০৭ জুলাই ২০২০

চট্টগ্রাম বহির্নোঙরে সিরিয়ালবিহীন অবৈধ জাহাজ বন্ধের দাবি

-

বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিভোয়া), কোস্টার শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব) ও ওয়াটার ট্রান্সপোট সেল নেতারা চট্টগ্রাম বহির্নোঙরে বিদেশ থেকে আগত মাদার ভেসেলের পণ্য খালাসে সিরিয়ালের তোয়াক্কা না করে অবৈধভাবে চলাচলরত ওই সব পণ্যবাহী জাহাজ ও বাল্কহেড বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
গত বৃহস্পতিবার ঢাকার বিজয়নগরে বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিভোয়া) অফিসে এ দাবি জানানো হয়। এ সময় বক্তব্য রাখেনÑ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও শুভাঢ্যা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো: ইকবাল হোসেন। অ্যাসোসিয়েশনের সাধারন সম্পাদক নুরুল হক, সাংগঠনিক সম্পাদক জি এম ছারোয়ার, কোস্টার শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (কোয়াব) কো-কনভেনার নাজমুল হোসেন হামদু, বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সাহাদাত হোসেন, জাহাজ মালিক আকরাম হোসেন মাখনসহ কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ মালিক এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
নেতারা বলেন, ডব্লিউটিসির কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে নিতিমালা ভেঙে বহির্নোঙর থেকে কিছু পণ্যের এজেন্ট, লোকাল এজেন্ট ও কয়েকজন ফ্যাক্টরির মালিক অবৈধভাবে সিরিয়ালবিহীন জাহাজে পণ্য বহন করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, দেশের প্রায় দুই হাজারেরও বেশি বৈধ জাহাজ মালিক। তারা সিরিয়ালের অভাবে পণ্য পরিবহন করতে না পারায় ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এমনকি অনেকে লোকসান গুনতে গুনতে ক্লান্ত হয়ে জাহাজ বিক্রি করে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। যারা সম্মানের স্বার্থে বাপ-দাদার পেশা টিকিয়ে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করে এখনো টিকে আছেন, তাদের অবস্থাও নাজুক। সিরিয়ালের অভাবে জাহাজে নিরলস সময় কাটাচ্ছেন জাহাজ শ্রমিকরা। নিয়মিত পণ্য পরিবহন না করতে পারায় গত ঈদে বেতন-বোনাস কোনোটাই পাননি শ্রমিকরা। অন্য দিকে কিছু পণ্যের এজেন্ট, লোকাল এজেন্ট ও কয়েকজন ফ্যাক্টরির মালিক ডব্লিউটিসির অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে নিতিমালা ভেঙে সিরিয়ালবিহীন জাহাজ ও বাল্কহেড চালিয়ে এখন আঙুল ফুলে কলাগাছ। এই অবৈধভাবে জাহাজ চলাচল বন্ধে শিপিং ডিজি কমরেডর সৈয়দ আরিফুল ইসলামকে কয়েকদফা চিঠি ও তার সাথে মিটিং করেও কোনো লাভ হয়নি। তিনি বারবার অবৈধ জাহাজ চলাচল বন্ধের আশ্বাস দিলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। এ নিয়ে নৌ পরিবহন সংগঠনগুলো শ্রমিকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।
জাহাজ মালিক আকরাম হোসেন মাখন এ প্রতিবেদককে জানান, তিনি পনের কোটি টাকা ইনভেস্ট করে তিনটি জাহাজ বানিয়েছেন। জাহাজগুলো দুই মাস ধরে সিরিয়ালের অপেক্ষায়। গত দু’মাসে কোনো পণ্য পরিবহন না করতে পারায় গত ঈদে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস কোনোটাই দিতে পারেননি। তিনি এ জন্য সততা শিপিং, জাহাঙ্গীর, ব্যানার্জি বাবু, আনিস শাহসহ কয়েকজন পণ্যের এজেন্ট, লোকাল এজেন্ট ও ফ্যাক্টরির মালিককে দায়ী করেন। জুলহাস বেপারি অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েট অ্যান্ড শিপ বিল্ডার্স ইন্ডাস্ট্রির কর্ণধার জুলহাস বেপারি জানান, তিন মাস ধরে তিনি সিরিয়াল সমস্যায় আছেন এ ব্যাপারে তিনি বিসিভোয়া এবং ডব্লিউটিসির অফিসে বারবার ধরনা দিয়েও কোনো সমাধান পাননি। জাহাজ মালিক মহসিন জানান, চট্টগ্রাম বহির্নোঙরে বিদেশ থেকে আগত মাদার ভেসেলের পণ্য খালাসে সিরিয়ালের সমস্যা দীর্ঘ দিনের। তবে করোনাভাইরাসের কারণে দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর এই সমস্যা আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। তিনি জানান, তার পাঁচটি জাহাজ নিয়ে তিনি বিপাকে আছেন। কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছেন না। এ জন্য তিনি সিরিয়াল চুরি করে জাহাজ চালানো ব্যক্তিদের দায়ী করেন। অপর জাহাজ মালিক মো: আলমগীর হোসেন জানান, তার ছয়টি জাহাজ রয়েছে। গত দেড় মাসে কোনো জাহাজই পণ্য পরিবহন করতে পারেনি। ডব্লিউটিসি কোনো জাহাজ নিচ্ছে না। ডব্লিউটিসির অসাধু কর্মকর্তারা উৎকোচ নিয়ে পণ্যের এজেন্ট, লোকাল এজেন্টের মাধ্যমে জাহাজ নিচ্ছে। যে কারণে জাহাজগুলো কর্নফুলী নদীতে নোঙর করা অবস্থাতেই রয়েছে। তিনি বলেন, তার জাহাজের মত ৭০০ থেকে ৮০০ জাহাজ এ অবস্থায় পরে আছে। যতদূর চোখ যাবে শুধু জাহাজ আর জাহাজ। এমন অবস্থা চলতে থাকলে এই শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল থেকে সারা দেশে পণ্য পরিবহনের জন্য আছে সরকারি নিতিমালা। সেই নিতিমালার আলোকে জাহাজ চলাচল করার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। ডব্লিউটিসির প্রধান দায়িত্বে রয়েছেন ডিজি শিপিং কমোডোর সৈয়দ আরিফুল ইসলাম, আর সদস্য সচিব হচ্ছেন ডব্লিউটিসির চিফ ইঞ্জিনিয়ার মো: মঞ্জুরুল কবীর। তারা কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় বৈধ জাহাজ মালিকরা বিপদে আছেন। আমরা আমাদের শ্রমিকদের নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি।
এ ব্যাপারে পণ্যের এজন্টে বেলায়েত হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে মাদার ভেসেল থেকে খালাসের ব্যবস্থা নেয়া। কিন্তু দুই মাস ধরে করোনাভাইরাসের কারণে আমদানি কম হয়েছে। তাই যেসব ফ্যাক্টরির মালিকের জাহাজ আছে, তারা তাদের নিজস্ব জাহাজে পণ্য ডেলিভারি নিয়েছে। নিতিমালা অনুযায়ী সিরিয়াল মেনটেন বাধ্যতামূলক থাকলে তা মানা হয়নিÑ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ফ্যাক্টরির মালিকদের সাথে জাহাজ মালিকরা সমঝোতা করতে ব্যর্থ হওয়ায় তারা একচেটিয়াভাবে তাদের নিজস্ব জাহাজে পণ্য পরিবহন করছে।
এ ব্যাপারে লোকাল এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নর উত্তম সাহা পলাশের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, লোকাল এজেন্ট সব সময় জাহাজ মালিকদের প্রতিনিধিত্ব করে। মাদার ভেসেলের পণ্য খালাসে সিরিয়ালের নিতিমালা থাকার পরও ফ্যাক্টরির মালিকরা যদি এই নীতিমালা না মানে, তাহলে আমাদের কিছু করার থাকে না। তবে ডব্লিউটিসির চিফ ইঞ্জিনিয়ার মো: মঞ্জুরুল কবীর পণ্যের এজেন্ট, লোকাল এজেন্ট ও কয়েকজন ফ্যাক্টরির মালিক অবৈধভাবে সিরিয়ালবিহীন জাহাজে পণ্য পরিবহনের কথা স্বীকার করে বলেন, অবৈধভাবে সিরিয়ালবিহীন জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেইনিÑ সে কথা সঠিক নয়। এ ব্যাপারে একাধিকবার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তাদেরকে চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। আগামী ১৪ জুন তাদের তলব করা হয়েছে বিয়য়টি সুরাহার জন্য।
বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও ওয়াটার ট্রান্সপোট সেলের কো-অডিনেটর নুরুল হক বলেন, এ ব্যাপারে নৌ-পরিবহন অধিদফতরের ডিজি শিপিং কমোডোর সৈয়দ আরিফুল ইসলামের সাথে আমাদের মিটিং ও পত্র চালাচালি হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সবশেষ তিনি গত ৩১ মে নৌ অধিদফতরের সভাকক্ষে মিটিংয়ে আমাদেরকে আশস্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, বিআইডব্লিউটিসির যেসব কর্মকর্তা অনিয়মের সাথে জড়িত তাদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এবং অবৈধভাবে জাহাজ চলাচলরত জাহাজের সার্ভে ও রেজি: বাতিল করবেন। কিন্তু এখনো কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। নৌ পরিবহন অধিদফতরের ডিজি শিপিং কমোডোর সৈয়দ আরিফুল ইসলাম এ বক্তব্যের সত্যতা স্বীকার করে নৌ পরিবহন সেক্টরের সবগুলো সংগঠন ও জাহাজ মালিকদের সমন্বয় আলোচনাসাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা উল্লেখ করেন।


আরো সংবাদ