২৫ জানুয়ারি ২০২১
`
আইডিএলসি-পিআরআই গবেষণা

বাড়তি ১০৫.৭ শতাংশ কর্মসংস্থান এসএমইদের

এসএমই অর্থায়নে আরো উদ্যোগের প্রয়োজন : আহসান মনসুর
-

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো পাঁচ বছরের ব্যবধানে গড়ে ১০৫.৭ শতাংশের বেশি নতুন চাকরির সুযোগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সার্বিক শিল্পের, শ্রমশক্তির মধ্যে ৭০ শতাংশ যুক্ত আছে ক্ষুদ্র শিল্পে। বাংলাদেশে শিল্প মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রে এসএমই খাতের ভূমিকা প্রায় ৪৫ শতাংশ। শিল্পে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এই খাতের ভূমিকা ৯০ শতাংশ এবং জাতীয় কর্মসংস্থানে ২৫ শতাংশ। বিশ্বে চার-পাঁচ কোটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর ৪৬ শতাংশ আছে পূর্ব এশিয়াতে। দক্ষিণ এশিয়ায় এই শিল্পের অংশগ্রহণ ২২ শতাংশ। বৈশ্বিক জিডিপিতে এই খাতের ভূমিকা প্রায় ৬০ শতাংশ, কর্মসংস্থানে ভূমিকা ৫০ শতাংশ। আর অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলছেন, কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধিতে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অবদান রয়েছে। এই খাতে বিনিয়োগে আরো সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। এসএমই খাতকে সব সময় ঋণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হলেও অন্যান্য শিল্পের তুলনায় এই খাত থেকে ব্যাংকঋণ খুব সফলভাবে ফিরে আসছে।
আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেড এবং পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) সম্মিলিতভাবে আইডিএলসি ফাইন্যান্সের ৭৮২ এসএমই উদ্যোক্তাদের ওপর পরিচালিত গবেষণায় এই তথ্য পাওয়া গেছে। কর্মসংস্থান তৈরিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ভূমিকা শীর্ষক গবেষণাটি গতকাল মঙ্গলবার ওয়েব কনফারেন্সের মাধ্যমে তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও পিআরআইর পরিচালক ড. বজলুল হক খন্দকার। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ড. আহসান এইচ মনসুর, আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের সিইও এবং এমডি আরিফ খান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়েমা হক বিদিশা। প্রসঙ্গত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিআরআই এক হাজার প্রতিষ্ঠানের ওপর গবেষণা চালিয়েছিল ২০১৯ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক বজলুল হক খন্দকার ও আহসান এইচ মনসুর এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন। জরিপ চালানো হয় আইডিএলসির ঋণ গ্রহীতাদের ওপর। আর আইডিএলসি যখন শুরু করেছিল সেই সময় থেকে প্রায় ১৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রয়েছে তাদের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মসংস্থানে।
গবেষণার তথ্য তুলে ধরে ড. বজলুল হক খন্দকার বলেন, পুরুষ উদ্যোক্তাদের চেয়ে মহিলা মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে (১৪৬.২ শতাংশ) বেশি কর্মসংস্থান তৈরিতে সক্ষম হয়েছে। আর সেবামূলক প্রতিষ্ঠান (সার্ভিস সেক্টর ) সব চেয়ে বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যা বিগত পাঁচ বছরের চেয়ে ১৭৪.২ শতাংশ বেশি বলে গবেষণায় প্রকাশ করা হয়েছে। আইডিএলসির ঋণের প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। এখানে মহিলা উদ্যোক্তারা ভালো করছে। তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানে গড় বিনিয়োগ ছিল তিন কোটি টাকার মতো। বার্ষিক টার্নওভার ছিল প্রায় ছয় কোটি টাকা। ১৯৯০ সাল থেকে ২০০০, ২০০৬ কিংবা ২০১৬ সালের মধ্যে এরা ব্যবসায় শুরু করে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণের জন্যই বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান আইডিএলসির ঋণ নিয়েছিল।
