০২ ডিসেম্বর ২০২০

রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দুর্বৃত্তরা এ ধরনের অপরাধ করছে

গৃহবধূ বিবস্ত্র ঘটনায় অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদন
-

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবহেলা পেয়েছে হাইকোর্টের গঠন করে দেয়া অনুসন্ধান কমিটি। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দুর্বৃত্তরা সংগঠিত হয়ে এই ধরনের কাজ করছে। এতে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বিভিন্ন ধরনের গ্রুপ বা বাহিনী গড়ে উঠছে। এই গ্রুপ বা বাহিনীগুলো সমাজে বিভিন্ন অনৈতিক কার্যকলাপ ও অপরাধের জন্ম দিচ্ছে। জীবনের স্বাভাবিকতা থেকে সরে এসে এরা চরম নৃশংস হয়ে উঠছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো: মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মহিউদ্দিন শামীমের ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চে অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদন দাখিল করা হলে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক প্রতিবেদনের বেশ কিছু অংশ পড়ে শোনান। এ সময় আদালতে যুক্ত ছিলেন ঘটনাটি আদালতের নজরে আনা আইনজীবী জেড আই খান পান্না ও মো: আবদুল্লাহ আল মামুন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নওরোজ রাসেল চৌধুরী। বিটিআরসির পক্ষে ছিলেন রেজা-ই রাকিব।
আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, হাইকোর্ট কমিটির কাছে পাঁচটি বিষয় জানতে চেয়েছিল। ওই নারীর নিরাপত্তা, জবানবন্দী নেয়া, দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণসহ সার্বিক ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন বা জনপ্রতিনিধিদের কোনো অবহেলা ছিল কি না?
কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের অবহেলা ছিল। ওই নারী স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যের (মেম্বার) কাছে অভিযোগ করেছিলেন, কিন্তু ওই সদস্য তা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেন।
আর ওই সার্কেলের এএসপি ও বেগমগঞ্জ থানার ওসির বিষয়ে বলা হয়েছে, তাদের এ ঘটনা না জানার কোনো সুযোগ নেই। নিজস্ব সোর্স থাকার পরও কেন পুলিশ জানতে পারবে না, তা কমিটির বোধগম্য হয়নি। এটি পুলিশ প্রশাসনের অবহেলা বলেই উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
ভুক্তভোগী নারীর বাবার দায় নিয়ে অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদন তুলে ধরে এ আইনজীবী বলেন, অনুসন্ধান কমিটি বলেছে, ওই নারীর বাবা অনেক কিছুই জানতেন। কিন্তু দেলোয়ার বাহিনীর হুমকিতে ভয়ে তিনি কাউকে কিছু জানাননি। এ কারণে বাবার কোনো অবহেলা বা দায় খুঁজে পায়নি তদন্ত কমিটি।
আইনজীবী মামুন বলেন, ওই নারীর স্বামীর বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই নারীর সাথে গত ১০ থেকে ১২ বছর ধরে তার যোগাযোগ ছিল না। ঘটনার চার-পাঁচ দিন আগে ওই নারীর সাথে তার যোগাযোগ হয়। দেলোয়ার বাহিনীর বিষয়ে সব কিছু জেনেও সে নিষ্ক্রিয় ছিল।
আর ভিডিওর বিষয়ে অনুসন্ধান কমিটি বলেছে, এটি করা হয়েছিল ওই নারীকে অনৈতিক কার্যকলাপে যুক্ত প্রমাণ করার জন্য।
নোয়াখালীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের এই অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদন বৃহস্পতিবার আদালতে উপস্থাপন করা হয়। অনুসন্ধান কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এবং চৌমুহনী সরকারি এস এ কলেজের অধ্যক্ষ।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের একলাসপুর ইউনিয়নের একটি গ্রামে ওই নারীর ঘরে ঢুকে তাকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন করেছিল কয়েকজন যুবক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই ঘটনার ভিডিও ফুটেজের একটি কপি সংরক্ষণ করে বাকিগুলো সরানো হয়েছে বলে আদালতে জানিয়েছে বিটিআরসি। ওই ঘটনা অনুসন্ধানে গঠিত কমিটির প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করার পর এ বিষয়ে শুনানির জন্য আগামী ১২ নভেম্বর দিন ধার্য করেছেন আদালত।
আদালতে বিটিআরসির পক্ষে জানানো হয়, আদালতের আদেশ মতো একটি কপি সংরক্ষণ করা হয়েছে। একটি অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ফেসবুক বিটিআরসিকে ফুটেজ সরানোর কথা ই-মেইলের মাধ্যমে জানিয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২ সেপ্টেম্বর রাত ৯টার দিকে উপজেলার একলাশপুর ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের খালপাড় এলাকার নূর ইসলাম মিয়ার বাড়িতে গৃহবধূর বসতঘরে ঢুকে তার স্বামীকে পাশের কক্ষে বেঁধে রাখে স্থানীয় বাদল ও তার সহযোগীরা। এরপর গৃহবধূকে ধর্ষণের চেষ্টা করে তারা। এ সময় গৃহবধূ বাধা দিলে তাকে বিবস্ত্র করে বেধড়ক মারধর করে তারা মোবাইলে ভিডিও চিত্র ধারণ করে। ঘটনার ৩২ দিন পর ৪ অক্টোবর রোববার গৃহবধূকে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশ পেলে তা ভাইরাল হয়।

 


আরো সংবাদ