১৭ এপ্রিল ২০২১
`

দক্ষিণ চট্টগ্রামে সম্ভাবনাময় ভুট্টা আবাদ বেড়েই চলছে

চলতি বছর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৪৯ লাখ মে. টন
দক্ষিণ চট্টগ্রামে চোখজুড়ানো ভুট্টার আবাদ নজর কাড়ছে গ্রামবাসীর : নয়া দিগন্ত -

চাহিদা মেটাতে দক্ষিণ চট্টগ্রামে পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে, নদী উপকূলের বিস্তীর্ণ চরে পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ সম্ভাবনাময় ভুট্টার আবাদ বেড়েই চলেছে। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ভুট্টা আবাদের প্রতি কৃষকের আগ্রহ যেমন বেড়েছে তেমনি পুষ্টিগুণে ভরা ভুট্টাদানা মানুষের খাদ্য ছাড়াও হাঁস মুরগি ও মাছের খাদ্য হিসেবেও দেশে এর প্রচুর চাহিদা বেড়েছে। এ কারণে গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে দেশে ভুট্টার আবাদ ও উৎপাদন দুটোই বেড়েছে।
বর্তমানে দেশে গম ও ভুট্টা গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক উদ্ভাবিত জাত ছাড়াও বিদেশী হাইব্রিড এন এইচ ৭৭২০, কোহিনুর পি-৩৩৯২ ছাড়াও বিভিন্ন হাইব্রিড জাতের ভুট্টার আবাদ হচ্ছে। এতে গড়ে প্রতি হেক্টরে উৎপাদন হয় ১২ থেকে ১৪ মেট্রিক টন পর্যন্ত।
যেখানে গত ১৫-১৬ অর্থবছরে ২৮ লাখ মেট্রিক টন ভুট্টা উৎপন্ন হয়েছে সেখানে গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে ভুট্টার উৎপাদন বেড়ে এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৪৯ লাখ মেট্রিক টন । এ পরিসংখ্যান থেকেই বুঝা যায় গত পাঁচ বছেরের ব্যবধানে দেশে ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ।
জানা গেছে, ধান গমের তুলনায় ভুট্টার পুষ্টিমান বেশি। এতে প্রায় ১১ শতাংশের ওপরে আমিষ জাতীয় উপাদান রয়েছে। আর আমিষে প্রয়োজনীয় অ্যামাইনো এসিড, ট্রিপটোক্যান ও লাইসিন অধিক পরিমাণে রয়েছে। প্রতি ১০০ গ্রাম ভুট্টায় প্রায় ৯০ মিলিগ্রাম ক্যারোটিন বা ভিটামিনের উপস্থিতি রয়েছে। ভুট্টার আদি উৎপত্তিস্থল মেসো আমেরিকায়।
২০১৭ সালে রবি মৌসুম থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভুট্টা আবাদের উদ্যোগ গ্রহণ করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। ওই বছর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মাধ্যমে পুনর্বাসন কর্মসূচির অধীনে দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়া, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী, বাঁশখালী, মিরেশ্বরাই, সীতাকুন্ড, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় ৩৩ শতকের ১০টি করে মোট ১০০টি এবং উল্লিখিত উপজেলাসহ সাতকানিয়া, আনোয়ারা ও লোহাগাড়া উপজেলায় রাজস্ব খাতে ৩৩ শতক করে আরো ৮০টি প্রদর্শনী প্লটে ভুট্টার আবাদ করা হয়। শুরুতে ভুট্টার ফলন ও বিপণন নিয়ে কৃষকগণ বিপাকে পড়লেও মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ব্যাপক প্রচার প্রচারণার মধ্য দিয়ে ভুট্টা আবাদে এলাকার চাষিদের মাঝে বেশ সাড়া পড়েছে। ফলে ২০১৭ সালের তুলনায় ২০২০-২০২১ অর্থবছরে উৎপাদন ও চাষের পরিধি দুটোই প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে দক্ষিণ চট্টগ্রামেও।
