২০ অক্টোবর ২০২০

প্রকল্পে ২২৬ কোটি টাকা প্রশাসনিক ব্যয় রহস্যজনক

প্রস্তাবনা সংশোধনেই ব্যয় ৯০০ কোটি টাকা বৃদ্ধি; সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিয়ে কমিশনের সংশয়
-

হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে উন্নয়ন প্রকল্প। কিন্তু তার জন্য কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই বা সমীক্ষা করা হয়নি। সমীক্ষা ছাড়া প্রকল্পটি বাস্তবায়নে শুধু প্রশাসনিক খরচই ২২৬ কোটি ২৭ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এই খরচের কোনো বিভাজন দেখানোও হয়নি। প্রকল্প প্রস্তাবনা পুনর্গঠনের জন্য ২০১৮ সালে ফেরত পাঠানো হয়। সেই প্রকল্পের খরচ এখন প্রায় ৯শ’ কোটি টাকা বৃদ্ধি করে প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনের কাছে পাঠিয়েছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। আগামী রোববার আবার মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় এটি উপস্থাপন করা হবে বলে ভৌত অবকাঠামো বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের পুনর্গঠিত প্রস্তাবনার তথ্যানুযায়ী, বিটিসিএলের বিদ্যমান অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্কের উন্নয়ন ও রিং টাইপ নেটওয়ার্ক রূপান্তরকরণের জন্য এক হাজার ২৬৫ কোটি ১৩ লাখ ৯৮ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এই প্রস্তাব ২০১৮ সালে প্রথমে যখন দেয়া হয় তখন ব্যয় ধরা হয় ৩৬৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। পরে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি থেকে ডিপিপি পুনর্গঠন করতে বলা হলে ব্যয় বাড়ানো হয় ২৪৩ শতাংশ বা ৮৯৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। আর প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যায়, প্রকল্পে কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলে ৩৯ জনের বেতনভাতা, অফিস আসবাবপত্র, অফিস ইকুইপমেন্ট খাতে আলাদাভাবে খরচ বরাদ্দ করা হয়েছে। তারপরও বিটিসিএলের ক্যাবল নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্পে প্রশাসনিক খাতে ২২৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাবনায় আপত্তি জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। ঠিক বছর পেরিয়ে আবারো একই অঙ্ক বরাদ্দ দেখাল প্রশাসনিক খরচে। অন্য দিকে ২৫ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে সম্ভাব্যতা যাচাই আবশ্যিক বিধান রয়েছে। কিন্তু বিটিসিএলের এই প্রকল্পের সমীক্ষা প্রতিবেদন নিয়ে কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সংশয় রয়েছে। সমীক্ষাটি যথাযথভাবে হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট উইং সূত্রে জানা গেছে।
প্রকল্পের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে, সমগ্র বাংলাদেশ অতিরিক্ত অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল লিংক সুবিধার আওতায় আনা, পল্লী এলাকা পর্যন্ত উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্রডব্যান্ড সেবা সুবিধার আওতায় আনার লক্ষ্যে বিটিসিএলের টেলিযোগাযোগ কাঠামো আধুনিকীকরণসহ উচ্চমানের ট্রান্সমিশন সুবিধা নিশ্চিত করা, বিদ্যমান অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ককে রিং টাইপ নেটওয়ার্ক টপোলজিতে রূপান্তর করা এবং জনগণকে আধুনিক আইসিটি সেবা সুবিধার আওতায় আনা। দেশের ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বিটিসিএল অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল নেটওয়ার্কের আওতায় আসা সত্ত্বেও অতিরিক্ত নেটওয়ার্ক নিশ্চয়তা না থাকায় নিরবচ্ছিন্ন আধুনিক টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা এবং উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড সেবা প্রদান করা সম্ভব নয়। তাই এই প্রকল্প, যা আগামী ৩ বছরে বাস্তবায়ন করা হবে।
