২৮ জুলাই ২০২১
`

আলুবীজে বেসরকারি কোম্পানির থাবা

বছরে চাহিদা সাড়ে ৭ লাখ টন; ৩৫ হাজার টন সংগ্রহ হয় চুক্তিবদ্ধ চাষিদের কাছ থেকে; বাকি ৭ লাখ টনই কেনা হয় বেসরকারি কোম্পানি থেকে
-

বেসরকারি কোম্পানির থাবা পড়েছে বিএডিসি (বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন) আলুবীজ উৎপাদন প্রকল্পে। এর সাথে জড়িত খোদ বিএডিসির দুষ্টুচক্র। সরকারের চুক্তিবদ্ধ বীজ চাষিদের কৌশলে দমিয়ে রেখে সুবিধা দেয়া হচ্ছে বেসরকারি বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। নেপথ্যে মোটা অঙ্কের হিসাব-নিকাশ। ঋণ বিতরণ, নিম্নমানের ভিত্তি বীজ সরবরাহ, বীজের মূল্যনির্ধারণ এবং ক্রয়কৃত বীজের টাকা পরিশোধে নানা অনিয়ম-অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। বিএডিসির বৈরিতার কারণে চুক্তিবদ্ধ আলুবীজ কৃষকদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা। তবে কিছু অভিযোগের বিষয়ে বিপরীত কথা বলেছে, বিএডিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বিএডিসির আলুবীজ বিভাগের ব্যবস্থাপক ও প্রকল্প পরিচালক মো: আবির হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশে আলু উৎপাদন বছরে এক কোটি মেট্রিক টনের ওপরে। এই পরিমাণ আলু উৎপাদনে বীজ প্রয়োজন হয় প্রায় সাড়ে সাত লাখ টন। এর মধ্যে বিএডিসি আওতাভুক্ত চাষিদের কাছ থেকে বীজ সংগ্রহ হয় ৩৩-৩৫ হাজার মেট্রিক টন। বাকি সব আলুবীজের চাহিদা পূরণ হয় বেসরকারি কোম্পানি থেকে।
উল্লেখ্য, বিএডিসির কাছ থেকে ভিত্তি বীজ বা প্রত্যায়িত বীজ নিয়ে নিবন্ধিত চাষিরা আলুবীজ উৎপাদন করে থাকে। তাদের কাছ থেকে পরে সেই বীজ বিএডিসি সংগ্রহ করে তা সাধারণ কৃষকদের কাছে বিক্রি করে। বিএডিসিভুক্ত আলু চাষিরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিএডিসিভুক্ত প্রায় ১৫ হাজার চাষিকে ভিত্তি আলুবীজ ও প্রত্যায়িত আলুবীজ সরবরাহ করা হচ্ছে তার মান ভালো নয়। ফলে কৃষক এসব বীজ থেকে মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন করতে পারছেন না। এতে দিনের পর দিন বেসরকারি কোম্পানির বীজের ওপর কৃষক নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। বিএডিসির একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশেই বেসরকারি ওই সব কোম্পানিকে ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিলে সুযোগ দেয়া হচ্ছে বলে মনে করছেন চাষিরা।
বিএডিসি চুক্তিবদ্ধ আলুবীজ কৃষক ফোরাম, কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি রুহুল আমিন মিলন নয়া দিগন্তকে বলেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিএডিসি থেকে প্রতি একরে ৭২০ কেজি আলুবীজ, সার, কীটনাশক ও বালাইনাশক বাবদ বিএডিসির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে আমাদেরকে ঋণ দেয়া হয়েছিল ৪৫ হাজার টাকা। চাষিদের কাছ থেকে আলুবীজ ক্রয় করা হয়েছিল ‘এ’ গ্রেড প্রতি কেজি ২৩ টাকা ও ‘বি’ গ্রেড প্রতি কেজি ২২ টাকা দরে। কিন্তু চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রতি একরে ১২০০ কেজি আলুবীজ, সার, কীটনাশক ও বালাইনাশক বাবদ বিএডিসির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে আমাদেরকে ঋণ দেয়া হয় ৬৮ হাজার ৯০০ টাকা; যা গত অর্থবছরের চেয়ে প্রতি একরে ২৩ হাজার ৯০০ টাকা বেশি। বিগত (২০১৯-২০) অর্থবছরে বিএডিসি চাষিদের কাছ থেকে আলুবীজ সংগ্রহ করেছিল ‘এ’ গ্রেড ২৩ টাকা ও ‘বি’ গ্রেড ২২ টাকা দরে। বিএডিসি ওই একই আলু আমাদের কাছে চলতি অর্থবছরে ‘এ’ গ্রেড ৪০ টাকা ও ‘বি’ গ্রেড ৩৯ টাকা কেজি দরে বিতরণ করে। একই আলু দেশের সাধারণ চাষিদের মধ্যে বাজারজাত করা হয় ‘এ’ গ্রেড ৪৯ টাকা ও ‘বি’ গ্রেড ৪৮ টাকা দরে।
