১৬ মে ২০২২
`

সূচকের সাথে কমেছে লেনদেন পেপারবিহীন যুগে ডিএসই

-

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মো: ইউনুসুর রহমান বলেছেন, দেশের বিনিয়োগকারীদের বাজারের প্রতি আস্থার (কনফিডেন্স) অভাব রয়েছে। এই আস্থা বাড়াতে হলে স্টেকহোল্ডারদেরকেই ভালো কিছু করে দেখাতে হবে। যাতে তারা বিশ^াস করে মানুষ আমাদের বিশ^াস করে। তাদের আস্থার জায়গা বড় ধরনের জাগরণ তৈরি করতে হবে। তবেই তারা পুঁজিবাজারে আসবে এবং জিডিপিতে আমাদের মার্কেট ক্যাপিটাইলাইজেশন বাড়বে।
গতকাল পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের সংগঠন ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরামের (সিএমজেএফ) নবনির্বাচিত কমিটি সাথে এক বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর নিকুঞ্জে ডিএসইর কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসময় সংগঠনের সভাপতি জিয়াউর রহমান, সাধারণ সম্পাদক আবু আলী, ডিএসইর পরিচালক শাকিল রিজভি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
ডিএসইর চেয়ারম্যান বলেন, এখন পর্যন্ত দেশের বাইরে আমাদের চারটি রোড শো হয়েছে, এর মাধ্যমে আমরা বিদেশী কোম্পানিগুলোকে দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে আহবান জানিয়েছি। আমি লন্ডন রোড শোতে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে একটি উপলব্ধি আমার মাথায় এসেছে। এই যে কোম্পানিগুলোর সাথে আমরা বসলাম মার্কেটে আসার জন্য। এটা ঠিক আছে। বিদেশী বিনিয়োগ দেশে আনবো এটা আমাদের চেষ্টা হওয়া উচিত। সেটার একটা ফলাফলও একসময় পাব। কিন্তু আমার দেশের মধ্যে অনেক রিসোর্স ছাড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। যেগুলো এখন এখানে আনতে পারছি না। দেশে দুই লাখ রেজিস্টারড কোম্পানি আছে। তার মধ্যে ৫০ হাজার কোম্পানি এনবিআরে ট্যাক্স দেয়। অথচ ডিএসইতে লিস্টেট রয়েছে মাত্র পৌনে ৪০০ কোম্পানি।
এখন বাকি কোম্পানিগুলোকে আমরা পর্যায় ক্রমে ডাকব। তবে এটি যেন একটি বৈঠকে মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে সে জন্য কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এটির ওপর একটা রিপোর্ট তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছি। এরপর একাধিক টিম তৈরি করে ভাগ ভাগ করে যোগাযোগ চালিয়ে যাবেন কর্মকর্তারা। বছর শেষে যদি আমরা পাঁচটি কোম্পানিকেও লিস্টেড করতে পারি সেটাই হবে আমাদের প্রকৃত সফলতা।
বিদেশীরা আমাদের দেশে বিনিয়োগ করবে আবার যখন অস্থা খারাপ দেখবে টাকা তুলে চলে যাবে। কিন্তু দেশের বিনিয়োগকারীরা তা করবেনা। সে দেশেই থাকবে।
পুঁজিবাজার হবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের প্রধান খাত। এটাই নিয়ম। কিন্তু বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে গত এক বছরে মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন ৮০ শতাংশ বাড়ার পরও আমাদের সুখী হওয়ার কোনো জায়গা আছে? মোটেও নেই। কারণ এখনো আমাদের মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন জিডিপির ২০ শতাংশের নিচে। