানায় একটি মামলা করে। র্যাব জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে। তারই ধারাবাহিকতায় র্যাব-৩ এর একটি দল মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর পল্টন এবং মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর এলাকা অভিযান চালিয়ে আজমেরী গ্লোরী পরিবহনের দুই বাসের চালককে গ্রেফতার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার দু’জনই ঘটনায় তাদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য দেয়।
কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, গ্রেফতার মনির হোসেন জানিয়েছে, ইতঃপূর্বে সে পাঁচ বছর মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত ছিল। গত তিন মাস আগে বাংলাদেশে তার নিজ গ্রামের বাড়ি ভোলাতে আসে এবং প্রায় দেড় মাস আগে ঢাকাতে কর্মসংস্থানের জন্য আসে। এক মাস আগে থেকে আজমেরী গ্লোরী গাড়ির চালকের সাথে ওই গাড়িতে দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মজুরিতে হেলপারের কাজ শুরু করেন। তিনি মাঝে মধ্যে বাসটি নিজেও চালাতেন। ঘটনার দিন বিকেল ৪টার দিকে আজমেরী গ্লোরী পরিবহন (ঢাকা মেট্রো-ব-১৫-৫৭৮৭) সদরঘাট থেকে গাজীপুর চন্দ্রার উদ্দেশে গাড়ির মূল চালক চালিয়ে নিয়ে আসেন। পথিমধ্যে চালক সুমন গুলিস্তানে এসে গাড়িটি হেলপার মনির হোসেনের দায়িত্বে দিয়ে যান। মনির গাড়িটি চালিয়ে মগবাজার মোড়ে নিয়ে আসে।
জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতাররা জানায়, মগবাজার মোড়ের সিগন্যাল ছেড়ে দিলে দ্রুত গাড়ি দু’টি এগিয়ে যাচ্ছিল, তাদের উদ্দেশ্য ছিল পরবর্তী স্টপেজে যে আগে পৌঁছাতে পারবে সে বাসের জন্য অপেক্ষারত বেশিসংখ্যক যাত্রীকে তার বাসে নিতে পারবে। এমতাবস্থায় এক গাড়ি অপর গাড়িটিকে ওভারটেক করার সময় দুই গাড়ির মাঝখানে চাপা পড়ে ওই কিশোর। ঘটনার পরপরই দুই চালক মনির হোসেন ও ইমরান হোসেন বাস দু’টি রেখে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
গ্রেফতার ইমরানের বিষয়ে র্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, ইমরান ১০-১২ বছর ধরে আজমেরী গ্লোরী পরিবহনের বাস চালিয়ে আসছে। বাসটি (ঢাকা মেট্রো-ব-১৫-৬০-৫৬) সে আনুমানিক দুই বছর ধরে চালাচ্ছে। তিন বছর আগে সে ড্রাইভিং লাইসেন্স পায়। মালিকের কাছ থেকে দৈনিক ৩ হাজার ৫০০ টাকা হারে বাসটি নিয়ে সে ভাড়ায় চালানো শুরু করে। ঘটনার দিন ৪টার দিকে যথারীতি বাসটি নিয়ে সদরঘাট থেকে গাজীপুর চন্দ্রার উদ্দেশে রওনা হয়। মগবাজারে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়।
কমান্ডার মঈন বলেন, গ্রেফতার ইমরান মাদকাসক্ত। তার বিরুদ্ধে ২০২১ সালে কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে খন্দকার মঈন বলেন, সম্প্রতি আন্তঃজেলা গণপরিবহনের চেয়ে ঢাকায় চলাচলকারী বাসেই বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে। ইতঃপূর্বে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর দুর্ঘটনার দায়ী চালক হেলপারদের র্যাব গ্রেফতার করেছে। তাতে স্পষ্ট হয়েছে যে, চালক-হেলপারদের প্রতিযোগিতামূলক ও বেপরোয়া মানসিকতা এবং চুক্তিভিত্তিক বাস চালনার কারণে অর্থলোভে দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। এ ক্ষেত্রে মালিক, চালক, হেলপারদের পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীদেরও সাবধান ও সচেতনতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।


আরো সংবাদ


premium cement