১৪ আগস্ট ২০২০

শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় হোলে আর্টিজানে নিহতদের স্মরণ

হোলে আর্টিজান বেকারীতে গতকাল যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন মিশনের কূটনৈতিকরা : নয়া দিগন্ত -
24tkt

গুলশানের হোলে আর্টিজানে উগ্রবাদীরা নৃশংস হামলা চালিয়ে তাদের জানান দিয়েছিল। ২০১৬ সালে ১ জুলাই ঘটে যাওয়া দেশের ইতিহাসে নারকীয় এ হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহ স্মৃতি আজো শরীরে কাঁপুনি ধরায়। সেদিন উগ্রবাদীদের নির্মমতার কাছে হার মানতে হয় ১৭ বিদেশীসহ ২০ জনকে। উগ্রবাদীদের ছোড়া বোমার আঘাতে নিহত হন দুই পুলিশ কর্মকর্তাও। ফলে হামলার দিনটি সবার কাছে কালো অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে। তাইতো প্রতি বছর হামলার দিনটি এলেই নির্মমভাবে নিহতদের শ্রদ্ধা জানাতে হলি আর্টিজানে ছুটে যান নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ। এ বছরও ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে শোক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় নিহতদের স্মরণ করা হয়েছে। তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে তাদের শ্রদ্ধা জানানো হয়। ফলে অন্যান্য বছরের মতো সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল না। প্রতি বছর সকাল থেকে নিহতদের স্বজনরা গুলশান-২ নম্বর সেকশনের ৭৯ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর হলি আর্টিজান বেকারিতে গিয়ে ভিড় করলেও এ বছর তাদের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়নি। তবে সকাল থেকে র্যাব, পুলিশ, ঢাকাস্থ জাপান, ইতালি ও মার্কিন রাষ্ট্রদূত পর্যায়ক্রমে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
সরজমিনে দেখা যায়, গতকাল সকাল থেকেই নিরাপত্তার কড়াকড়ি ছিল গুলশান-২ এর ওই এলাকাজুড়ে। ৭৯ নম্বর সড়কে হলি আর্টিজান বেকারিতে প্রবেশের আগে রাস্তার মোড়ে ব্যারিকেট দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রাখে পুলিশ। পোশাকি পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সেখানে দায়িত্বপালন করা একাধিক পুলিশ সদস্য জানান, এবার নির্ধারিত ব্যক্তিদের বাইরে কাউকে প্রবেশ করতে দেয়ার নির্দেশনা নেই। সাধারণের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ। তবে দুপুর ১২টা পর্যন্ত নিহতদের স্বজন বা সাধারণ মানুষ কাউকে শ্রদ্ধা জানাতে আসতে দেখা যায়নি।
সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হোলে আর্টিজান ভবনে সামনে তৈরি করা মঞ্চে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান র্যাব মহাপরিচালক (ডিজি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমি মনে করি, আমরা উগ্রবাদীদের তুলনায় এক ধাপ এগিয়ে আছি। কারণ উগ্র সংগঠনের সদস্যরা যখনই কোনো পরিকল্পনা করছে তখনই আমরা গোয়েন্দা তথ্য পেয়ে কাজ করছি এবং তাদের আটক করতে সক্ষম হচ্ছি। যার ফল বর্তমানে উগ্রবাদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে আমরা কিন্তু আত্মতুষ্টিতে ভুগছি না। উগ্রবাদ দমনের যে সফলতা অর্জন করেছি, সেই সফলতাকে ধরে রাখতে র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব ইউনিট কাজ করছে।
সকাল ১০টার দিকে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ডিএমপি কমিশনার মোহা: শফিকুল ইসলাম বলেন, হোলে আর্টিজান হামলার পর আমরা একের পর এক উগ্র আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়েছি। উগ্রদের সক্ষমতা যে পর্যায়ে ছিল সেটি এখন সর্বনি¤œ পর্যায়ে চলে এসেছে। ইমপ্রোভাইজড বোমা বানানোর মতো এক্সপার্ট এখন আর নাই। তারা কেউ জেলে আছে অথবা বিভিন্ন অভিযানে নিহত হয়েছে। তাদের ছোটখাটো সক্ষমতা থাকতে পারে। কিন্তু বড় ধরনের কোনো ঘটনা ঘটানোর সক্ষমতা নেই।
তিনি আরো বলেন, করোনাকালে স্বাভাবিকভাবে মানুষ বাসায় বেশি থাকে। তারা অনেকেই ধর্মীয় সাইটগুলোতে বেশি ভিজিট করছেন। এই সুযোগ নিয়ে উগ্ররা কিন্তু কন্টিনিউয়াসলি করোনার মধ্যেও ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে। লোন উলফ বা একাকী হামলার জন্য তারা উদ্বুদ্ধ করছে, বিশেষ করে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা করার জন্য। কী কী কায়দায় হামলা করতে হবে, একটি হাতুড়ি হলেও সেটি নিয়ে পুলিশের ওপর হামলা করা, এ ধরনের নানাবিধ প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত আমরা তাদের প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছি। তারা কাউকে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছে বা উগ্রবাদের কার্যক্রমকে পরিচালনার জন্য সংগঠিত হয়ে কোনো সংগঠন আবার গড়ে তুলতে পেরেছে সেরকম কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাত ৯টার দিকে রাজধানীর গুলশান-২-এর ৭৯ নম্বর সড়কের পাশে অবস্থিত হোলে আর্টিজান বেকারিতে উগ্রবাদীরা হামলা চালায়। তারা অস্ত্রের মুখে দেশী-বিদেশী অতিথিদের জিম্মি করে। পরে রাতেই ওখানে অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশের দুই কর্মকর্তা রবিউল করিম ও সালাউদ্দিন খান নিহত হন। এ ছাড়াও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ৩১ সদস্য ও র্যাব-১ এর তৎকালীন পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তুহিন মোহাম্মদ মাসুদসহ ৪১ জন আহত হন। পরদিন ২ জুলাই ভোরে সেনা কমান্ডোদের পরিচালিত ‘থান্ডারবোল্ট’ নামের অভিযানে পাঁচ উগ্রবাদীসহ ছয়জন নিহত হয়। এরপর পুলিশ সেখান থেকে ১৮ বিদেশীসহ ২০ জনের লাশ উদ্ধার করে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরো একজন রেস্তোরাঁকর্মী। আর কমান্ডো অভিযানের আগে ও পরে ৩২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। দেশের মানুষকে হতবাক করে দেয়া সেই হামলার তিন দিন পর গুলশান থানার এসআই রিপন কুমার দাস সন্ত্রাস দমন আইনে গুলশান থানায় মামলা করেন। এরপর ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের পরিদর্শক হুমায়ুন কবির দুই বছর তদন্ত করে ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই আদালতে এ মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এরপর আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ২১১ জন সাক্ষীর মধ্যে ১১৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ, আত্মপক্ষ সমর্থনে আসামিদের বক্তব্য উপস্থাপন এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে গত বছরের ২৭ নভেম্বর নজিরবিহীন এ জঙ্গি হামলায় নব্য জেএমবির ৭ সদস্যের ফাঁসির রায় দেয় ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল।


আরো সংবাদ