১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০

যুবলীগ নেতা ডিজে শাকিল গ্রেফতারের পর বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য

-

সিরাজগঞ্জের তাড়াশের রিশান গ্রুপের আলোচিত চেয়ারম্যান, যুবলীগ নেতা প্রতারকচক্রের হোতা রাব্বী শাকিল ওরফে ডিজে শাকিল গ্রেফতারের পর তার নানা অপকর্মের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। দুই সহযোগীসহ শাকিল এখন বগুড়া ডিবির কাছে ৫ দিনের রিমান্ডে রয়েছে।
এলাকার কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শাকিল তার অপকর্ম সফল করার জন্য দেশব্যাপী গড়ে তোলে দালাল চক্র। ভুক্তভোগীদের বিভিন্ন ধরনের লোভ দেখিয়ে দালালরা নিয়ে আসত তার অফিসে। বড় বড় ক্লায়েন্ট অফিসে এলে তাদের আপ্যায়ন করা হতো রাজকীয়ভাবে। শাকিল ও তার সহযোগীরা গ্রেফতার হওয়ার পর মুখ খুলতে শুরু করেছেন ভুক্তভোগীরা। কিভাবে তারা প্রতারিত হয়ে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও দালালদের মিথ্যা মামলায় এলাকাছাড়া হয়েছেন, তা বলতে শুরু করেছেন। এমনই এক ভুক্তভোগী পাবনার সুজানগর উপজেলার মাছপাড়া গ্রামের মোকসেদ আলীর ছেলে জিয়াউর রহমান অভিযোগ করে বলেন, এবি ব্যাংকে চাকরি দেয়ার কথা বলে আমার কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা নেয় শাকিল। তাড়াশের মৃত তোজাম্মেল হকের ছেলে রুহুল আমিন বলেন, ডিসি অফিসে অফিস সহকারী পদে চাকরি দেয়ার কথা বলায় তাকে ৩০ লাখ টাকা দিয়েছি। পরে চাকরির নিয়োগপত্র ভুয়া প্রমাণিত হওয়ায় ডিজের বিরুদ্ধে আদালতে নিয়মিত মামলা দায়ের করি। উল্লাপাড়া উপজেলার আলিচক গ্রামের সোনা উল্লাহর ছেলে খোকন মিয়া জানায়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগে মুদ্রাক্ষরিক কাম-কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি দেয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা নেয়। এরপর ডিজে শাকিল তাকে যোগদানপত্র দেয়। পরে জানতে পারি সেটি ভুয়া। একই উপজেলার আংগাড়– গ্রামের আবদুল জলিলের ছেলের কাছ থেকে স্বাস্থ্য বিভাগের ক্যাশিয়ার নিয়োগ দেয়ার কথা বলে ৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। চাকরিতে যোগদান করতে গেলে নিয়োগপত্র ভুয়া প্রমাণিত হয়। পরে শাকিলের কাছে টাকা ফেরত চাইতে গেলে সে তাকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেখাতে থাকে। এ ছাড়াও উল্লাপাড়ার আলিয়াপুর গ্রামের আবদুর রহিমের ছেলে রিপন মিয়া বলেন, আমাকে হাসতালের ওয়ার্ড বয় পদে চাকরি দেয়ার কথা বলে ৭ লাখ নেয়। কিছু দিনের মধ্যে একটি মৌখিক (ভাইভা) পরীক্ষার কার্ড হাতে দিয়ে আরো ২ লাখ দাবি করেন। বাধ্য হয়ে টাকা দেই। তাকে বলা হয়, ভাইভা দিতে হবে না, সরাসরি নিয়োগ হবে। তখন ঢাকায় স্বাস্থ্য অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা যায় এ ধরনের কোনো নিয়োগ নেই। পরে টাকা ফেরত চাইতে গেলে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে টাকা না দিয়ে তাকে তাড়িয়ে দেয়। একই উপজেলার বেরাবাড়িয়া গ্রামের আক্কাস আলীর ছেলে গিয়াস উদ্দিনের অভিযোগ, সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অফিস সহকারী পদে চাকরি বাবদ ৭ লাখ টাকা শাকিলকে সে দেয়। কিন্তু তিনি তাকে চাকরি দিতে পারেননি। টাকা ফেরত চাইতে গেলে বলে চাকরি হবে, ধৈর্য ধরতে হবে। একইভাবে চাকরি দেয়ার কথা বলে নাটোর জেলার বনপাড়ার বুলবুল আহম্মেদের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা, নাটোর নিচা বাজার এলাকার সৈকতের কাছ থেকে ৯ লাখ টাকা শাকিল হাতিয়ে নেয়।
