২৮ অক্টোবর ২০২১
`

অনিবন্ধিত ঋণব্যবসা বন্ধের নির্দেশ

সারা দেশে সুদ কারবারিদের তালিকা চান আদালত
-

দেশজুড়ে গ্রামগঞ্জে সমবায় সমিতির নামে ছড়িয়ে পড়া অনিবন্ধিত ঋণের ব্যবসা বন্ধের পাশাপাশি জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। গতকাল বিচারপতি আবু তাহের মো: সাইফুর রহমান ও বিচারপতি মো: জাকির হোসেনের ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ সারা দেশে চড়া সুদে ঋণদাতা মহাজনদের চিহ্নিত করার নির্দেশনা চেয়ে করা এক রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে রুলসহ এ আদেশ দেন।
আদালতের আদেশে অনুমোদনহীন ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবসা নিয়ে তদন্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি বিশেষ কমিটি করতে বলা হয়েছে। আদেশের অনুলিপি পাওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে এ কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তদন্তের সময় যদি অননুমোদিত বা লাইসেন্স ছাড়া ক্ষুদ্র ঋণ কারবারি সমবায় বা কোনো অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, তাহলে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সেসব প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় বন্ধের পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এ ছাড়া আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে সুদ কারবারিদের তালিকা দিতে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই রিট মামলার বিষয়ে পরবর্তী আদেশের জন্য ৩০ নভেম্বর তারিখ ধার্য রাখা হয়েছে। আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন রিটকারী আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর উস সাদিক।
শুনানিতে সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন বলেন, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্র ঋণের অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ছাড়া আর করো সুদের ব্যবসা করার সুযোগ নেই; কিন্তু সারা দেশে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে দেদার উচ্চহারে সুদের ব্যবসা চলছে। আর এর শিকার হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এমনকি মধ্যবিত্তও।
শুনানিতে আদালত সনদ বাতিল করা ১৩৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোন কোন প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্র ঋণের কারবার করছে তা জানতে চান। আবেদনকারী আইনজীবী তা দেখাতে ব্যর্থ হলেও তিনি বলেন, মাইক্রোক্রেডিট অথরিটি চাইলে সুদের কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে এ অথরিটির কাছে অন্য কেউ অভিযোগ করতে পারবে না। অভিযোগ করতে হবে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের কর্তৃপক্ষকে। এসব কারণেই কিন্তু প্রতারক চক্র গড়ে উঠছে। মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছে। তদারককারী হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা আছে; কিন্তু তারা তো তদারক করছে না। এই জন্য তাদের নিষ্ক্রিয়তা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে রিটে।
এরপর আদালত বলেন, ‘এই যে এত দুর্বল দেশ, এই দুর্বল দিক দিয়ে আমরা সরকারকে কী দেবো, কী বলব? রাগীব (এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান রাগীব এহসান) নামের এক হুজুর আগে শিক্ষক ছিল। শিক্ষকতার টাকা দিয়ে হচ্ছে না। তখন ইসলামের দোহাই দিয়ে সুদমুক্ত হালাল টাকা, গুনাহ-পাপ এই সমস্ত কথা বলে মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে গেছে।’
এ সময় আইনজীবী সুমন বলেন, এগুলো চিহ্নিত হওয়া প্রয়োজন। এরা মানুষকে একেবারে ধ্বংস করে দিচ্ছে। মানুষ পথে বসে যাচ্ছে।
এরপর আদালত বলেন, এই ইস্যুটা আমাদের আরো গভীরভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। আমরা শুনেছি, বিষয়টা আমরা দেখব। একটা-দুইটা পত্রিকার রিপোর্ট দিয়ে হবে না। আরো অনেক কিছু দেখতে হবে। এটা খুবই জটিল বিষয়। এর সাথে কোন অথরিটি জড়িত, কী কী আইন আছে, সব দেখতে হবে।
গত ৭ সেপ্টেম্বর সারা দেশে চড়া সুদে ঋণদাতা মহাজনদের চিহ্নিত করার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে এই রিট আবেদন করেন সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। রিটে বলা হয়, দেশের প্রতিটি এলাকায়, প্রতিটি গ্রামে সমবায় সমিতির নামে সুদের ব্যবসা চলছে। আবার অনেকে ব্যক্তিগতভাবে ঋণ দেয়ার নামে উচ্চ হারে সুদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এসব ব্যবসার কোনো নিবন্ধন নেই তাদের। সাধারণ মানুষ এসব সুদ কারবারিদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে।
গত ২৮ আগস্ট একটি জাতীয় দৈনিকে ‘চড়া সুদে ঋণের জালে কৃষকরা’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে জনস্বার্থে তিনি রিট আবেদনটি করেন। এতে মহাজনদের উচ্চ হারে অনানুষ্ঠানিক ঋণপ্রথা নিষিদ্ধে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চাওয়ার পাশাপাশি রুল চাওয়া হয়; কিন্তু আদালত সোমবার আবেদনে সংশোধন এনে রুলসহ আদেশ দেন।
রুলে লাইসেন্স এবং অনুমোদন ছাড়া ক্ষুদ্র ঋণকারবারি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও তদারকিতে বিবাদিদের নীরবতা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে নাÑ তা জানতে চাওয়া হয়েছে। অর্থ সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান ও সমাজসেবা অধিদফতরের মহাপরিচালককে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
এর আগে গত সোমবার আইনজীবী সায়েদুল হক সুমন সম্পূরক আবেদনের মাধ্যমে দেশে কারা চড়া সুদের ব্যবসা করছে, কিভাবে ব্যবসা করছে, সে তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি থেকে পাওয়া তথ্যের বরাতে তিনি বলেন, ২০০৭ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ৭৪৬টি প্রতিষ্ঠান-সংগঠনকে ক্ষুদ্র ঋণের সনদ দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৩৪টি প্রতিষ্ঠান-সংগঠনের সনদ বাতিল করা হয়েছে।

 



আরো সংবাদ