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশে ৯০ শতাংশ, এমনকি যে পাকিস্তান সবসূচকে আমাদের পিছনে রয়েছে তাদের পুঁজিবাজারও এখন ইমার্জিং মার্কেটে রূপান্তর হয়েছে। আর আমরা এখনো ফ্রন্টিয়ার মার্কেট রয়ে গেছি। পাকিস্তানের চেয়ে কোন জায়গায় আমরা নিচে থাকব বা খারাপ থাকব এটা কি কেউ কল্পনা করবে। এটা কি মেনে নেয়া যায়? কিন্তু বাস্তবতা হলো আমরা পিছনে পড়ে আছি। ফ্রন্টিয়ার, ইমার্জিং ও ডেভেলপিং- তিন ধরনের মার্কেটের মধ্যে আমরা প্রথম পর্যায় অর্থাৎ ফ্রন্টিয়ার মার্কেটে রয়েছি। তবে এর থেকে উত্তরণের জন্য ইতোমধ্যে আমরা কিছু কাজ করেছি। আমরা আরো সামনের দিকে যাবো। তার জন্য আপনাদের সহযোগিতা প্রয়োজন। আমাদের একটা দুঃখের জায়গা হলো আমরা সব জায়গায় কিছু কিছু কাজ করতে পেরেছি। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের আস্থার জায়গাটাতে আমরা খুব একটা ধাক্কা দিতে পারি নাই। আমরা বিএএসএম, বিআইসিএম করেছি। কিন্তু শুধু এইটা দিয়ে কনফিডেন্স (আস্থা) বাড়বে না। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মানুষ শেয়ার মার্কেট সম্পর্কে জানবে। কনফিডেন্স বাড়াতে হলে আমরা যারা অ্যাক্টর বা স্টেকহোল্ডার রয়েছি আমাদের কাজ করে দেখাতে হবে, যাতে মানুষ আমাদের বিশ^াস করে। এখনো বাংলাদেশের শেয়ার মার্কেট ও ইন্স্যুরেন্স- এই দুইটা জায়গায় এমন অবস্থা বিরাজ করছে যে, সাধারণ মানুষ ভাবতে পারে না যে এখানে ভালো মানুষ রয়েছে। তারা মনেই করে যে এখানে কিছু অসাধু ব্যক্তি রয়েছে। যারা মানুষের সাথে প্রতারণা করে। সেই ধারণাটা আমাদের ভেঙে দিতে হবে। আমারা যারা কাজ করি আমাদের ভালো কাজ করতে হবে। যাতে সমালোচনা না থাকে। এ ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ভূমিকাও রয়েছে। তারা আমাদের ভালো কাজগুলো তুলে ধরতে হবে।
গতকালের বাজার : সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবস গতকাল প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) মূল্যসূচক কমেছে। সেইসাথে কমেছে লেনদেনের পরিমাণ। গতকাল ডিএসইর প্রধান সূচক কমেছে ১৩ পয়েন্ট ও সিএসইর প্রধান সূচক কমেছে ৩৮ পয়েন্ট।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, সূচক ও লেনদেন কমলেও ডিএসইতে নয় কোম্পানির শেয়ার দাম বেড়ে দিনের সর্বোচ্চ সীমা স্পর্শ করেছে। এরপরও লেনদেনের এক পর্যায়ে এ ৯ কোম্পানির শেয়ার বিক্রয় আদেশের ঘর শূন্য হয়ে পড়ে। অর্থাৎ যাদের কাছে কোম্পানি চারটির শেয়ার আছে তারা দিনের সর্বোচ্চ দামেও বিক্রি করতে চাননি।
এদিন ডিএসইতে লেনদেন শুরু হয় বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ার মাধ্যমে। ফলে ডিএসইতে লেনদেন শুরু হতেই প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ১৩ পয়েন্ট বেড়ে যায়। লেনদেনের ১০ মিনিটের মাথায় সূচকটি ৪০ পয়েন্ট বেড়ে যায়। কিন্তু লেনদেনের শেষ দেড় ঘণ্টায় বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমে। এতে উত্থানের বদলে পতনে রূপ নেয় সূচক। দিনের লেনদেন শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় দশমিক ১৩ পয়েন্ট কমে ৭ হাজার ৩২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অপর দুই সূচকের মধ্যে বাছাই করা ভালো কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ১ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ৬১২ পয়েন্টে অবস্থান করছে। আর ডিএসই শরিয়াহ্ সূচক আগের দিনের তুলনায় দশমিক ৫৬ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৫০৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
দিনভর ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে এক হাজার ১১৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। আগের দিন লেনদেন হয় এক হাজার ১১৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা। সে হিসাবে লেনদেন কমেছে এক কোটি ৬৪ লাখ টাকা।
