০৮ মে ২০২১
`

খাবার জোগাতে দিশেহারা নিম্ন আয়ের মানুষ

২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম হকারদের
-

আয়ের একমাত্র উৎস পানের দোকানটি পলিথিনে মোড়ানো রয়েছে মতিঝিলের ফুটপাথে। দিনে দু’বেলা সেখানে গিয়ে দোকানের ধুলাবালু ঝেড়ে পরিষ্কার করেন দোকানী ফারুক। এই দোকানের আয়ের টাকায় চলে তার ছয় সদস্যের সংসার। কিন্তু কত দিন দোকান খুলতে পারেন না তিনি। হাতে কোনো টাকাপয়সা নেই। স্ত্রী সন্তানদের মুখে দু’বেলা কিভাবে খাবার তুলে দেবেন সেই চিন্তায় দিশেহারা। শুধু ফারুকই দিশেহারা হননি। দিশেহারা হয়ে পড়েছে রাজধানীর প্রায় দুই লাখ হকারসহ নি¤œ আয়ের মানুষ। তাদের অভিব্যক্তি এ রকম, এটা করোনা নিয়ন্ত্রণ নয়, গরিবকে আরো মেরে ফেলার লকডাউন। তারা বলছে, কঠোর লকডাউনের মধ্যে বড় বড় ব্যবসায়ীদের গার্মেন্ট ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান খোলা। অথচ বন্ধ করে রাখা হয়েছে হকারদের দোকান। রাস্তায় প্রাইভেট কারের চাপে যানজট লেগে যাচ্ছে। পুলিশ তাদের কিছু বলতে পারছে না। অথচ গরিব রিকশাওয়ালাকে জরিমানা আদায় করেও ক্ষান্ত হচ্ছে না। তাদের মারধর করে আয়ের উৎস রিকশাটিও ছিনিয়ে নেয়া হচ্ছে।
এদিকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে হকারদের ব্যবসায় করার দাবি জানানো হয়েছে। তা না হলে ২৪ ঘণ্টার পর হকারোা নিজ উদ্যোগেই রাস্তায় ব্যবসায় শুরু করবে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে মতিঝিলের ফুটপাথে দোকান পরিষ্কার করার সময় কথা হয় ফারুক হোসেনের সাথে। তার গ্রামের বাড়ি কমিল্লায়। গত ৩০ বছর ধরে রাজধানীতে ফুটপাথে চা পান সিগারেটের ব্যবসায় করে আসছেন। চার ছেলেমেয়ে ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে সংসার। সবাইকে নিয়ে টিকাটুলির একটা বাসায় থাকতেন। কিন্তু সন্তান বড় হয়ে যাওয়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। তখন পরিবারের সদস্যদের গ্রামে পাঠিয়ে দেন। এরপর যা আয় হতো তা দিয়ে মোটামুটিভাবে সংসার চালাতে থাকেন। কিন্তু হঠাৎ গত বছরের লকডাউনে কাজ হারিয়ে গ্রামে চলে যান তিনি। কাজ করতে না পেরে সেখানে ধারদেনা করে সংসার চালান। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে আবার রাজধানীতে ফিরে দোকান চালু করেন। সব খরচ দিয়ে দিনে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় হতে থাকে। কিছু দেনা শোধ করেন। এর মধ্যে আবারো লকডাউন। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, গত ১৫-১৬ দিন দোকান খুলতে পারি না। আমার আয় দিনমজুরের মতো। আয় না হলে খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিদিন দুই বেলা দোকানের কাছে এসে পরিষ্কার করে যাই। কিন্তু বড় রাস্তার পাশে দোকান হওয়ায় পুলিশের ধাবড়ানিতে একবারের জন্যও খুলতে পারি না। অলিগলির মধ্যে অনেকেই দোকান খুলে ব্যবসায় করছে। আর আমি নিঃস্ব হয়ে পড়েছি।
মতিঝিলে ফুটপাথের কাপড় ব্যবসায়ী সোলায়মান জানান, দোকান খুলতে পারবেন এমন আশায় তিনি গ্রামের বাড়ি যাননি। অথচ গত দুই-তিন সপ্তাহ হয়ে যাচ্ছে দোকান খুলতে পারছি না। বাড়িতে বাবা-মাকে টাকা পাঠানো দূরের কথা নিজের খাবার টাকাই জোগাড় করতে পারছি না। তিনি প্রশ্ন করে বলেন, সরকার নাকি ত্রাণ সহায়তা দেয়, এগুলো কারা পায়? নিজে তো এক ফোঁটা ত্রাণও পাইনি, আবার আশপাশে কেউ পেয়েছে এমনটিও শুনিনি।
লকডাউনের মধ্যেই সড়কে বসে ব্যবসায় পরিচালনা করতে দেয়ার জন্য ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে কর্মহীন হকাররা। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়ন আয়োজিত এক বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ থেকে এ দাবি জানানো হয়।
সমাবেশের আগে পল্টন মোড় থেকে হকাররা বিক্ষোভ মিছিলসহ প্রেস ক্লাবের সামনে আসে। সেখানে অনুষ্ঠিত সমাবেশে সংগঠনের নেতারা আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সড়কে স্বাস্থ্যবিধি মেনে হকারদের ব্যবসায় পরিচালনার অনুমতি দেয়ার দাবি জানায়। তা না হলে হকাররা নিজ থেকে সড়কে ব্যবসায় শুরু করবে বলেও জানায় তারা।
সংগঠনের উপদেষ্টা জলি তালুকদার বলেন, ‘এই লকডাউনের কারণে হকাররা বেকার হয়ে পড়েছে। খেতে না পেরে অনেক হকার বেকার হয়ে গ্রামে চলে গেছে। সরকার হকারদের নিয়ে তামাশা শুরু করেছে।’
তিনি আরো বলেন, যারা আমাদের শ্রমের টাকায় বড়লোক হয়ে বিদেশে অর্থ পাচার করছে, সরকার তাদের পক্ষ নিয়েছে। শ্রমিকদের কোনো ধরনের সহায়তা না দিয়ে উল্টো তাদের নিঃস্ব করে দেয়া হচ্ছে। জলি বলেন, ‘রাজধানীতে দুই লাখ হকার রয়েছে। কিন্তু তাদের পাশে সরকার নেই। আমাদের দাবি- ঈদ ও রমজানে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত হকারদের ব্যবসায় করতে দিতে হবে।’
সংগঠনের সভাপতি আবুল হোসেন কবীর বলেন, ‘রাস্তা থেকে যদি আপনাদের উঠিয়ে দিতে আসে তখন আপনারা বলবেন, আমাকে খাবার দে, তাহলে রাস্তা ছেড়ে চলে যাবো। না হয় ব্যবসায় করতে দে। সরকার বিভিন্ন সংগঠনকে প্রণোদনা দিচ্ছে। কিন্তু হকাররা কোনো সহযোগিতা পায়নি। আমরা হকাররা বেকার হয়ে পড়েছি। বাসা ভাড়া দিতে পারি না। আমরা ১৫ দিন অপেক্ষা করেছি। আমাদের পরিবার আর চলে না। লকডাউন চলতে থাকলে আত্মহত্যা করা ছাড়া আর উপায় নাই।

 



আরো সংবাদ