০৮ মে ২০২১
`

গ্রামীণ অর্থনীতির গতি ফেরাতে টাকার প্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ

কমানো হলো কৃষি ও পল্লী ঋণের সুদহার
-

করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ে গ্রামীণ অর্থনীতি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের কৃষি খাত। এমনি পরিস্থিতিতে গ্রামীণ অর্থনীতির গতি ফেরাতে টাকার প্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর অংশ হিসেবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকদের কাছে ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করতে কৃষি ও পল্লী ঋণের সুদহার ১ শতাংশ কমিয়ে ৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত গত এক এপ্রিল থেকে কার্যকর করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে কৃষি ও পল্লী ঋণের সুদহার রয়েছে ৯ শতাংশ। আর জুলাই-ফেব্রুয়ারি মাসে কৃষি ও পল্লী খাতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৭ শতাংশ। কিন্তু মূল ঋণের সাথে সুদহার ৯ শতাংশ যুক্ত হলে মোট ঋণ আরো বেড়ে যেতো। সেই হিসেবে কৃষি ও পল্লী ঋণের সুদহার বাড়েনি, বরং কমে গেছে। এ দিকে, প্রণোদনার অর্থও ঠিক মতো বিতরণ করা হচ্ছে না কৃষি খাতে। করোনাভাইরাসের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি খাতে সহায়তার জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। শতভাগ ঋণ বিতরণের সময়সীমা কয়েক দফা বাড়িয়ে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের পর তিন মাস অতিবাহিত হলেও কৃষি খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি ব্যাংকগুলো। সর্বশেষ হিসাব মতে, গত ১৫ মার্চ পর্যন্ত কৃষকদের মধ্যে প্রণোদনার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে মোট লক্ষ্যমাত্রার ৭২ শতাংশ। এমনি পরিস্থিতিতে ঋণবিতরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য আরো তিন মাস সময় বৃদ্ধি করে ৩০ জুন পর্যন্ত পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ দিকে, ২০২০ সাল থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ায় দেশের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিঘিœত হচ্ছে। এর ফলে অন্যান্য খাতের মতো কৃষি খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে, কৃষি খাতে স্বল্প সুদে ঋণ সরবরাহ নিশ্চিত করে কৃষকদেরকে স্বাভাবিক উৎপাদনশীল কার্যক্রম ফিরিয়ে আনাসহ কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য আলোচ্য খাতে ঋণের সুদহার কমানো প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। কৃষি উন্নয়নের সাথে বাংলাদেশের বিপুল জনসংখ্যার খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। তাই খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিতকরণ, দারিদ্র্যবিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কৃষি উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষি খাতের অবদান বিবেচনায় কৃষি খাতে স্বল্প সুদে ঋণ সরবরাহ নিশ্চিত করে কৃষকদেরকে স্বাভাবিক উৎপাদনশীল কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনাসহ কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য অগ্রাধিকার খাত হিসেবে কৃষি ও পল্লী ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশের পরিবর্তে ৮ শতাংশ পুনর্নির্ধারণ করা হলো।
জানা গেছে, করোনার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি খাতে সহায়তার জন্য গত বছরের ১৩ এপ্রিল পাঁচ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়। ওই দিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে দেয়া এ নির্দেশনায় বলা হয়, এ তহবিল থেকে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দেয়া হবে এ খাতের কৃষক উদ্যোক্তাদের। কৃষি খাতে চলতি মূলধন সরবরাহের উদ্দেশ্যে গঠিত এ তহবিল থেকে দেড় বছর মেয়াদে এ ঋণ দেয়া হবে। এর মধ্যে গ্রেসপিরিয়ড থাকবে ছয় মাস। ওই সময় বলা হয়, শস্য ও ফসল খাতে চলমান ঋণপ্রবাহ পর্যাপ্ত থাকার দরুন এ খাত অপেক্ষা কৃষির চলতি মূলধনভিত্তিক খাতগুলোতে অধিকতর ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এই কারণে এ খাতে ঋণের প্রবাহ নিশ্চিত করা আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে। এ প্রেক্ষিতে, চলতি মূলধনভিত্তিক কৃষির অন্যান্য খাত যেমন, হর্টিকালচার অর্থাৎ মৌসুমভিত্তিক ফুল ও ফল চাষ, মাছ চাষ, পোলট্রি, ডেইরিও প্রাণিসম্পদ খাতে পর্যাপ্ত অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হলে দেশের সার্বিক কৃষি খাত ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান মতে, গত এক বছরে এ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে তিন হাজার ৬০০ কোটি টাকা বিতরণ করেছে। যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল পাঁচ হাজার কোটি টাকা। ঋণ বিতরণের হার মোট লক্ষ্যমাত্রার ৭২ ভাগ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বারবার তাগিদ দেয়া সত্ত্বেও ব্যাংকগুলো কাক্সিক্ষত হারে কৃষিঋণ বিতরণ করছে না। এমনি পরিস্থিতি ঋণ বিতরণের সময় বৃদ্ধি করে এর আগে কেন্দ্রেীয় ব্যাংক থেকে আবারো নতুন করে নির্দেশনা দেয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক নির্দেশনা বলা হয়, কৃষিঋণ বিতরণ কর্মসূচি সুস্থভাবে বাস্তবায়নের জন্য ঋণ বিতরণের সময়সীমা তিন মাস বৃদ্ধি করে ৩০ জুন পর্যন্ত পুনর্নির্ধারণ করা হলো। এ নির্দেশনা কার্যকর করতে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সাথে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সুবিধার্থে একক খাতে ঋণ বিতরণের সীমা ৩০ শতাংশের পরিবর্তে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে।



আরো সংবাদ