০৩ আগস্ট ২০২১
`

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধসের ভয়াবহ সেই দিন আজ

প্রাণ হারায় সেনাসদস্যসহ ১২০ জন
-

রাঙ্গামাটিতে ভয়াবহ পাহাড় ধসের মর্মান্তিক ঘটনার চার বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৭ সালের ১৩ জুন রাতে টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টির কারণে ঘটে স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনা। বছর ঘুরে দিনটি ফিরে এলে রাঙ্গামাটিবাসীর মনে দেখা দেয় আতঙ্কের সেই ভয়াল স্মৃতি।
পাহাড় ধসে মাটিচাপা পড়ে এক দিনেই প্রাণ হারিয়েছিলেন সেনাসদস্যসহ ১২০ নারী পুরুষ ও শিশু। এর মধ্যে শহরের মানিকছড়িতে একটি সেনা ক্যাম্পের নিচে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের উপর ধসে পড়া মাটি অপসারণ করতে গিয়ে পুনরায় পাহাড় ধসের মাটিচাপা পড়ে নিহত হন দুই কর্মকর্তাসহ পাঁচ সেনাসদস্য। নিহতরা হলেনÑ মেজর মোহাম্মদ মাহফুজুল হক, ক্যাপ্টেন মো: তানভীর সালাম শান্ত, করপোরাল মোহাম্মদ আজিজুল হক, সৈনিক মো: শাহিন আলম ও সৈনিক মো: আজিজুর রহমান।
জেলা প্রশাসনের হিসাবে ওই ঘটনায় রাঙ্গামাটি সদরে ৬৬ জন, জুরাছড়ি উপজেলায় ছয়জন, বিলাইছড়ি উপজেলায় দুইজন, কাপ্তাই উপজেলায় ১৮ জন এবং কাউখালী উপজেলায় ২১ জনসহ মোট ১১৩ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে শিশু ৩৩, মহিলা ৩২, পুরুষ ৪৮ জন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অন্য যেসব পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে ২০১৭ সালের ১৩ জুনের ঘটনা সে রকম ছিল না। এতে রাঙ্গামাটিতে ব্যাপক প্রাণহানির পাশাপাশি ভৌত অবকাঠামো ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাহাড়ে ঘরবাড়ি আছে এমন পাহাড়ও যেমন ভেঙেছে, ঘরবাড়ি ছিল না এমন অসংখ্য পাহাড়ও ভেঙে পড়ে। আবার ঝোপজঙ্গল গাছপালাতে ভরপুর; এমন পাহাড়ও ভেঙে পড়ে। এক কথায় সব রকম পাহড়েই মাটি ধস হয়। এটার ব্যাপ্তি, বিস্তৃতি ও গভীরতাও অনেক বেশি ছিল।
টানা তিন দিনের প্রবল বর্ষণে পাহাড় ধসে রাঙ্গামাটির এত লোকের প্রাণহানি, ঘরবাড়ি, সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুতের এত ক্ষতি হবে সে দিন কেউ ভাবতে পারেনি। সে দিন মুহূর্তেই সব দিক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল পর্যটন শহর রাঙ্গামাটি। ১৩ জুন রাত থেকেই শুরু হয়েছিল প্রচণ্ড আওয়াজে বজ্রপাতসহ ভারী বৃষ্টি। ভয়ে সেই রাত কাটাতে হয়েছিল মানুষকে। ভোর হওয়ার পর রাঙ্গামাটি শহরের ভেদভেদি, মোনতলা, রাঙ্গাপানি, শিমুলতলি, মুসলিমপাড়া ও লোকনাথ মন্দির এলাকা, সদর উপজেলার মগবান ও সাপছড়ি ইউনিয়নসহ পাঁচটি উপজেলায় বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসে মাটিচাপা পড়ে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির খবর আসতে থাকে। এর আগে আর কোনো দুর্যোগে রাঙ্গামাটিতে এত প্রাণহানি ঘটেনি। চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি সড়কের শালবন এলাকায় ১০০ মিটার রাস্তা ধসে গিয়ে একেবারে বিলীন হয়ে যায়। দেশের অন্যান্য স্থানের সাথে রাঙ্গামাটি ৯ দিন বিচ্ছিন্ন থাকে। বিভিন্ন আন্তঃসড়কে ১৪৫টি স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক ছাড়াও রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি সড়ক, রাঙ্গামাটি-বড়ইছড়ি ও রাঙ্গামাটি-কাপ্তাই সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ ছাড়া বৈদ্যুতিক গ্রিড লাইনের পোল ও লাইনের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ফলে শহরে তিন দিন বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে। সেনাবাহিনী ও বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীদের দ্রুত প্রচেষ্টায় তিন দিনের মাথায় বিদ্যুৎ ও ১০ দিনের মধ্যে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রামে সড়ক যোগাযোগ পুনঃস্থাপন করা সম্ভব হয়। নৌ-পথে পানি, জ্বালানি তেল ও পণ্য পরিবহনসহ লোকজনের চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়। গৃহহারা হয়ে ১২টি আশ্রয় কেন্দ্রে দুই হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নেয়। সেনাবাহিনী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পানি ও খাবার সরবরাহ করে।
ভয়াল পাহাড় ধসের ঘটনার চার বছর পার হলেও এখনো অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলো আজো বাস করছেন পাহাড়ের গায়ে। প্রতি বছরের মতো বর্ষার শুরুতে এবারো জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহর ও উপজেলাগুলোতে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে বৃষ্টির সময় নিরাপদে সরে যেতে ও আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। শহরের বেশকিছু স্থানে পাহাড়ের পাদদেশে আরো অসংখ্য বাড়িঘর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
এ দিকে দিনটির কথা স্মরণ করে এ বছরও রাঙ্গামাটি জেলায় প্রাণহানি এড়াতে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে দেয়া হয়েছে। ২০১৭ সালের ১৩ জুনের পাহাড় ধস রাঙ্গামাটির সারফেসটাকে নাড়িয়ে দিয়ে অত্যন্ত নাজুক করেছে, যা গত চার বছরেও কাটিয়ে ওঠা যায়নি। যে কারণে জেলার অনেক সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও দোকানপাটসহ সবকিছু অনিরাপদ করে দেয়।

 



আরো সংবাদ