০৬ মার্চ ২০২১
`
সাক্ষাৎকারে আইএফআইএল’র এমডি আবু জাফর মো: সালেহ

সময়ের প্রয়োজনে ঢেলে সাজাতে হবে প্রযুক্তি বিভাগগুলো

-

আগের প্রজন্ম প্রযুক্তিনির্ভর ছিল না। বর্তমান প্রজন্ম প্রযুক্তি শুরু করেছে মাত্র। আগামী প্রজন্ম পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর হবে। কিন্তু এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের প্রযুক্তি জ্ঞানের যে ঘাটতি তা সমন্বয় করতে বেশি প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকার তৈরি করা। ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তি জ্ঞান বাড়াতে ডিপ্লোমা কোর্স চালু করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে তথ্য প্রযুক্তি জানা ব্যাংকার তৈরি করতে হবে। এ জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রযুক্তি বিভাগগুলো ঢেলে সাজাতে হবে। একই সাথে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মূলধনের ২৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে থাকা ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য শক্তিশালী শরিয়াহ আইন প্রণয়ন করা সময়ের দাবি। নয়া দিগন্তের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে কথাগুলো বলেছেন ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের (আইএফআইএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবু জাফর মো: সালেহ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন Ñআশরাফুল ইসলাম।
প্রশ্ন : করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে স্বাভাবিকভাবে ঋণ আদায় কমে গেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে?
উত্তর : খুব স্বাভাবিকভাবেই যেকোনো মহামারীতে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শত বছরের নজিরবিহীন করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। তাই বিনিয়োগ খাত থেকে ঋণের টাকা আদায়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো শৈথিল্য প্রদর্শন করছে। গ্রাহকের কষ্ট লাঘবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এক ধরনের ছাড় দিয়ে চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সময়োপযোগী বিভিন্ন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গত ডিসেম্বর পর্যন্ত সব ঋণের কিস্তি স্থগিত করে এগুলোকে পরবর্তী সময়ের জন্য পুনর্বিন্যাস করে দিয়েছে। এ জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন মুনাফায় যেন বড় ধরনের ঘাটতি না হয় তা সমন্বয় করতে পরিচালন ব্যয় সঙ্কোচনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
প্রশ্ন : নতুন বছরের শুরুতেই করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ধাক্কা শুরু হয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে বলে আপনি মনে করছেন।
উত্তর : আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যেই বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করে আসছে। প্রথমত, ব্যাংকের সাথে ব্যবসায় টিকে থাকার লড়াই; দ্বিতীয়ত, তারল্য সঙ্কট ও বাজারে ভাবমূর্তি রক্ষার চ্যালেঞ্জ; তৃতীয়ত, করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক সামাজিক-অর্থনীতিতে যে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি তা সামলে উঠার চ্যালেঞ্জ। নতুন করে প্রাদুর্ভাবে এই চ্যালেঞ্জটা নতুন একটা মাত্রা পেল। আরো দীর্ঘ সময়ের জন্য এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হলো।
প্রশ্ন : প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের বাইরে এসে অনেকেই অপ্রচলিত ব্যাংকিং শুরু করেছে। আর্থিক খাতে নতুন নতুন সেবা আনায় লিজিং প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে সমন্বয় করবে?