স্থানীয় একাধিক লোক অভিযোগ করে বলেন, ডিজে শাকিল কোম্পানির চেয়ারম্যান হলেও মূলত প্রযুক্তি বিষয়ে প্রতারণার মূল হোতা হুমায়ন কবির লিমন। সে প্রযুক্তি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। হুমায়ন কবির লিমন বিএ পাস করে বর্তমানে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে মাস্টার্স করছেন। তারা আরো জানান, শাকিল মূলত কম শিক্ষিত, সেই সুযোগে তাকে ব্যবহার করে প্রতারণার বেশির ভাগ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তার ম্যানেজিং ডিরেক্টর হুমায়ন কবির লিমন। সে তাড়াশ পৌর এলাকায় একটি আলীশান বাড়ি তৈরির কাজ শুরু করেছেন।
জানা যায়, এর আগে ডিজে শাকিল দীর্ঘ দিন ঢাকায় থাকত। সে সুবাদে সরকারদলীয় বিভিন্ন নেতা, এমপি, মন্ত্রীর সাথে তার সখ্যতা গড়ে ওঠার কথা শোনা যায়। ২০১২ সাল থেকে সে তাড়াশে নিয়মিত বসবাস করত। তাড়াশ উপজেলা পরিষদের গেটে ও আলেফ মোড়ে রয়েছে তার বিলাসবহুল অফিস। শাকিল ভোগ্যপণ্য উৎপাদনের কারখানা পরিচালনা করেন বলে স্থানীয় লোকজনের কাছে পরিচয় দিত।
এ ছাড়া আউট সোর্সিংয়ে চাকরি দেয়া, বিভিন্ন ব্যাংকের লোন পাইয়ে দেয়ার কথা বলে, বিভিন্ন চাকরি বার্তা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে ও বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি চাকরি দেয়ার নামে চমকপদ বিজ্ঞাপন দিয়ে খুলে বসেন প্রতারণার ফাঁদ। সর্বস্বান্ত হন শত শত মানুষ। তিনি রাতারাতি বনে যান কোটি কোটি টাকা মালিক। তাড়াশে হয়ে ওঠেন গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যে একজন। বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিশাল অঙ্কের উপঢৌকন ও ডোনেশান দিয়ে পরিণত হন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বে। আর এ ধরনের প্রতারণা কাজে বিশ্বাস অর্জন করতে তিনি বিভিন্ন এমপি ও মন্ত্রীর নাম ও ছবি ব্যবহার করতেন। ডিজে শাকিল তাড়াশ সদরের খাঁ পাড়ায় সুদৃশ্য বাড়ি, দু’টি বিলাসবহল অফিস, ৮টি ট্রাক, পৌর এলাকায় কাউরাইলে একটি ফুড প্রডাকসের কারখানার মালিক। তিনি খাঁ পাড়ার বাসিন্দা ও তাড়াশ উপজেলা কৃষকলীগ সভাপতি কাজী গোলাম মোস্তফার ছেলে। ব্যক্তিজীবনে তিনি স্কুলের গণ্ডিও পার হতে পারেননি।
এ বিষয়ে তাড়াশ থানার ওসি মো: মাহবুল আলম বলেন, থানায় তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। ডিজে শাকিল বর্তমানে বগুড়া ডিবি পুলিশের হেফাজতে ৫ দিনের রিমান্ডে রয়েছে। গতকাল শনিবার তৃতীয় দিন পার হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন ডিবির পরিদর্শক ইমরান মাহমুদ তুহিন। তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, শাকিল এ পর্যন্ত ২০ জনের কাছ থেকে ৫৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার কথা স্বীকার করেছে। এ ২০ জনের নাম দিলেও তাদের ঠিকানা ও মোবাইল ফোন নম্বর দেয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, এ সংখ্যা ও টাকার পরিমাণ বেশি হবে। উল্লেখ্য, গত বুধবার বগুড়া সদর থানায় প্রতারণা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এক ব্যবসায়ীর মামলায় ওই দিন বিকেলে বগুড়া ডিবির পরিদর্শক ইমরান মাহমুদ তুহিনের নেতৃত্বে একটি টিম তাড়াশ উপজেলা সদরে অবস্থিত রিশান গ্রুপের অফিসে অভিযান চালিয়ে শাকিলকে দুই সহযোগীসহ গ্রেফতার করে। এরপর তার অফিস থেকে এক হাজার ২০১ কোটি ৭২ লাখ ১০ হাজার টাকার বিভিন্ন ব্যাংকের ভুয়া চেক বই, সামরিক বাহিনীসহ বিভিন্ন অফিসের ভুয়া নিয়োগপত্রসহ প্রতারণার বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করে।


আরো সংবাদ