২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

দেশের ৩ কোটি ৫৫ লাখ শিশু সিসা বিষে আক্রান্ত

বিপজ্জনক মাত্রার সিসা মস্তিষ্কের ক্ষতি করে ; সবার বুদ্ধিমান (আইকিউ) কমায়
-

বাংলাদেশের তিন কোটি ৫৫ লাখ শিশুর রক্তে বিপজ্জনক মাত্রায় সিসা রয়েছে, এরা সিসা বিষে আক্রান্ত। অপর দিকে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ শিশু সিসা বিষে আক্রান্ত। অর্থাৎ বিশ্বের প্রায় ৮০ কোটি শিশুর রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে সিসার পরিমাণ ৫ মাইক্রোগ্রাম বা এর চেয়ে বেশি। এই শিশুদের প্রায় অর্ধেকের বসবাস দক্ষিণ এশিয়ায়। সিসার বিষক্রিয়ায় বিশ্বে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। রক্তে সিসার মাত্রা কমিয়ে আনার জন্য ইউনিসেফ সিসা এসিড ব্যাটারির পুনর্ব্যবহার বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। ‘ইউনিসেফ ও পিউর আর্থ’ প্রকাশিত বৈশ্বিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
‘দ্য টক্সিক ট্রুথ: চিলড্রেন্স এক্সপোজার টু লিড পলিউশন আন্ডারমিন্স এ জেনারেশন অব পটেনশিয়াল’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে শিশুদের সিসার বিষক্রিয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিসা শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের জন্যই উল্লেখযোগ্য মাত্রায় স্বাস্থ্যঝুঁঁকি তৈরি করে। এ ছাড়া ইনস্টিটিউট অব হেলথ মেট্রিক্স ইভাল্যুয়েশনের তথ্য অনুসারে, সিসার বিষক্রিয়ায় বিশ্বে যেসব দেশে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি, সেই দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ এবং জনসংখ্যার প্রত্যেকের রক্তে সিসার উপস্থিতির গড় হার প্রতি ডেসিলিটারে ৬.৮৩ মাইক্রোগ্রাম। এটা সর্বোচ্চ হারের দিক থেকে বিশ্বে ১১তম।
এই গবেষণায় আরো দেখা গেছে, বাংলাদেশে মসলায় উচ্চ মাত্রায় সিসার উপস্থিতি ছিল। রঙ চকচকে করার জন্য এবং ওজন বাড়ানোর জন্য হলুদে ব্যবহৃত ‘লেড ক্রোমেট’ শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের রক্তে সিসার মাত্রা বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। সমীক্ষা অনুসারে, কিছু পণ্যে সিসার উপস্থিতি অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে ৫০০ গুণ পর্যন্ত বেশি পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিসা সবারই আইকিউ (বুদ্ধিমান) হ্রাস করে থাকে। এতে করে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশে যে ক্ষতি হয় তা দেশের মোট জিডিপির ৫.৯ শতাংশের সমান। সিসার বিষক্রিয়া শিশুদের পরিপূর্ণ বিকাশে বাধাগ্রস্ত করে এবং জীবনে পাওয়া সুযোগগুলোর সর্বাধিক সুবিধা গ্রহণে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সিসা একটি শক্তিশালী নিউরোটক্সিন। এটা শিশুদের মস্তিষ্কে অপূরণীয় ক্ষতি করে। এটি বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য ধ্বংসাত্মক পরিণতি বয়ে আনে। কারণ মস্তিষ্ক পুরোপুরি বিকশিত হতে সিসা বাধা প্রদান করে এবং ক্ষতি করে। ফলস্বরূপ সারা জীবনের জন্য শিশুরা স্নায়ুবিক, মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে। শৈশবকালীন সিসাজনিত বিষক্রিয়া মানসিক স্বাস্থ্য ও আচরণগত সমস্যা এবং অপরাধ ও সহিংসতা বৃদ্ধির সঙ্গেও সম্পর্কিত। প্রতিবেদনে বলা হয়, বড় শিশুরা পরবর্তী জীবনে কিডনি নষ্ট হওয়ার এবং কার্ডিওভাসকুলার রোগে আক্রান্ত হওয়ার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিসহ ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করে। শৈশবকালীন সিসাজনিত বিষক্রিয়ার শিকার হওয়া শিশুদের জীবনভর অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।
নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতি হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সিসা এসিড ব্যাটারির অনানুষ্ঠানিক ও নিম্নমানের পুনর্ব্যবহার নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোর শিশুদের মধ্যে সিসাজনিত বিষক্রিয়ায় প্রধান ভূমিকা রাখে। ২০০০ সালের পর থেকে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে সিসা এসিড ব্যাটারির ব্যবহার তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সিসা নিয়ে কাজ করা বাবা-মায়েরা তাদের পোশাক, চুল, হাত ও জুতার মাধ্যমে সিসা মিশ্রিত ধুলা নিয়ে আসেন এবং এতে করে অজান্তেই তাদের শিশুরা বিষাক্ত এই উপাদানের সংস্পর্শে আসে।

নিজস্ব প্রতিবেদক


আরো সংবাদ