২৫ জানুয়ারি ২০২১
`
করোনায় অর্থনৈতিক সঙ্কট

উপকূলে বাড়ছে শিশুশ্রম

-

মরণঘাতী মহামারী করোনার বিরূপ প্রভাব পড়ছে অর্থনীতির ওপর। অর্থনৈতিক সঙ্কটের ফলে দু’মুঠো ভাত ও বস্ত্রের জন্য উপকূলীয় অঞ্চলের শিশুরা দিন দিন ঝুঁকে পড়ছে শিশুশ্রমে। শিশুবেলার এ সময়টা শিক্ষার আলোতে আলোকিত হওয়ার কথা ছিল ওদের। কিন্তু তারা এখন কর্মব্যস্ত শুঁটকিপল্লীতে। ওদের কাঁধেও সংসারের অভাব-অনটনের বোঝা। দারিদ্র্যের কষাঘাতে অনিশ্চয়তার মধ্যে ওদের শৈশব। শিশুশ্রমের বেড়াজালে বন্দিজীবন কাটে উপকূলের হাজারো শিশুর।
মহামারী করোনাভাইরাসের ফলে উপকূলীয় অঞ্চল কুয়াকাটায় প্রতিনিয়ত শিশুশ্রমে যুক্ত হওয়া ও বাল্যবিবাহের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিসহ অনিশ্চয়তার মধ্যে শিশুদের জীবন। করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা, খেলাধুলায় অংশগ্রহণ না করা, অপর দিকে পরিবারের আর্থিক সমস্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখানকার হতদরিদ্র শিশুরা যুক্ত হচ্ছে শিশুশ্রমে।
কুয়াকাটার পাঞ্জুপাড়ার শিশুশ্রমিক মেহেদি হাসান (১২) ‘দৈনিক ১০-১২ ঘণ্টা কাজ করে শুঁটকিপল্লীতে। সকাল থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাছ রোদে শুকানো, নৌকা থেকে মাছ তোলা, মাছ কাটা থেকে শুরু করে সব কাজ করতে হয় তাকে। বেতনের কথা জিজ্ঞেস করলে সে বলে ৩০০-৩৫০ টাকা পাই। এ বয়সে কেন কাজ করছ ? জানতে চাইলে সে আরো বলে, পেটের দায়ে কাজ করতে আসছি। মেহেদীর মতো অনেক শিশুশ্রমিক রয়েছে, যারা এ শুঁটকিপল্লীতে কাজ করছে।
এ দিকে স্বাস্থ্যসুরক্ষা বলতে কোনো কিছুই বোঝে না এ শুঁটকিপল্লীতে কাজ করা শিশুরা। এসব শিশু বেড়ে উঠছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। ফলে দিন দিন রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ছে শিশুরা। মাছ শুকানো, মাছ কাটা, মাছ প্যাকেট করাই এদের কাজ। বেশির ভাগ শিশু অস্থায়ীভাবে তোলা ঘরেই রাত যাপন করে।
সরেজমিনে মহীপুর থানার গোড়াখালের শুঁটকিপল্লীতে কথা হয় মো: সুমন (১৩) নামের এক শিশু শ্রমিকের সাথে। সুমন জানায়, ‘ঘরে থাইক্কা যে মোরা ল্যাহা পড়া হরমু (করমু) হেইয়া মোগো কপালে নাই। মোগো ঘরে ভাত নাই। তাই বদলা (শ্রমিক) দিয়ে ৩০০-৩৫০ টাকা পাই তা দিয়ে ঘরে চাল কিনি।’ সুমনের মতো হাজারও শিশুর স্বপ্নগুলো এভাবেই নষ্ট হচ্ছে।
সরজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, জেলেদের মুখে মাস্ক নেই। স্বাস্থ্যবিধি মানছে না কেউ। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের জেলেরা ট্রলার ভর্তি মাছ নিয়ে আসে এখানে। থাকার পরিবেশের অবস্থা শোচনীয়। শুঁটকিপল্লীর জেলেদের সাথে থাকা দুই-তিন বছরে শিশুগুলো অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে উঠছে। এ দিকে শুঁটকিপল্লী ছাড়াও বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁয় ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত থাকতে দেখা যায় এ অঞ্চলের শিশুদের।
উপকূলীয় মানব উন্নয়ন সংস্থার (সিকোডা) চেয়ারম্যান শাহাবুদ্দিন মিরাজ মুসুল্লী বলেন, ‘জাতীয় শিশুশ্রম নীতি অনুসারে শিশুশ্রমের কারণ অনুসন্ধান, এর পেছনে আর্থসামাজিক কারণগুলো খোঁজা, শিশুর মৌলিক চাহিদা পূরণের ঘাটতি কোথায় তা নির্ণয় করে সরকারের পাশাপাশি সচেতন মহলের ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।
শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা স্থানীয় সংগঠন রুরাল এনহ্যান্সমেন্ট অরগানাইজেশনের (রিও) সভাপতি মাওলানা হাবীবুল্লাহ জানান, অর্থসঙ্কটের সময় অনেক পরিবারই খাদ্য জোগানের জন্য শিশুদেরও কাজে লাগিয়ে দেয়। আমাদের উচিত শিশুদের শ্রমে না লাগানো।
কলাপাড়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আবু হাসনাত মোহাম্মাদ শহিদুল হক জানান, মহামারীর সময় স্কুল বন্ধ থাকায় শিশুশ্রম ও বাল্যবিয়ে বেড়ে গেছে। শিশু শ্রম বন্ধ ও বাল্যবিয়ে রোধে আমরা সচেষ্ট আছি।



আরো সংবাদ