কৃষি পুনর্বাসন, রাজস্ব খাত ছাড়াও বর্তমানে বৃহত্তর নোয়াখালী কুমিল্লা চাঁদপুর ফেনী ও চট্টগ্রাম কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমেও এ অঞ্চলে ভুট্টার আবাদ বেড়েছে কয়েক গুণ। পটিয়া কৃষি অফিসার কল্পনা রহমান জানান, চলতি বছর ওই প্রকল্পের মাধ্যমে ৩৩ শতক করে ৮০টি প্লটে ভুট্টার আবাদ করা হয়েছে। চন্দনাইশ উপজেলা কৃষি অফিসার স্মৃতি রানী সরকার জানান, উপজেলায় উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ৩৩ শতক করে ৬০টি প্লটে এবার ভুট্টার আবাদ করা হয়েছে। বোয়ালখালী কৃষি অফিসার আতিক জানান, কৃষি পুনর্বাসন, রাজস্ব খাত ছাড়াও প্রকল্পের অধীনে ৩৩ শতক করে ৫৫টি প্লটে ভুট্টা আবাদ করা হয়েছে।
লোহাগাড়া কৃষি অফিসার মনিরুল ইসলাম মানিক জানান, প্রকল্পের মাধ্যমে তার উপজেলায় ৩৩ শতক করে ৬৫টি প্লটে এবং বাঁশখালীতে একই প্রকল্পের অধীনে এবার ৮৫টি প্লটে ভুট্টার আবাদ করা হয়েছে। সাতকানিয়া কৃষি অফিসার প্রতাব চন্দ্র জানান, উপজেলায় ৩৩ শতক করে ৭০টি প্লটে ভুট্টার আবাদ গড়ে তোলা হয়েছে।
সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ২৫-৩০ বছর ধরে ভুট্টার আবাদ হয়ে আসছে ।
দেশে যে পরিমাণ ভুট্টার আবাদ হয় তার তুলনায় প্রতি বছর মাছ ও মুরগির খামারসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে কয়েক লাখ মেট্্িরক টন ভুট্টা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এতে ব্যয় হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। অথচ সমন্বিতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে পাহাড়ের পাদদেশে, পাহাড়ি ঝরনা নদী ও খালের বিস্তীর্ণ চরে ভুট্টার আবাদ গড়ে তোলা হলে রবি ও গ্রীষ্ম মৌসুমে চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে কয়েক লাখ মেট্্িরক টন ভুট্টা উৎপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সরেজমিন দেখা গেছে দক্ষিণ চট্টগ্রামে বিভিন্ন উপজেলায় ভুট্টার প্রদর্শনী ক্ষেত গড়ে তোলা হয়েছে। ইতোমধ্যে ক্ষেতে রোপণ করা ভুট্টার চারা বেড়ে উঠেছে। বর্তমানে ভুট্টা চারার বয়স আড়াই মাস পেরিয়েছে। আর কিছু দিনের মধ্যে ভুট্টা চারায় ফুল এসেছে কিছুদিনের মধ্যে মোচা আসা শুরু হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর চট্টগ্রাম অঞ্চল সূত্রে জানা গেছে, রবি মৌসুমে চট্টগ্রাম জেলায় প্রায় এক লাখ হেক্টর জমি অনাবাদি থাকে। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে রবি মৌসুমের বিপুল পরিমাণ জমিতে ভুট্টার আবাদ করে দেশে ভুট্টার যে চাহিদা রয়েছে তার ঘাটতি মোকাবেলা সম্ভব বলে অনেকেই মনে করেন।
এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক এ কে এম মনিরুল আলম বলেন, ভুট্টাদানা মানুষের খাদ্য ছাড়াও হাঁস মুরগি ও মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়। দেশে এর প্রচুর চাহিদাও রয়েছে। ইতোমধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর দেশের পুষ্টির ঘাটতি মেটাতে বছরব্যাপী উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পসহ বিভিন্ন পুষ্টিমান সমৃদ্ধ শষ্য ও দানা জাতীয় ফসল উৎপাদনের ওপর কাজ করছে। তারই অংশ হিসেবে দেশের অভ্যন্তরে ভুট্টার আবাদ ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি জানান, এবার দেশে ভুট্টার উৎপাদন চার লাখ ৭১ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৮ লাখ ৮৭২ হাজার মেট্রিক টন। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে ডিসেম্বর পর্যন্ত চার লাখ ৫৮ হাজার ৫৪৬ হেক্টর জমিতে ভুট্টার রোপণ হয়েছে। আগামী এপ্রিলের মধ্যে ভুট্টা কর্তন শুরু হবে বলে তিনি আশা করেন।



আরো সংবাদ