২৭ নভেম্বর ২০২০

অর্থবছর শেষ হলেও শেষ হয়নি কেনাকাটা

ত্রাণ মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর রশি টানাটানি
-

বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে অসহায় হয়ে পড়া মানুষের সহযোগিতার জন্য গত বছর ১৭০ কোটি টাকার ঢেউটিন, শুকনো খাবার ও কম্বল ক্রয় করে সরকার। কিন্তু ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষ হলেও এই অর্থবছরের কেনাকাটা শেষ করতে পারেনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। গত জানুয়ারিতে এসব কেনাকাটার জন্য টেন্ডার আহ্বান করে সংশ্লিষ্ট অধিদফতর। কিন্তু বিধিবহির্ভূতভাবে ক্রয় কমিটির সভাপতি নিয়োগ দেয়ায় বাধ সাধে মন্ত্রণালয়। এরপর রি-টেন্ডার করা হয়। অধিদফতর ও মন্ত্রণালয়ের রশি টানাটানিতে বছর শেষ হয়ে গেলেও এখনো হয়নি কেনাকাটা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুর্যোগে অসহায় মানুষের জন্য চলতি বছরের জানুয়ারিতে পাঁচটি প্যাকেজে ৭৫ কোটি টাকার ঢেউটিন ক্রয়ের দরপত্র আহ্বান করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর। টেন্ডারে ছয়টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র দাখিল করে। গত ৩০ জানুয়ারি দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির বৈঠকে ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের ঢেউটিনের নমুনা বুয়েটের গুণগতমান পরীক্ষায় সঠিক না পাওয়ায় এবং দাখিলকৃত কাগজপত্র সঠিক না থাকায় মেসার্স উর্মি এন্টারপ্রাইজ, আলাল এগ্রো ফুড প্রোডাক্টস, কর্ণফুলী গ্যালভানাইজিং মিলস লিমিটেড, মেসার্স জয় এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স সানজি ট্রেড ইন্টারন্যাশনালকে নন রেসপনসিভ করা হয়। আর পাঁচটি প্যাকেজেই কে,ওয়াই স্টিল মিলস লিমিটেডকে রেসপনসিভ করে মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। কিন্তু বিধিবহির্ভূতভাবে ক্রয় কমিটির সভাপতি মনোনয়ন দেয়ায় সেই প্রস্তাব অনুমোদন করেনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এরই মধ্যে কয়েক দফা চিঠি চালাচালি হয় মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের মধ্যে।
গত ৩০ মার্চ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো: শাহজাহান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের মহাপরিচালক দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি গঠন সংক্রান্ত ১৮ মার্চ যে বক্তব্য প্রদান করেছেন তা যুক্তিসঙ্গত এবং গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ দরপত্রটি ৫০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে হওয়ায় বিষয়টি সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপন যোগ্য। এই মন্ত্রণালয়ের ২০ নভেম্বর ২০১৯ তারিখে পিপিএ ২০০৬ এবং পিপিআর, ২০০৮ এর বিধিবিধান অনুযায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরে ঢেউটিন ক্রয়ের স্পেসিফিকেশন এবং প্রশাসনিক অনুমোদন প্রদান করে এবং মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে যুগ্ম সচিব এ কে এম টিপু সুলতানকে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হয়। কিন্তু মহাপরিচালক, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর তাকে মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি করেন যা বিধিবহির্ভূত। এমতাবস্থায় পিপিএ, ২০০৬ এবং পিপিআর, ২০০৮-এর সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুযায়ী দরপত্র মূল্যায়ন করে প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য অনুরোধ করা হয়।
সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা আমলে নিয়ে দরপত্র মূল্যায়নে নতুন কমিটিকে দিয়ে আবারো দরপত্র আহ্বান করে অধিদফতর। নতুন এই কমিটি আগের কমিটির নমুনা ঢেউটিনের গুণগতমান সঠিক না পাওয়ায় এবং দাখিলকৃত কাগজপত্র সঠিক না থাকায় নন রেসপনসিভ হওয়া কর্ণফুলী গ্যালভানাইজিং মিলস লিমিটেডকে চারটি প্যাকেজে এবং আগের মূল্যায়ন কমিটির পাঁচটি প্যাকেজেই রেসপনসিভ হওয়া কে,ওয়াই স্টিল মিলস লিমিটেডকে এক প্যাকেজে রেসপনসিভ করে কাজ দেয়ার সুপারিশ করে।
এর আগের বছরগুলোতে প্রতি বান্ডেল ঢেউটিন ক্রয় করা হয়েছে প্রায় দেড় লাখ টাকায়। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানগুলো টেন্ডারে দর দিয়েছে এক লাখ ছয় হাজার টাকায়। দর কমিটির দর রয়েছে এক লাখ ১৮ হাজার টাকা তার থেকে কম মূল্যে দিচ্ছে আগের টেন্ডারে নন রেসপনসিভ হওয়া দরদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। দুর্যোগকালীন অসহায় মানুষকে নি¤œমানের পণ্য বিতরণ করা হয়। পণ্য গ্রহণকারী কমিটিকে ম্যানেজ করে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নি¤œমানের পণ্য সরবরাহ করে। ফলে বঞ্চিত হয় অসহায় হতদরিদ্র মানুষ। এমন অভিযোগ দীর্ঘ দিনের।
অন্যদিকে শুকনা খাবার চাল, ডাল, লবণ, চিনি, চিঁড়া, সয়াবিন তেল, নুডুলসের জন্য পাঁচটি লটে দরপত্র আহ্বান করেন দুর্যোগব্যবস্থাপনা অধিদফতর। গত ১ জুন দরপত্র খোলা হয়। এতে দেখা যায়, মেসার্স সরদার ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল দু’টি লটে, মেসার্স সাম সিন্ডিকেট লিমিটেড দু’টি লটে এবং বাকি একটি লটে সফট টাচ নেটওয়ার্ক নামের একটি প্রতিষ্ঠান সর্বনি¤œ দরদাতা হয়।
এর মধ্যে ৬ নম্বর প্যাকেজে সর্বনি¤œ দরদাতা মেসার্স সরদার ট্রেড ইন্টারন্যাশনালকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় সর্বনি¤œ দরদাতা মেসার্স নওশী ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, ৮ নম্বর প্যাকেজে সর্বনি¤œ দরদাতা মেসার্স সরদার ট্রেড ইন্টারন্যাশনালকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় সর্বনি¤œ দরদাতা মেসার্স আলাল এগ্রোফুড প্রডাক্ট লিমিটেডকে কার্যাদেশ দেয়ার নির্দেশ দেয় মন্ত্রণালয়। সর্বনি¤œ দরদাতাকে কাজ না দেয়ায় রাষ্ট্রের প্রায় সোয়া কোটি টাকা গচ্ছা যাচ্ছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মেসার্স সরদার ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী আব্দুল কাদের বলেন, আমরা দুটি প্যাকেজে সর্বনি¤œ দরদাতা হয়েছি। আমরা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসার সাথে জড়িত। সম্প্র্রতি সংশ্লিষ্ট দফতরেই শুকনো খাবার সরবরাহ করেছি। শুকনো খাবারের ইজিপিতে দেয়া টেন্ডারের বর্ণনায় ডালের কথা থাকলেও পরবর্তীতে ব্রিফ অংশে দেশী ডালের কথা লেখা হয়েছে। একইভাবে বর্ণনায় নুডুলসের কথা থাকলেও পরবর্তীতে ইন্সট্যান্ট নুডুলসের কথা জুড়ে দেয় অধিদফতর; যা পিপিআর, ২০০৮ এর স্পষ্ট লঙ্ঘন। এ জন্য হয়ত আমাদের বাদ দেয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: মোহসিন নয়া দিগন্তকে বলেন, কোনো কারণে নন রেসপনসিভ হলে তো আমাদের কিছু করার থাকে না।


আরো সংবাদ