২৭ নভেম্বর ২০২১, ১২ অগ্রহায়ন ১৪২৮, ২১ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরি
`

শ্রমবাজার হারানোর শঙ্কা মালদ্বীপে

-

পুরো মালদ্বীপে ছয় লাখ লোকের বাস। এর মধ্যে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে বাংলাদেশীর সংখ্যা দেড় লাখের উপরে। অলস মালদ্বীপবাসীদের কাছে খুবই জনপ্রিয় পরিশ্রমী বাংলাদেশী শ্রমিকরা। তবে দুই বছর ধরে বাংলদেশীদের জন্য মালদ্বীপের ভিসা বন্ধ থাকায় তাদের এই শ্রমবাজার হাতছাড়া হতে যাচ্ছে। এই সুযোগে ভারতীয়দের দখলে চলে যাচ্ছে এই শ্রমবাজার। মালদ্বীপ প্রবাসী বাংলাদেশীরা জানান এই তথ্য।
৮০’র দশক থেকে মালদ্বীপে আসা শুরু বাংলাদেশীদের। আর ২০০৪ সালের পর ব্যাপক হারে বাংলাদেশীদের আগমন এই দেশে। বর্তমানে বাংলাদেশীদের কেউ মালেতে বিভিন্ন দোকান বা হোটেলে কাজ করে। কারো কর্মস্থান বিভিন্ন নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনেও চাকরি করেন অনেকে। সাগরে মাছ ধরা, এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে চলাচলকারী মালবাহী জাহাজে চাকরি করছেন তারা। বেতন বাংলাদেশী টাকায় ৩০-৩৫ হাজার টাকার মতো। ভারত মহাসাগরের এই অংশজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রিসোর্টগুলোতেও কাজ করেন প্রচুর বাংলাদেশী। রিসোর্টের চাকরিতে প্রচুর পয়সা। উল্লেখ্য, এক মালদ্বীপের রুপিয়া সমান বাংলাদেশের পাঁচ টাকার চেয়েও বেশি।
২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশী শ্রমিকদের ভিসা দেয়া বন্ধ রেখেছে মালদ্বীপ সরকার। ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে করোনা হানা দেয়ার পর মালদ্বীপও এতে আক্রান্ত হয়। তখন বিদেশীদের আসা নিষিদ্ধ হয়ে যায় হাজার ১১৯২ দ্বীপের এই দেশে। উল্লেখ্য, লোক বসতি ১৮৭ দ্বীপে। করোনার ফলে রিসোর্টগুলোসহ অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরি হারাতে থাকে বাংলাদেশীরা। ফলে দেশে ফিরে যাওয়া এই বাংলাদেশীরা পরে আর মালদ্বীপে ফিরে আসার ভিসা পায়নি। এই সুযোগে ভারত তাদের শ্রমিকদের এই দেশে পাঠাতে শুরু করেছে। প্রবাসীদের দেয়া তথ্য, দক্ষিণ ভারতের জনগণকেই মালদ্বীপে পাঠাচ্ছে ভারত।
বর্তমান মালদ্বীপ সরকারও এ কাজে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা বাংলাদেশীদের ভিসা দেয়া বন্ধ রাখলেও ভারতীয়দের ভিসা দেয়া বন্ধ হয়নি। তাই একে একে বাংলদেশীদের জায়গা দখলে নিচ্ছে ভারতীয়রা। অভিযোগ প্রবাসী বাংলাদেশীদের। শান্তির দেশ মালদ্বীপ। সমুদ্রের বুকে ভেসে থাকা এই দেশে সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত হানার নজির নেই। বসবাসের দারুণ এই উপযোগী দেশে বাংলাদেশীরাও বেশ ভালো আছেন। প্রায় শতাধিক বাংলাদেশী মালদ্বীপের মহিলা বিয়ে করেছেন। অবশ্য কেউ কেউ আবার বিয়ে করে মালদ্বীপে স্ত্রী-সন্তান রেখে বাংলাদেশে পালিয়েছেন। এদের কারণে এখন প্রবাসী বাংলাদেশীদের মালদ্বীপের মেয়েদের বিয়ে করার অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। এ ছাড়া প্রচুর বাংলাদেশী মালদ্বীপে ট্যুরিস্ট ভিসায় এসে অবৈধভাবে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। এসব কারণেই বাংলাদেশী শ্রমিকদের মালদ্বীপের ভিসা দেয়া বন্ধ রাখা হয়েছে। জানান, মালদ্বীপের সাংবাদিক ওজোনে। আগে বাংলাদেশী মহিলা শ্রমিকরা চাকরি করতেন এই দেশে। কিছু অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার জন্য এখন বাংলাদেশী মহিলা শ্রমিকদের মালদ্বীপে আসা নিষিদ্ধ। এই তথ্য দেন প্রবাসী বাংলাদেশীরা। কয়েকজন প্রবাসীর অভিযোগ, মালদ্বীপে বাংলাদেশীদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় আর বাংলাদেশীদের আসতে দেয়া হচ্ছে না।
বাংলাদেশীরা নিজেরাই নিজেদের সুনাম নষ্ট করছে। প্রচুর বাংলাদেশী খাবারের হোটেল রয়েছে মালেতে। এসব হোটেলে মেয়াদোত্তীর্ণ মাছ-গোশত দিয়ে খাবার তৈরি করা হয়। বাংলাদেশীরাই দেন এই তথ্য। রিসোর্টে পাঠানোর সময় যেসব মাছ ও গোশত মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যায় সেগুলোই বাংলাদেশী হোটেলের খাবারের উপকরণ। রিসোর্টে ব্যবহার করা পোড়া তেল বাংলাদেশী খাবারের হোটেলে ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশীরাই বেশি আসেন এসব হোটেলে। আবার উন্নত মানের রেস্টুরেন্টও রয়েছে বাংলাদেশীদের। এই প্রবাসীদের নিজেদের রান্না করে খাওয়ার সময় খুবই কম। তাই বাংলা হোটেলই ভরসা। প্রবাসী বাংলাদেশীরা মালদ্বীপে বিভিন্ন অপরাধের সাথেও জড়িয়েছেন। কয়েকজন বাংলাদেশীর খুন হওয়ার নেপথ্য তাই।