ব্যয় পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রকল্পে ২৭ জন কর্মকর্তার জন্য বেতন খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৭৯ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। আর ৬ জন কর্মচারীর বেতন ধরা হয়েছে ৬৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। আর ৩৯ জন জনবলের ভাতা বাবদ ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩ কোটি ৯৭ লাখ ৪১ হাজার টাকা। অন্য দিকে প্রশাসনিক খাতে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ২২৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা। যেখানে অফিস আসবাবপত্র, অফিস ইকুইপমেন্ট দু’টি খাতেই ৭১ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। সেখানে প্রশাসনিক খাতে এই বিরাট অঙ্কের বরাদ্দের বিভাজন চেয়েছে পিইসি। অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল ও যন্ত্রপাতি কিনতে খরচ ধরা হয়েছে ২১২ কোটি ১৫ লাখ টাকা, টেলিসরঞ্জমাদি কিনতে ব্যয় হবে ৬৫১ কোটি ৮৮ লাখ ৮১ হাজার টাকা।
পরিকল্পনা কমিশনের যোগাযোগ উইং যুগ্ম প্রধান মো: সেলিম ডিপিপি বিশ্লেষণ করে কার্যপত্রে বলছেন, প্রশাসনিক যে ব্যয় দেখানো হয়েছে তার কোনো ব্রেকআপ দেয়া হয়নি। পণ্য ক্রয়ের প্রস্তাবে ৬৫৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকার একটি প্যাকেজ এবং ২১৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকার একটি প্যাকেজ মোট ২টি প্যাকেজ ধরা হয়েছে। যাতে মোট ব্যয় ৮৭৩ কোটি টাকা। প্রকল্প খরচের অবশিষ্ট ৩৯২ কোটি টাকার কোনো ক্রয় পরিকল্পনা দেয়া হয়নি। পরিকল্পনা বিভাগ হতে অক্টোবর-২০১৬তে জারিকৃত পরিপত্রের অনুচ্ছেদ-৯ ও অনুচ্ছেদ-১০ এর শর্তানুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি কর্তৃক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের মনিটরিং সেল থেকে ছাড়পত্র সংগ্রহ করা আবশ্যক। জনবলের বিষয়ে অর্থ বিভাগ হতে নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের পদ বা জনবল নির্ধারণ সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সুপারিশ গ্রহণ করা হলেও অর্থ বিভাগের মনিটরিং সেল হতে কোনো ছাড়পত্র গ্রহণ করা হয়নি। এই প্রকল্পের ব্যয় এতটা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভৌত অবকাঠামো বিভাগ। প্রকল্পের কার্যপরিধি ও ব্যয় এত অধিক বৃদ্ধির বিষয়টি যৌক্তিক বলে প্রতীয়মান হয় না।
এ ব্যাপারে ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) শামীমা নার্গিসের মন্তব্য জানার জন্য কয়েক দফা তার সেলফোনে কল করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, একটি প্রকল্পে প্রশাসনিক খরচ ২২৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা রহস্যজনক ফিগার। বেতনভাতা ও অন্যান্য খরচ আলাদা করার পরও কেন এই বিরাট অঙ্ক প্রশাসনিক খাতে? এটার ব্যাখ্যা চাওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, এক বছরের ব্যবধানে প্রকল্পের ব্যয় ২৪৩ শতাংশ বৃদ্ধিটাও প্রশ্নবিদ্ধ। এই খাতে রেট শিডিউল ও মূল্যস্ফীতির কোনো প্রশ্ন আসে না। উল্টো আগের চেয়ে বিশ্ববাজারে এই সব জিনিসের দাম কমছে। ফলে প্রকল্পের বাস্তবায়ন খরচ হ্রাস পাওয়ার কথা। প্রকল্পে এমন কি বাড়ানো হলো যে ব্যয় এত বাড়বে? কিসের ক্ষেত্রে রেট শিডিউল বাড়ছে।


আরো সংবাদ