উত্তর : প্রযুক্তি সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সবকিছুই পরিবর্তনশীল। অনলাইনভিত্তিক ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং ইত্যাদি প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতাকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও আগ্রহের সাথে গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান অনলাইন কার্যক্রম শুরু করেছে। আর্থিক লেনদেন ও বিনিয়োগ-আমানতের বিভিন্ন ধারায় প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। নতুন আমানত বা বিনিয়োগ পণ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রযুক্তির উচ্চ ব্যবহারের দিকে আরো অধিক মনযোগী হতে হবে। প্রযুক্তি বিভাগগুলোকে ঢেলে সাজাতে হবে যেন নতুন পণ্যে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। তবে প্রডাক্টের ক্ষেত্রে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট বিভাজন প্রয়োজন, সেটি হতে পারে অঞ্চলভিত্তিক, সময়ভিত্তিক বা প্রডাক্টের রকমভিত্তিক।
প্রশ্ন : ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের আমানত, ঋণ ও খেলাপি ঋণের অবস্থা কী?
উত্তর : আলহামদুলিল্লাহ। প্রতি বছরই আমাদের আমানত এবং বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আল্লাহ পাকের অশেষ রহমতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের আমানত ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে করোনাকালেও ৯৮.৬৫ কোটি টাকা বেড়েছে, নিট ঋণ বেড়েছে ৬৩.৪৫ কোটি টাকা এবং খেলাপি ঋণ ১ শতাংশ কমে এখন ৩.৬০ শতাংশ মাত্র। এ জন্য আমরা আমাদের সব গ্রাহক, পৃষ্ঠপোষক, শুভানুধ্যায়ী এবং নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের কাছে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।
প্রশ্ন : চলমান পরিস্থিতিতে অনেক প্রতিষ্ঠানই লোকসানের মুখে পড়েছে। ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের পরিস্থিতি কী অবস্থায় রয়েছে?
উত্তর : দেশের প্রথম শরিয়াহ-ভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ২০০১ সালে যাত্রা শুরু করে আজ পর্যন্ত ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড (আইএফআইএল) তার সব স্টেক হোল্ডার সন্তোষজনক রিটার্ন দিয়ে আসছে। আশানুরূপভাবে আমরা ধারাবাহিকভাবে ভালো করছি, সদ্য সমাপ্ত বছরও ব্যতিক্রম হবে না এবং আশা করছি, আমাদের এ ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে ইনশা আল্লাহ।
প্রশ্ন : চলমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় আপনারা নতুন কোনো সেবা নিয়ে আসবেন কি না?
উত্তর : আমাদের কায়েন্টদের চাহিদা অনুযায়ী আমরা এ বছর ইন্স্যুরেন্স কাভারেজসহ একটি ডিপোজিট প্রোডাক্ট ‘মুদারাবা আমানী ডিপোজিট স্কিমসহ নতুন নতুন আরো কয়েকটি সেবা চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।
প্রশ্নঃ বড় ঋণগ্রহীতাদের অনেকেই ঋণ দিতে পছন্দ করেন কিন্তু ছোট গ্রাহকের ক্ষেত্রে অনীহা দেখান কারণ কী?
উত্তর : তুলনামূলকভাবে বড় ঋণগ্রহীতারা ছোট ঋণ গ্রহীতাদের চেয়ে গোছানোভাবে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করে, যে কারণে তাদের কাগজপত্রাদি হালনাগাদ থাকে এবং ঋণপ্রক্রিয়া সহজ হয়। আর তাই এক সময় সবাই বড় ঋণগ্রহীতাদের ঋণ দিতে পছন্দ করত। বর্তমানে আমরাÑ এ ধারা থেকে বেরিয়ে আসছি। আমাদের টোটাল পোর্টফোলিওর প্রায় ৩৫ শতাংশ এসএমই খাতে। আইএফআইএল এসএমই বিনিয়োগে যথেষ্ট আন্তরিক এবং আশানুরূপ সাফল্য পেয়েছে। আর আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে বিশ্বাস করি, যার ফলে ভবিষ্যতে এসএমই খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছি।
প্রশ্ন : শরিয়াহ আইনের প্রয়োজনবোধ করেন কি না ?
উত্তর : দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট মূলধনের ২৫ শতাংশ রয়েছে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে। শরিয়াহ আইন বর্তমান সময়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ কারণে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য একটি শক্তিশালী শরিয়াহ আইন চালু করা প্রয়োজন। প্রচলিত ব্যাংকগুলোতে টাকার সঙ্কট দেখা দিলে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার তথা কলমানি মার্কেট থেকে ধার নিতে পারে। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেই। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কলমানি মার্কেটের মতো ইসলামী ব্যাংকগুলোর আন্তঃলেনদেনের জন্য আলাদা মার্কেট গঠন জরুরি হয়ে পড়েছে।



আরো সংবাদ