১১ জুলাই ২০২০

১৬ জনকে আসামি করে ভুক্তভোগী বাবার মামলা, তদন্ত করবে ডিবি

লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশীকে হত্যা; দুই মামলা সিআইডির
-

লিবিয়ায় মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন লিবিয়ায় নির্যাতনের শিকার রাকিবের বাবা মান্নান মুন্সী। তার গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে। গত বৃহস্পতিবার রাতে পল্টন থানায় মানবপাচার ও সন্ত্রাসবাদ দমন আইনে মামলাটি করেন তিনি। গত সাত মাস আগে দুই দফায় মোট সাত লাখ টাকায় দালালের মাধ্যমে লিবিয়ায় গিয়ে আটকা পড়ে রাকিব। এ মামলাটির তদন্ত করবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উত্তর বিভাগ। এছাড়া লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশীকে হত্যা ও আরো ১১ জন আহতের ঘটনায় মানবপাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আরো ২টি মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গত বৃহস্পতিবার রাতে ৩৬ জনের নাম উল্লেখ করে রাজধানীর পল্টন থানায় এবং ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে বনানী থানায় আরো একটি মামলা করা হয়। এর আগে মানবপাচার ও হত্যার অভিযোগে গত মঙ্গলবার রাতে ৩৮ জনকে আসামি করে রাজধানীর পল্টন থানায় আরো একটি মামলা করেন সিআইডির উপ-পরিদর্শক (এসআই) রাশেদ ফজল। ওই মামলায় ৩০-৩৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়।
পল্টন থানায় করা মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে ভুক্তভোগী রাকিবের বাবা মান্নান মুন্সি জানান, গত ৭-৮ মাস আগে পরিচিত মোহসিন ও মনির তার ছোট ছেলে রাকিবকে লিবিয়ায় পাঠানোর কথা বলেন। তারা প্রলোভন দেখায়, রাকিব লিবিয়াতে গেলে অনেক টাকা বেতন পাবে। রাজি হয়ে প্রথম দফায় কিছু জমিজমা বিক্রি করে সাড়ে তিন লাখ টাকা মোহসিনের হাতে দেন মান্নান মুন্সি। এরপর রাকিবকে লিবিয়ায় পাঠান তারা। কিন্তু সেখানে তাকে জিম্মি করে আবারও সাড়ে তিন লাখ টাকার জন্য নির্যাতন করা হয়।
মান্নান মুন্সী বলেন, আমি ক্ষেত-খামারে কাজ করি। ছেলেকে জিম্মি করে মারধর করা হচ্ছে জেনেও বাবা হয়ে কিভাবে সহ্য করি! পরে বাকি জমিজমা বিক্রি করে মোহসিনের হাতে আরো সাড়ে তিন লাখ টাকা দেই। এ সময় মনির লিবিয়ায়। কিন্তু মারধর বন্ধ হয়নি। সাত লাখ টাকা দেয়ার পরও ফোনে ছেলের কান্না শুনতে হইছে আমার। তিনি আরো বলেন, সম্প্রতি লিবিয়ায় সংগঠিত নৃশংস হত্যার ঘটনায় রাকিব বেঁচে গিয়ে ফোন করে জানায়, সে পালিয়েছে। এরপর থেকে আর তার সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি। যে বা যারা রাকিবকে জিম্মি করে মারধর করেছে এবং যারা ছেলেকে লিবিয়ায় পাচার করেছে তাদের শাস্তি দিতে আইনের আশ্রয় নিয়েছি। এ ব্যাপারে পল্টন থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো: সেন্টু মিয়া বলেন, গতকাল শুক্রবার সকালে মামলাটির কাগজপত্র ডিবি উত্তরে হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলাটি ডিবি তদন্ত করবে।
গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (উত্তর বিভাগ) ডিসি মশিউর রহমান বলেন, গত বৃহস্পতিবার রাতে ১৬ জনের বিরুদ্ধে পল্টন থানায় করা মানবপাচার ও সন্ত্রাসবাদ দমন আইনে মামলাটি ডিবি উত্তর তদন্ত করবে। বাদির ছেলে রাকিবসহ অন্যদের দালালচক্রের সদস্যরা কিভাবে লিবিয়ায় নিয়েছে এবং মামলার আসামিরা ছাড়াও আর কারা এর সঙ্গে জড়িত তা তদন্ত করে দেখা হবে।
