২০ জুন ২০২১
`

ফেরিঘাটগুলোতে ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড়

নেই স্বাস্থ্যবিধির বালাই
-

দেশজুড়ে লকডাউন চললেও থেমে নেই মানুষের গৃহযাত্রা। আন্তঃজেলা পরিবহন বন্ধ থাকলেও ঘাট পার হতে ভিড় করছে ঘরমুখো মানুষ। ছুটিতে বাড়ি না যেতে সরকারি নির্দেশনা থাকলেও আপনজনদের সাথে ঈদ উদযাপনসহ নানা কারণে ঈদের এক সপ্তাহ আগে থেকেই শুরু হয়েছে এ ভিড়। এমনকি মানুষের ভিড়ের কারণে কোনো কোনো ফেরিতে যানবাহনই উঠতে পারছে না। গাদাগাদি করে ফেরি পারাপার হওয়ায় সেখানে কোনো ধরনের স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালিত হতেও দেখা যায়নি।
পাটুরিয়া ফেরিঘাটে ভিড়
মানিকগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন পন্থায় অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ পাটুরিয়াঘাটে আসছে। লঞ্চ পারাপার বন্ধ থাকায় ঈদে ঘরমুখো এসব মানুষজন ফেরিতেই গাদাগাদি করে নদী পার হচ্ছেন। কোনো ধরনের স্বাস্থ্যবিধি কিংবা শারীরিক দূরত্ব বজায় থাকছে না ফেরিতে কিংবা ঘাট এলাকায়।
জরুরি পণ্যবাহী ট্রাক ও রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স পারাপারের পাশাপাশি অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ পড়ায় স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় ছোট-বড় সবগুলো ফেরি চলাচল শুরু করেছে। সরকারি নির্দেশের কারণে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় গণপরিবহন যাচ্ছে না। কিন্তু তারপরও মানুষ ছুটছে ঈদের ছুটির মতো করে। পাটুরিয়া ফেরিঘাটে দেখা যাচ্ছে করোনাপূর্ব সময়ের ঈদের উপচেপড়া ভিড়।
ঈদের এক সপ্তাহ বাকি থাকতেই গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে মানুষ ও যানবাহনের উপচেপড়া যে ভিড় দেখা গেছে তাতে আগামী দিনগুলোতে ভিড় আরো মারাত্মক আকার ধারণ করার আশঙ্কা করছেন ঘাট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এতে করোনা সংক্রমণও ব্যাপক হারে বেড়ে যেতে পারে।
নাম প্রকাশে এক লঞ্চ মালিক বলেন, হয় মানুষ চলাচল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা উচিত আর নয়তো লঞ্চ চালু করার অনুমতি দেয়া উচিত। কারণ তাতে ফেরিতে চাপ কমবে এবং সামাজিক দূরুত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
চুয়াডাঙ্গাগামী যাত্রী মো: হাফিজুর রহমান বলেন, সরকারের নিষেধাজ্ঞা চলমান, কিন্তু কী করব পরিবারের সবাই তাকিয়ে আছে। তাই সবার সাথে ঈদ করতে আগেই বাড়ি যাচ্ছি। করোনার জন্য এক বছরের বেশি সময় পর বাড়ি যাচ্ছি। যশোরগামী মো: আরিফ হোসেন বলেন, মাকে দেখিনা প্রায় এক বছর। তিনি মারাত্মক অসুস্থ। আমার ছেলেমেয়েও আমাকে দেখার জন্য কান্নাকাটি করছে। কোনো উপায় নেই, তাই বাড়ি যাচ্ছি।
ফরিদপুরগামী মো: রফিকুল ইসলাম বলেন, ফুটপাথে ছোট একটা কাপড়ের দোকান করে কোনো মতে বৌ-বাচ্চা নিয়ে সংসার চালাতাম। আবার বাড়িতে বৃদ্ধ মাকেও টাকা পাঠাতাম। কিন্তু এখন তো ঘরভাড়া দেয়াই কষ্ট কিভাবে আর এদের শহরে রাখবো? ছেলেমেয়েকে গ্রামের স্কুলে ভর্তি করে দেবো। তারপরও সংসার কিভাবে চলবে জানি না। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার জিল্লুর রহমান জানান, এক দিকে সাপ্তাহিক ছুটির দিন ও অন্য দিকে সামনে ঈদ থাকায় যাত্রী ও যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে। যানবাহন ছাড়া শুধু নদী পার হচ্ছে এমন যাত্রীর সংখ্যাও ছিল চোখে পড়ার মতো। এ কারণে ফেরির সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। বর্তমান পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে ১৫টি ফেরি রয়েছে। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ও আরিচা কাজিরহাট নৌরুটে ২০টি ফেরি রয়েছে। যানবাহন ও যাত্রীর চাপ থাকায় ছয়টি ছোট ফেরির পাশাপাশি চারটি বড় ফেরি পারাপারে নিয়োজিত রেখেছে ঘাট কর্তৃপক্ষ। তবে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি উপেক্ষা করে গাদাগাদি করে ফেরিতে উঠছেন যাত্রীরা।