বিএডিসিভুক্ত এই আলু চাষি বলেন, চলতি অর্থবছরে বিএডিসির দেয়া ভিত্তি আলুবীজ ও প্রত্যায়িত আলুবীজের মান খারাপ থাকায় তা ক্ষেতে বপন করার পর প্রায় ৩০ শতাংশ জমির আলুবীজ পচে গাছ মরে যায়। ফলে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা থেকে আমরা অনেক কম আলুবীজ মাঠ থেকে সংগ্রহ করতে পেরেছি। তার অভিযোগ তিন বছর ধরে বিএডিসির নিজস্ব খামারে উৎপাদিত ভিত্তি বীজের মান খারাপ হওয়ায় বিএডিসির প্রত্যায়িত বীজের মানও খারাপ হচ্ছে। দেশে পরপর তিন বছর ধরে ভিত্তি বীজের মান কিভাবে খারাপ হচ্ছে তা বোধগম্য নয়। এর ফলে বর্তমানে বিএডিসি বীজের চেয়ে বেসরকারি সংস্থাগুলোর বীজ সাধারণ কৃষকের মধ্যে সাড়া ফেলেছে।
রহুল আমিন মিলন বলেন, চলতি বছর আলুবীজ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম। অধিক শ্রমিক, কীটনাশক ও বালাইনাশক লাগায় আমাদের উৎপাদন খরচ প্রতি কেজি ৩০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অতীতে বিএডিসি আলুবীজ উৎপাদন খরচের চেয়ে আলুবীজের মূল্য ২৫ শতাংশ বেশি দিয়েছিল। সেই হিসাবে এ বছর প্রতি কেজি আলুবীজের মূল্য হয় ৩৭.৫০ টাকা। কিন্তু গত ২৩ মে এক বিজ্ঞপ্তিতে আমাদের এ বছর আলুবীজের মূল্য ‘এ গ্রেড’ প্রতি কেজি ২২ টাকা এবং ‘বি গ্রেড’ প্রতি কেজি ২০ টাকা নির্ধারণ করে দেয় বিএডিসি। এতে আমরা লোকসানের শিকার হচ্ছি।
বিএডিসি আলুবীজ চুক্তিবদ্ধ কৃষক ফোরামের রংপুর জেলা সভাপতি ও তারাগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান লিটন নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রথমে প্রতি কেজি ‘এ’ গ্রেড ১৯ টাকা এবং ‘বি’ গ্রেড ১৬ টাকা, পরে অবশ্য তা যথাক্রমে ২২ টাকা ও ২০ টাকা করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের উৎপাদন খরচই কেজিতে প্রায় ৩০ টাকা পড়েছে। প্রতি কেজিতে ৮-১০ টাকা লোকসান হবে। আনিসুর রহমান লিটন বলেন, বর্তমান শেখ হাসিনার সরকার কৃষকবান্ধব। বীজ উৎপাদনকারী কৃষকরা যাতে লোকসানের শিকার না হন, লাভবান হন সে জন্য তার দৃষ্টি আর্কষণ করছি।
বিএডিসির আলুবীজ বিভাগের ব্যবস্থাপক ও প্রকল্প পরিচালক মো: আবির হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশে আলু উৎপাদন হয় এক কোটি টনের বেশি। চাহিদা রয়েছে ৭০-৭৫ লাখ টনের মতো। বাকি আলু অতিরিক্ত থেকে যায়। বাড়তি যে আলু থেকে যায় তার সঠিক মূল্য চাষিরা পান না। আমরা দেড় হাজার মেট্রিক টন আলু বিদেশে রফতানি করেছি। যার রেট ১৪ দশমিক ২০ টাকা কেজি।
বিএডিসির এই কর্মকর্তা বলেন, আমরা রেট দিয়েছি কেজিতে ২০-২২ টাকা। যখন এই রেট দিয়েছি তখন খাওয়ার আলুর দাম ছিল সাড়ে ৮ থেকে ১১ টাকা পর্যন্ত। তিনি বলেন, এবার ক্রয় রেট কেজিতে ২০-২২ টাকা দেয়া হয়েছে। এই রেটের সাথে প্রসেসিং রেট প্রায় ৬ টাকার যোগ হবে; অর্থাৎ প্রায় ২৮-২৯ টাকা পড়ে যাচ্ছে। এখন তা হলে বিক্রি রেট কত হবে বলেন? ২৯ টাকার নিচে বিক্রি রেট করলে লস হয়ে যাবে। আবার এর চেয়ে বেশি রেট হলে তো বিক্রি করা যাবে নাÑ সেটিও আমাদের ভাবতে হবে।



আরো সংবাদ