এদিকে পল্টন মডেল থানার ওসি আবু বকর সিদ্দিকী জানান, লিবিয়া ট্র্যাজেডিতে বৃহস্পতিবার পল্টন থানায় মানবপাচার এবং আঘাতে খুনের অভিযোগে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিটের উপ-পরিদর্শক (এসআই) রফিকুল ইসলাম বাদি হয়ে একটি মামলা (নম্বর-৪) দায়ের করেন। পরে ওই দিন রাত ১২টা ৫ মিনিটে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ১৬ জনের বিরুদ্ধে পল্টন থানায় মানবপাচার এবং সন্ত্রাসবাদ দমন আইনে আরো একটি মামলা দায়ের করেন এক ভুক্তভোগীর বাবা মান্নান মুন্সি। মামলা দুটির মধ্যে মান্নান মুন্সির করা মামলাটি তদন্ত করবে ডিবি পুলিশ। বনানী থানার ওসি নূরে আযম মিয়া জানান, লিবিয়ায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে সিআইডির পক্ষ থেকে ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরো ৬০-৬৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে একটি মামলা করা হয়েছে।
সিআইডির ডিআইজি (অর্গানাইজড ক্রাইম) ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশী হত্যার ঘটনায় সারা দেশে মামলা হয়েছে ৯টি। ওইসব মামলায় এখন বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার হলেও বেশির ভাগ মানবপাচারকারী পলাতক রয়েছে। পল্টনে সিআইডির দায়ের করা মামলার পাশাপাশি অন্যান্য মামলাও সিআইডি ছায়া তদন্ত করছে। তদন্তে মানব পাচারকারী হিসেবে যাদের তথ্য-উপাত্ত ও নাম উঠে আসছে তাদের বিরুদ্ধে আমরা মামলার দ্রুত চার্জশিট আদালতে দাখিল করবো এবং তাদের বিরুদ্ধে আদালতের মাধ্যমে ওয়ারেন্ট জারির পর ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হবে।
তিনি বলেন, নিরীহ মানুষের জীবনের বিনিময় যে অর্থসম্পদ তারা করেছেন এই সম্পদ তারা ভোগ করতে পারবে না। তাদের বিরুদ্ধে আমরা মানিলন্ডারিং আইনে মামলা করবো। ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে কাজ শুরু করেছে সিআইডি। বড় বড় যত সঙ্ঘবদ্ধ মানবপাচারকারী রয়েছে ইতোমধ্যে তাদের নাম আমরা সংগ্রহ ও ইনকোয়ারি শুরু করেছি। দেশী কিংবা বিদেশী যত প্রভাবশালী মানবপাচারকারী হোক না কেন তাদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জানা গেছে, গত ২৮ মে লিবিয়ার সাহারা মরুভূমি অঞ্চলের মিজদা শহরে ২৬ বাংলাদেশীসহ ৩০ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এতে আহত হয় আরো ১১ জন। ওই ২৬ বাংলাদেশীসহ নিহতদের মিজদা শহরের একটি স্থানে টাকার জন্য জিম্মি করে রেখেছিল মানবপাচারকারী একটি চক্র। এ নিয়ে ওই চক্রটির সঙ্গে ওই বাংলাদেশীসহ লিবিয়া গমন প্রত্যাশী শ্রমিকদের সংঘর্ষ ঘটে। এরই একপর্যায়ে মানবপাচারকারী চক্রটি এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়।
এ খবর পাওয়ার পর থেকেই অভিযানে নামে র্যাব। এরপর গত সোমবার ভোরে রাজধানীর শাহজাদপুর এলাকা থেকে লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশীকে হত্যার ঘটনায় পাচারকারী চক্রের অন্যতম হোতা কামাল হোসেন ওরফে হাজী কামালকে (৫৫) গ্রেফতার করেছে র্যাব-৩। এ সময় তার কাছ থেকে ৩১টি পাসপোর্ট জব্দ করা হয়।