মালদ্বীপ প্রবাসী বাংলাদেশীদের দেশে টাকা পাঠাতেও বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। তারা ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে পারে না ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না থাকায়। বাংলাদেশী কোনো ব্যাংকও নেই। ন্যাশনাল ব্যাংক অব বাংলাদেশের যে অফিস আছে মালেতে তা মূলত ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন মানি ট্রান্সফারের মতোই কাজ করে। এতে মালদ্বীপের রুপিয়া ডলারে পরিবর্তন করে পাঠাতে গিয়ে লোকসানে পড়তে হয় বাংলাদেশীদের। দেড় লাখের বেশী বাংলাদশী মালদ্বীপে। এরপরও বাংলাদেশের কোনো ব্যাংক নেই। অথচ সামান্য কিছু পাকিস্তানি কাজ করে এই দেশে। তাদের সুবিধার্থে পাকিস্তানের হাবিব ব্যাংকের শাখা খোলা হয়েছে মালেতে। রয়েছে ব্যাংক অব ইন্ডিয়া এবং শ্রীলঙ্কার সিলন ব্যাংকও। ন্যাশনাল ব্যাংক অব বাংলাদেশের মানি ট্রান্সফার (মালদ্বীপ) প্রাইভেট লিমিটেডের সিইও মাসুদুর রহমান জানান, ‘ন্যাশনাল ব্যাংকের শাখা মালেতে খোলা যায় কি না এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য বাংলাদেশ থেকে ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মালদ্বীপ আসার কথা ছিল; কিন্তু মাঝে বাংলাদেশে করোনা বেড়ে যাওয়ায় উনার আসা হয়নি।’
অবশ্য মালদ্বীপে বাংলাদেশীদের শ্রমবাজার নষ্ট হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। আশ্বস্ত করেন মালদ্বীপের বাংলাদেশ হাইকমিশনার মোহাম্মদ নাজমুল হাসান। তার মতে, ‘২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারী ছড়িয়ে পড়ার আগে মালদ্বীপে অবস্থানরত বাংলাদেশী অনিয়মিত (অবৈধ) শ্রমিকদের নিয়মিত করার উদ্যোগ নেয় মালদ্বীপ সরকার। এরপর করোনা শুরু হয়ে গেলে মালদ্বীপের অর্থনীতির উপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। সে সময় কর্মহীন হয়ে পড়েন প্রচুর বাংলাদেশী। তখন অনেক বাংলাদেশীকে টিকিট দিয়ে দেশে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। তাদের ফেরত আসা আর হয়নি’ তিনি যোগ করেন, ‘এখন ফের মালদ্বীপে সব প্রতিষ্ঠান চালু হয়েছে। নির্মাণকাজও শুরু হয়েছে। এসব কাজে বাংলাদেশী শ্রমিকদের ব্যাপক চাহিদা ও সুনাম। তারা অন্য দেশের শ্রমিকদের মতো নয়। মালিক যখনই তাদের কাজের জন্য বলে তারা কাজে সম্মতি দেয়। প্রচুর পরিশ্রমীও তারা। তাই বাংলাদেশীদের শ্রমবাজার নষ্ট হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।’ মালদ্বীপে বাংলদেশ হাইকমিশন আগে ছিল মালেতে। এখন তা মালে থেকে ফেরিতে ১৫ মিনিটের দূরত্বের অবস্থান হুনহুমালেতে। আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে এই হুনহুমালেকে। একেবারেই খোলামেলা। এই দ্বীপের পরিসর বর্ধিত করা হয়েছে সমুদ্র ভরাট করে। তৈরি করা হচ্ছে কূটনৈতিক জোন হিসেবে।
বাংলাদেশ হাইকমিশনার এরপরই জানান, ‘আসলে মালদ্বীপ সরকার এখন চাচ্ছে স্কিলড বা দক্ষ জনশক্তি আমদানি করতে। বাংলাদেশী শ্রমিকরা এই কাতারে পড়ে না। তাই তাদের আসা বন্ধ রয়েছে। আশা করি অচিরেই তা চালু হয়ে যাবে।’ বাংলাদেশ হাইকমিশনারও চান দেশ থেকে আরো বেশি করে স্কিলড বা দক্ষ জনশক্তি আসুক। এতে তারা বেশি মাত্রায় বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠাতে পারবেন। অবশ্য তিনি স্বীকার করেন এখানে ভারতের কিছু প্রভাব তো আছেই।
মালদ্বীপে ২০০ জনের মতো বাংলাদেশী ডাক্তার চাকরি করছেন। এদেরই একজন চক্ষুডাক্তার মুক্তার আলী। প্রবাসী বাংলাদেশীদের কাছে খুবই জনপ্রিয় তিনি। আরেক বাংলাদেশী আহমেদ মুত্তাকি। তিনি মালদ্বীপের মেয়ে বিয়ে করেছেন। প্রতিষ্ঠিত করেছেন মিয়ানজ ইন্টারন্যাশনাল কলেজ। পুরো মালদ্বীপে এই কলেজের ১৮টি শাখা আছে। তিনি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও গ্রুপ সিইও। এই গ্রুপের আটটি প্রতিষ্ঠান।
মালদ্বীপে কোনো বিদেশী প্রতিষ্ঠান খুলতে চাইলে এর মালিকানা হতে হবে মালদ্বীপের কোনো নাগরিকের। এভাবেই বাংলাদেশীরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়েছেন। আবার কিছু বাংলাদেশী স্থানীয়দের মাধ্যমে প্রতারিত হওয়ার ঘটনাও আছে। বাংলাদেশীরা অবশ্য খুব একটা পছন্দ করে না স্থানীয় দিভেহিদের (মালদ্বীপবাসীর উপাধি)। কাজ করিয়েও তাদের টাকা না দেয়ার বহু ঘটনা আছে। এই দেশে বাংলাদেশীদের প্রভাব এত বেশি যে, দোকান, মসজিদ বা অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় দিভেহি ভাষার সাথে বাংলা ভাষায় লেখা বিভিন্ন ঘোষণা দেখা যায়।
বাংলাদেশীদের কর্মক্ষেত্রে প্রতারিত হওয়া এবং একই কাজ করেও ভারতীয় বা শ্রীলঙ্কানদের চেয়ে বেতন কম হওয়ার জন্য বাংলাদেশী দালালরাই দায়ী। অভিযোগ চাঁদপুরের ফয়সালের। তা ছাড়া অন্য দেশের লোকদের দেখার জন্য সে দেশের অভিভাবক রয়েছে। নেই বাংলাদেশীদের। তথ্য দেন ফয়সাল।
এখনও মালদ্বীপে হাজার হাজার অবৈধ বাংলাদেশী কাজ করছেন। মালদ্বীপ পুলিশ তাদের কিছুই বলে না। তবে অপরাধ করলে রক্ষা নেই।