ঘাট কর্তৃপক্ষ জানায়, ঈদকে সামনে রেখে ভিড় বাড়ছে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে। গতকাল ভোর থেকে মানুষ ও যানবাহনের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বেলা বাড়ার সাথে চাপ আরো বেড়ে যায়।
শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে বাড়ি ফেরা মানুষের ঢল
মুন্সীগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, ঈদ উপলক্ষে ঘরে ফেরা মানুষের ভিড় বেড়েছে শিমুলিয়া বাংলাবাজার নৌরুটের ফেরিঘাটেও। গতকাল শুক্রবার সকালে এমন দৃশ্য দেখা যায় ঘাট এলাকায়। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিসির) শিমুলিয়া ফেরিঘাটের উপ মহাব্যবস্থাপক প্রফুল্ল চৌহান বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে দিনের বেলায় শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে ১৩টি ফেরি চলাচল করছে। রাতে যাত্রী ও যানবাহন পারাপারের জন্য ১৬টি ফেরি চলাচল করছে। পদ্মায় লঞ্চ ও স্পিডবোট বন্ধ থাকায় ফেরিতে যাত্রীদের অত্যাধিক চাপে ফেরিগুলোতে পার করা যাচ্ছে না গাড়ি। এতে ঘাট এলাকায় পারাপারের অপেক্ষায় আটকা পড়েছে ব্যক্তিগত ও পণ্যবাহী সাত শতাধিক যানবাহন।
সরেজমিন দেখা যায়, শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি-বাংলাবাজার নৌরুটে ১৩টি ফেরি রয়েছে। যানবাহন ও যাত্রীর চাপ থাকায় ৯টি ছোট ফেরির পাশাপাশি ৪টি বড় ফেরিও পারাপারে নিয়োজিত রেখেছেন ঘাট কর্তৃপক্ষ। সরকারে নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও ভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কা নিয়ে গাদাগাদি করে ঘরে ফিরছেন যাত্রীরা।
বরিশাল বানারীপাড়ার সবুজ নামে একজন জানান, ঈদে বাড়িতে যাচ্ছি। সরকারের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তারপরও যেতেই হবে। কারণ একা ঢাকায় ঈদ করতে পারব না। বাবা, মা, ভাইবোন রয়েছে। এক বছর পরে যাচ্ছি। আবেগ আর অনুভূতি আলাদা। ভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কা তো আছেই। তারপরও ৫ গুণ বেশি ভাড়া দিয়েই যাচ্ছি। কী আর করব!
রবিউল নামে একযাত্রী জানান, বাবাকে দেখা হয় না ৬ মাস। বাবাকে ছাড়া ঈদ কল্পনা করা যায় না। অসুস্থ বাবা শুধু আমার জন্য কাঁদে। তাই শত বাধার ভেতরেও যাচ্ছি গ্রামের বাড়ি। দেখা হবে সবার সাথে। স্ত্রী-সন্তানকেও নিয়ে যাচ্ছি। করোনা প্রাদুর্ভাব বাড়ছে জেনেও যেতে হচ্ছে।
বিআইডব্লিউটিসি শিমুলিয়াঘাটের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) সাফায়েত আহমেদ জানান, আসন্ন ঈদ ও শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় সবমিলিয়ে অত্যাধিক যাত্রীদের চাপ পড়েছে। যানবাহন ও যাত্রীদের নির্বিঘেœ পারাপারে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হচ্ছে। নৌরুটে ১৩টি ফেরি চলছে। ঘাট কর্তৃপক্ষ জানান, ঈদকে সামনে রেখে শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুট দিয়ে ঘরে ফিরছে দক্ষিণবঙ্গের ২১ জেলার মানুষ। ভোর থেকে এ নৌরুটে মানুষ ও যানবাহনের ভিড় বাড়তে থাকে। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঘাট এলাকায় যানবাহন ও যাত্রীর চাপ আরো বেড়ে যায়।