ডিএসইতে দাম বাড়ার তালিকায় নাম লিখিয়েছে ১৫৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট। বিপরীতে দাম কমেছে ১৫৭টির। আর ৬৬টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। দাম বাড়ার তালিকায় স্থান করে নেয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৯টির শেয়ার দিনের দাম বাড়ার সর্বোচ্চ সীমা স্পর্শ করে।
অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই কমেছে ৩৮ পয়েন্ট। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ২৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। লেনদেনে অংশ নেয়া ৩০৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৪০টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ১৩৩টির এবং ৩৬টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
পেপারবিহীন যুগে ডিএসই:
পেপারবিহীন যুগে পৌঁছতে যাচ্ছে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। প্রাথমিকভাবে আংশিক পেপারবিহীন কার্যক্রম শুরু করেছে ডিএসই। পর্যায়ক্রমে ডিএসইর সব কার্যক্রম পেপারবিহীন করা হবে। বুধবার ডিএসইর নিকুঞ্জ কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানানো হয়। পেপারবিহীন ডিএসই কাজকর্ম উদ্বোধন উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
ডিএসইর পরিচালক মো: শাকিল রিজভীর সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ইউনুসুর রহমান। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন ডিএসইর পরিচালক সালমা নাসরীন। প্যানেল আলোচক হিসেবে ছিলেন বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমান, ডিবিএর সভাপতি রিচার্ড ডি রোজারিও, বিএমবিএ সভাপতি ছায়েদুর রহমান এবং সিএমজেএফ সভাপতি জিয়াউর রহমান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ডিএসইর উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. শফিকুর রহমান।
ডিএসই পেপারবিহীন হওয়ার ফলে কাগজে চিঠিপত্র চালাচালি বন্ধ হয়ে যাবে। এরই মধ্যে ডিএসইর কিছু বিভাগে এর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে, যা ধীরে ধীরে সব স্টেকহোল্ডারের সাথে শুরু করা হবে বলে অনুষ্ঠানে ডিএসইর পক্ষ থেকে জানানো হয়।
মো: ইউনুসুর রহমান বলেন, ডিএসইতে আসার আগে শুনতাম এখানে শতভাগ অটোমেটেড সিস্টেম। কিন্তু পরে দেখলাম বাস্তবে তা নেই। তবে অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিশন শেয়ারবাজারকে ডিজিটালাইজেশন করার জন্য অনেক কাজ করেছে। ফলে বিগত এক বছরে শেয়ারবাজারে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। সার্বিকভাবে শেয়ারবাজার নিয়ে গর্ব করার জায়গায় নেই। এখনো অনেক দূরে পড়ে রয়েছে শেয়ারবাজার।
অনুষ্ঠানে ক্লাউডভিত্তিক অনলাইনে তথ্য দেওয়া- নেয়ার ঝুঁকির বিষয়ে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তারিক আমিন ভূঁইয়া বলেন, নিজস্ব ব্যবস্থাপনার পরও বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ হ্যাকিংয়ের ঘটনার পরে নিরাপত্তার বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। তবে আমরা ক্লাউডভিত্তিক তথ্য দেওয়া-নেওয়া করলেও হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি কম। জমা করা তথ্য হ্যাকিং হওয়ার সুযোগ নেই। তবে তথ্য দেওয়া-নেয়ার সময় ঝুঁকি আছে।


আরো সংবাদ


premium cement