র্যাব জানায়, হাজী কামাল গত ১০ বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ উপায়ে কয়েকটি দেশের বিমানবন্দর ব্যবহার করে ইউরোপে লোক পাঠাতো। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বেশ কিছু দালালের মাধ্যমে এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে হাজী কামাল। গত ২৮ মে বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে লিবিয়ার মিজদা শহরে ২৬ বাংলাদেশীকে জিম্মিকারীরা গুলি চালিয়ে হত্যা করে তাদের অনেকেই এই কামালের মাধ্যমে লিবিয়ায় পাড়ি দিয়েছিল। এমন তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে র্যাব তাকে গ্রেফতার করেছে।
র্যাব জানায়, লিবিয়ায় হত্যাকাণ্ডের পর নিহত ও আহতদের পরিবারের অভিযোগ, সবাই হাজী কামালকে মুক্তিপণের টাকা দিয়েছে। তারপরেও কেউ তাদের সন্তানদের কেন ফেরত পাননি। হাজী কামালকে গ্রেফতারের সময় পাওয়া ডায়েরিতেও টাকা নেয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে র্যাব।
ওই দিন এক সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-৩ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রকিবুল হাসান বলেন, কামাল মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর ধরে এই অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত আছে বলে স্বীকার করে। এই সঙ্ঘবদ্ধ চক্রটি বিদেশী চক্রের যোগসাজশে অবৈধভাবে বাংলদেশী নাগরিকদের বিভিন্ন দেশে প্রেরণ করে আসছে।
র্যাব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাজী কামাল পাচারকারী চক্রের অন্যতম মূল হোতা। তিনি এ পর্যন্ত অবৈধভাবে প্রায় ৪০০ বাংলাদেশীকে লিবিয়ায় পাঠিয়েছেন। লিবিয়া ছাড়াও সে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবৈধ প্রক্রিয়ায় অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। এছাড়া কামাল একজন টাইলস্ কন্ট্রাক্টর। তাই অনেক টাইলস শ্রমিকের সাতে তার জানাশোনা আছে। এ সুযোগে তাদের মিথ্যা প্রলোভনে বিদেশে পাঠানোর জন্য প্রলুব্ধ করে যে, তোমরা তো দেশে বসে ৫০০-৭০০ টাকা আয় করো কিন্তু লিবিয়াতে গেলে তোমরা প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা আয় করতে পারবে। এছাড়া লিবিয়াতে টাইলস মিস্ত্রিদের অনেক চাহিদা। লিবিয়াতে যাওয়ার আগে এক লাখ টাকা দিতে হবে বাকি ৪ লাখ টাকা লিবিয়া যাওয়ার পর দিলেই হবে। এভাবেই ফাঁদে ফেলে শ্রমিকদের বিদেশে পাঠাতো হাজী কামাল। এরপর ওই শ্রমিকরা লিবিয়াতে পৌঁছানোর পর সেখানে অবস্থান করা অন্যান্য পাচারকারী দলের সদস্যরা ভিকটিমদের জিম্মি করে অতিরিক্ত টাকা দাবি, এমনকি শারীরিক নির্যাতন করে। সেই নির্যাতনের ভিডিও ভিকটিমদের পরিবারের কাছে পাঠিয়ে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করে। এমনকি সরাসরি মোবাইল ফোনে ভিডিও কলে সেই নির্যাতনের দৃশ্য ভিকটিমদের পরিবারকে দেখাতো। যাতে স্বজনকে বাঁচাতে ভিকটিমের পরিবারের সদস্যরা পাচারকারী দলের চাহিদা মতো টাকা দিতে বাধ্য হয়।
এছাড়া গত বুধবার গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থেকে সেন্টু শিকদার ও নার্গিস আক্তার নামে দুই মানবপাচারকারীকে গ্রেফতার করে র্যাব। লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশীকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৫ জনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব ও সিআইডি।


আরো সংবাদ