আরো সংবাদ


যে কারণে ঝর্ণাকে আদালতে হিজাব খুলতে নিষেধ করলেন মামুনুল হক (১৬৩৯৪)করোনায় মৃত্যু এক দিনে তিন গুণ বৃদ্ধি (১২৪৬৩)খালেদা জিয়াকে যে ৩ দেশে নিয়ে যেতে বলেছেন চিকিৎসকরা (১১৮৬৬)মেয়র পদ থেকেও বরখাস্ত হলেন জাহাঙ্গীর (৯৮৫৯)সেরা করদাতা হলেন আইজিপি বেনজীর আহমেদ (৬৩২১)১০৭ বছরের যৌথ ব্যবসায় ভাঙন, ১,৫০০ কোটি ডলারের সম্পত্তি নিয়ে লড়াই হিন্দুজা ভাইদের (৬০৬৩)পাকিস্তান ক্রিকেট দলের ২১ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন, যে আদেশ দিলো আদালত (৫৯০১)মুক্তিযোদ্ধাদের ১০ শতাংশ কোটার বিধান বাতিল করলো হাইকোর্ট (৫৮১৩)গাজীপুরে মেয়র জাহাঙ্গীরের দলীয় পদে আতাউল্লাহ (৫৮০৩)আইএস খোরাসানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সৈন্য পাঠাল তালেবান (৫১৪৬)