জরিপের তথ্যানুযায়ী, ঋণ নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোতে ১০৫ দশমিক ৭ শতাংশ কর্মসংস্থান হয়েছে। ২০০০ সালে শুরু করা প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছে ১৩৭ শতাংশ। তাদের বার্ষিক গড় কর্মসংস্থান ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। সেবাখাতের প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছে ১৭৪ শতাংশ, শিল্পে ১৩১ শতাংশ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ৭৪ শতাংশ, কৃষিভিত্তিক ব্যবসায় ৩০ শতাংশ। বেতনভুক্ত কর্মচারীর কর্মসংস্থান বেড়েছে ১৩৪ শতাংশ, দিনমজুরের কর্মসংস্থান হয়েছে ৯৪ শতাংশ, পারিবারিক শ্রমের কর্মসংস্থান হয়েছে ৪৬ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, প্রতিটি শিল্পই আসে ছোট থেকে। ছোট থেকে তারা বড় হয়, একবারে বড় হতে যেয়ে অনেকে লোকসানে পড়ে। আজকের উন্নত বিশ্বের কাতারে অবস্থান করা জাপান, কোরিয়া কিংবা চীন একদিনে আসেনি। তারা তাদের এসএমই শিল্প খাত উন্নয়নের কারণে নিজেরা সমৃদ্ধ হয়েছে। তিনি বলেন, অনেক দেশের বড় শিল্পগুলো এসএমই খাতের ওপর নির্ভর করে। সব বড়রাই চিরদিন টিকে থাকবে না। এসএমইকে ছোট চোখে দেখলে চলবে না। তাদের বাদ দিয়ে উন্নয়নের চিন্তা করলে হবে না। জাতীয় পর্যায়ে এসএমইকে নিয়ে পলিসি স্তরে আমরা চিন্তা করি না। তারা উপেক্ষিত। তাদের লবিং করার মতো কোনো শক্তি নেই।
তিনি বলেন, আইডিএলসির এই জরিপ কেবল আইডিএলসি নয়, সমগ্র অর্থনীতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। জরিপে দেখা গেল এসএমই খাতে জব ক্রিয়েশন ভালো, গ্রোথ রেট ভালো এবং ঋণ পরিশোধের হার ভালো। তাই এসএমই খাতে অর্থায়নের দিকে আরো বেশি নজর দিতে হবে। এই খাতে বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জটা বোঝা যায় যখন দেখা যায়, ৯২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান নিজেদের অর্থ দিয়ে ব্যবসায় শুরু করেছে। মাত্র এক থেকে দেড় শতাংশ প্রতিষ্ঠান শুরুতেই বিনিয়োগ পেয়েছিল। এটা নিয়ে পলিসি মেকারদের ভাবতে হবে। একজন উদ্যোক্তাকে সব সময় নিজের টাকা দিয়ে শুরু করতে হবে ব্যাপারটি তা নয়। এর উল্টো চিত্রটা দেখতে পারলে খুশি হতাম।
তিনি বলেন, আমাদের দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এসএমই খাতের ভূমিকা অনেক। দুই কোটির বেশি মানুষের কর্মসংস্থান এ খাতে। কৃষি খাতের পর কর্মসংস্থানে এই খাতের অবস্থান। দেশের চাহিদা মেটাতে ব্যাপক অর্জন এসএমই খাতের। তবে সে হিসাবে এ খাতের বৈদেশিক রফতানি একেবারে নেই বললেই চলে। এরা স্থানীয় বাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে। এ খাতের উন্নয়নে আমাদের ভ্যালু চেইন ডেভেলপ করতে হবে। তিনি বলেন, মাঝারি খাতটি বর্তমানে বাংলাদেশে খুবই দুর্বল। তাদের অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করতে হবে।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, এসএমই খাতে স্যালারি ওয়ার্কার্স বাড়ছে, এটা যেমন ভালো দিক। আবার আগে ১০-১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগে ৩৮ জনের কর্মসংস্থান করা যেতো। এটা এখন আটজনে নেমে এসেছে। তিনি বলেন, আমাদের বিনিয়োগে স্থবিরতা রয়েছে। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাইলে আমাদের বিনিয়োগ আরো বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, মহামারী কোভিডের কারণে অনেক দিক থেকে সমস্যা তৈরি হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের পরিধি কমেছে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে যেমন কাজ করতে হবে তেমনি কোভিডের সময় যারা ব্যবসায় হারিয়েছেন তাদেরকেও তুলে আনতে হবে। তিনি বলেন, আমরা আশাবাদী যে, আইডিএলসির মতো অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানও এসএমই অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ এবং পরামর্শ সেবায় এগিয়ে আসবে।
আইডিএলসির সিইও আরিফ খান বলেন, গত ১৫ বছর আগে এসএমই ফাইন্যান্সিং শুরু করেছিল আইডিএলসি। তার আগে কেবল লার্জ করপোরেট পর্যায়ে ঋণ দিতো আইডিএলসি। করপোরেট খাত থেকে ক্ষুদ্র ঋণে যুক্ত হওয়াটা আইডিএলসির জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এসএমই ফাইন্যান্সিংকে নানা কারণে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হতো। আমরা তবুও একটা ছোট্ট টিম নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। ১৫ বছর পর দেখা যাচ্ছে আইডিএলসির ৪৬ শতাংশ ঋণই যাচ্ছে অণু, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নন-পারফরমিং লোন (এনপিএল) বা অলস/খারাপ ঋণের পরিমাণ ১০ শতাংশ। কিন্তু আইডিএলসির এনপিএল রয়েছে তিন শতাংশের মধ্যে। তাহলে আমাদের দুশ্চিন্তাটি আর থাকল না। সঠিক নিয়মে কাজ করে যেতে পারলে এসএমই ফাইন্যান্সের একটা বিরাট ভবিষ্যৎ আছে বলেই মনে করি।



আরো সংবাদ