১৮ এপ্রিল ২০২১
`
শ্রমিক ফিরে এলেও বাড়ছে প্রবাহ

৮ মাসে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৩৩ শতাংশ

-

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে বিদেশ থেকে শ্রমিক ফিরে আসছে। এর পরেও রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। বছরের প্রথম মাসের রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধির ধারা বছরের দ্বিতীয় মাস ফেব্রুয়ারিতেও অব্যাহত রয়েছে। জানুয়ারিতে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল প্রায় ২০ শতাংশ, ফেব্রুয়ারি শেষে তা আরো বেড়ে হয়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ।
বিদেশফেরত কর্মীর পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে, করোনাভাইরাসের প্রভাবে ১ এপ্রিল থেকে গত ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমিক ফিরে এসেছে ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৪৪১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৩ লাখ ৩০ হাজার ৩৯৬ জন। আর মহিলা ৪৬ হাজার ৪৫ জন। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য থেকেই ফিরে এসেছে বেশির ভাগ কর্মী। সাধারণত শ্রমিক ফিরে আসলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু রেমিট্যান্স প্রবাহের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ফি মাসেই রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, গত জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৬৬৮ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ২৪৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার। আলোচ্য সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৩ দশমিক ৫১ শতাংশ। আর ফেব্রুয়ারিতে রেমিট্যান্স এসেছে ১৭৮ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৪৫ কোটি ডলার। এ সুবাদে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ৪১২ কোটি ২০ লাখ ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মূলত প্রধান দু’টি কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়ে যাচ্ছে। প্রথমত দেশের রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীদের উৎসাহিত করতে সরকার ২ শতাংশ নগদ সহায়তা দিচ্ছে। অর্থাৎ যেকোনো অঙ্কের রেমিট্যান্স পাঠাানো হলেই তার ওপর ২ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা দেয়া হয়। এ কারণে প্রবাসীরা উৎসাহিত হয়ে হুন্ডির পরিবর্তে বৈধ পথে রেমিট্যন্স পাঠাতে উৎসাহিত হয়েছেন। এর ফলে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়ে গেছে। রেমিট্যান্স বেড়ে যাওয়ার দ্বিতীয় অন্যতম কারণ হলো ডলারের মূল্য ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরোক্ষ হস্তক্ষেপ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে এর মান ধরে রাখতে চেষ্টা করছেন। যেমন প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী একটি ব্যাংক দিন শেষে কী পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ধরে রাখতে পারবে তার একটি সীমা দিয়ে থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সাধারণত একটি ব্যাংকের মোট মূলধনের ১৫ শতাংশ সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যাংক নিজেদের কাছে ধরে রাখতে পারবে। এটা ব্যাংকিং ভাষায় নেট ওপেন পজিশন (এনওপি) বলে। নীতিমালা অনুযায়ী কোনো ব্যাংকের নির্ধারিত সীমার বেশি রেমিট্যান্স প্রবাহ থাকলে হয় তাকে বাজারে বাড়তি ডলার বিক্রি করতে হবে। অন্যথায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার দরে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কিনে থাকে।
ব্যাংকারোা জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘ দিন যাবত ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলার অ্যাসোসিয়েশিন সংক্ষেপে বাফেদার মাধ্যমে ডলারের দর নির্ধারণ করে দিয়েছে। যেমন গত প্রায় এক বছর যাবত ডলারের দর ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা থেকে ৮৪ টাকা ৯০ পয়সার মধ্যেই ধরে রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২০ সালের ২৮ জানুয়ারিতে প্রতি ডলার লেনদেন হয়েছে ৮৪ টাকা ৯০ পয়সা। গত ৩০ জুনে তা সামান্য কমে ৮৪ টাকা ৮৫ পয়সা এবং গত ২৮ জানুয়ারিতে তা ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে বাজারে রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের মাধ্যমে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা এসেছে আমদানি চাহিদা না থাকায় বেশির ভাগ ব্যাংকের হাতেই উদ্বৃত্ত রয়েছে। ফলে বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় ডলারের মান কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেয়া দরের কারণে ডলারের মান খুব একটা কমেনি, করোনার প্রভাবে যতটা না কমেছে বিশ্বের অন্যান্য দেশে। একদিকে ২ শতাংশ নগদ সহায়তা ও ডলারের রেট ভালো থাকায় প্রবাসীরা বৈধ পথে বেশি পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত হয়েছেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক রেমিট্যান্স প্রবাহে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, বছরের প্রথম মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। তবে আগের মাস অর্থাৎ ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেছে। এ কমে যাওয়ার ধারাবাহিকতা চলতি বছরে অব্যাহত থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন। কারণ বিশ্বব্যাপী করোনার নেতিবাচক প্রভাবে অনেক দেশ বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বহু শ্রমিক ফিরে এসেছে। তারা নতুন করে যেতে না পারলে এবং নতুন নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি না হলে রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা কমে যেতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।



আরো সংবাদ