ঘাটের ব্যবস্থাপক মো: শফিকুল ইসলাম জানান, সাপ্তাহিক ছুটির দিন ও অন্য দিকে সামনে ঈদ থাকায় যাত্রী ও যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ফেরির সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে।
ঈদের আমেজ দৌলতদিয়া ঘাটে
রাজবাড়ী সংবাদদাতা জানান, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সরকার সারা দেশ লকডাউন ঘোষণা করলেও তা মানছেন না কেউ। স্বাস্থ্যবিধি মানা তো দূরের কথা, মাস্কই ব্যবহার করছেন না অনেক। আসন্ন ঈদুল ফিতরের আরো বেশ কয়েক দিন বাকি। কিন্তু এরই মাঝে প্রচণ্ড চাপ বেড়েছে দৌলতদিয়া ঘাটে। শত শত যাত্রী ও ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ চোখে পড়ার মতো।
শুক্রবার বিকেলে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে সরেজমিন দেখা যায়, দৌলতদিয়া ঘাটে দক্ষিণাঞ্চলের ঘরমুখী মানুষের ঢল নেমেছে। মানুষের নাড়ির টানে বাড়িতে যাওয়ার জন্য অতিরিক্ত ভাড়ায় গাড়িতে উঠছে গাদাগাদি করে। এতে মনে হয় এখনই ঈদের আমেজ দৌলতদিয়া ঘাটে।
ঈদ সামনে রেখে বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা করেছে মানুষ। রাজধানী ঢাকা ছাড়ছেন অনেকেই। এর চাপ পড়েছে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে। গতকাল শুক্রবার সরকারি ছুটির দিন এই চাপ আরো বেড়েছে। সকাল থেকেই ফেরিঘাটে যাত্রীদের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। ঘরে ফেরা মানুষের যাত্রীদের ঢল নেমেছে দৌলতদিয়ায়।
করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করেই চলছে যাত্রী পারাপার। দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ যাতায়াত করছে এই ঘাট দিয়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার রাতেই মূলত ঘাটে যাত্রীদের চাপ বাড়তে থাকে। শুক্রবার সেখানে মানুষের ঢল নেমেছে। যে যেভাবে পারছেন ঘাটে পৌঁছে, ফেরি পার হচ্ছেন। সামাজিক দূরত্ব বা কোনো কিছুই মানছেন না তারা। যাত্রীদের পাশাপাশি দৌলতদিয়া ঘাটে পারাপারের অপেক্ষায় আছে তিন শতাধিক যানবাহন।
পাটুরিয়া থেকে ছেড়ে আসা খানজাহান আলী ফেরিতে কয়েক শ’ যাত্রী নদী পার হচ্ছে। যাদের কেউ স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। প্রায় প্রতিটি ফেরিতেই এমন চিত্র দেখা যায়। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সরকার সারা দেশ লকডাউন ঘোষণা করলেও তা মানছেন না কেউ।
ঢাকা থেকে আসা যাত্রী ভেঙে ভেঙে আসা যাত্রী আবু সালেক বলেন, আমি ছাত্র। ঈদের মধ্যে সব কিছু বন্ধ থাকবে তাই আগেই ঢাকা ছাড়ছি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী উম্মে কুলসুম বলেন, আমরা চার বন্ধু মিলে একটা গাড়ি ভাড়া করে এসেছি। ঈদের মধ্যে মা-বাবার সাথে না থাকলে কেমন হয়ে যায় না। তবে একটু ঝুঁকি হয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহনের (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া ঘাটের সহকারী মহাব্যবস্থাপক ফিরোজ শেখ বলেন, নদী পারের জন্য দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটের এখন ১৪টি ফেরি চলাচল করছে। ১৪টি ফেরিতে যাত্রী ও যানবাহন পার হচ্ছে। অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

 



আরো সংবাদ