২৬ নভেম্বর ২০২০

আগের রুট চালু ছাড়াই নতুন দুই মেট্রোরেলের কাজ শুরুর পরিকল্পনা

দুই রুটে কিলোমিটারে ব্যয় ব্যবধান ৩১৩ কোটি টাকা
-

আগের প্রকল্পগুলো সম্পন্ন না করেই নতুন অর্থ বছরে সরকার ৬৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষ মেট্রোরেল এর রুট-২ ও ৪ এর বাস্তবায়ন কাজ শুরু করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এতে সবগুলো প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজেই ধীর গতি নেমে আসতে পারে। তাদের মতে, একেকটি রুট বাস্তবায়ন শেষ করে আরেকটি রুট বাস্তবায়নের কাজ হাতে নেয়া উচিৎ।
জনদুর্ভোগ ও যানজট নিরসনের মাধ্যমে যোগাযোগকে আরো দ্রুত করতে সরকার রাজধানী এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকাতে মেট্রোরেল কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে বিভিন্ন ধাপে। এখানে উড়াল ও পাতাল দু’টি রুটই রাখা হয়েছে। মেট্রোরেলের রুট বাস্তবায়নে একটির চেয়ে অন্যটির ব্যয় ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। রুট-২ এবং রুট-৪ এর বিস্তারিত নকশা, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে দু’টি প্রকল্পে আপাতত খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা। এ দু’টি রুটের মধ্যে কিলোমিটারে ব্যয় ব্যবধান ৩ শ’ কোটি টাকার বেশি। রুট-২ বাস্তবায়নে জাপান সরকারের সাথে চুক্তি হয়েছে। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এ দু’টি রুটের বাস্তবায়ন সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে বলে মেট্রোরেল সূত্রে জানা গেছে।
মেট্রোরেল সংস্থা বলছে, রাজধানী ঢাকা বিশে^র অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর। যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৪৪ হাজার এক শ’ জন মানুষ বসবাস করে। ঢাকা মহানগরী ও পাশের এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩ কোটি ট্রিপ তৈরি হয়। আর আগামী ২০২৫ সালে এ ট্রিপের পরিমাণ ৪ কোটি ২০ লাখ এবং ২০৩৫ সালে ৫ কোটি ২০ লাখে উন্নীত হবে। এ বিশাল পরিবহনচাহিদা মেটাতে সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনাতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি প্রকল্প গ্রহণের সুপারিশ থেকেই এ মেট্রোরেল ধারণা গ্রহণ করা হয়।
মেট্রোরেল চারটি লাইনের কার্যক্রম বর্তমানে চলমান আছে। আরো দু’টি রুট-২ ও রুট-৪ বাস্তবায়নে বিস্তারিত ডিজাইন, নির্মাণ, অপারেশন, সংরক্ষণের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা। যার মধ্যে ২৪ কিলোমিটার রুট-২ প্রকল্পে ব্যয় হবে ৩৫ হাজার ২ শ’ কোটি টাকা। আর ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ রুট-৪ প্রকল্পে খরচ হবে ২৮ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। দু’টি প্রকল্পই আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের অনুমোদিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দবিহীন অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় রাখা হয়েছে।
২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ রুট-২ হলো, গাবতলী, এমব্যাংকমেন্ট রোড, বসিলা, মোহাম্মদপুর বিআরটিসি বাসস্ট্যান্ড, সাতমসজিদ রোড, ঝিগাতলা, ধানমন্ডি ২ নম্বর রোড, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, নিউমার্কেট, নীলক্ষেত, আজিমপুর, পলাশী, শহীদ মিনার, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, পুলিশ হেডকোয়ার্টার, গোলাপশাহ মাজার, বঙ্গভবনের উত্তরপার্শ্বস্থ সড়ক, মতিঝিল, আরামবাগ, কমলাপুর, মুগদা, মান্ডা, ডেমরা হয়ে চট্টগ্রাম রোড পর্যন্ত। ২০৩০ সালের মধ্যে গাবতলী থেকে চট্টগ্রাম রোড পর্যন্ত উড়াল ও পাতাল সমন্বয়ে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল রুটটি সরকার টু সরকার (জিটুজি) ভিত্তিতে সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) বাস্তবায়ন করা হবে।
সরকারের এ লাইনটি নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জন্য জাপান ও বাংলাদেশ সরকার এক সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় জাপান ও বাাংলাদেশের অংশগ্রহণে ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রথম প্লাটফর্ম সভা অনুষ্ঠিত হয়। আর দ্বিতীয় প্লাটফর্ম সভা ২০১৮ সালের ৭ জুন এবং ২০১৯ সালের ২১ মার্চ তৃতীয় প্লাটফর্ম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জি টু জি ভিত্তিতে পিপিপিতে এমআরটি-২ বাস্তবায়ন প্রস্তাব অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য বেসিক স্টাডির কাজ শুরু হয়েছে। আগামী অর্থবছরের সূচনাতে প্রিলিমিনারি স্টাডির কাজ শুরু হবে। এ লাইন বাস্তবায়নে সার্বিকভাবে গড় ব্যয় হবে ১ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা।
১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ রুট-৪ হলোÑ কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত, যা আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সমাপ্ত করার জন্য পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। এখানে প্রতি কিলোমিটারে সার্বিকভাবে গড় ব্যয় হবে ১ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। এতে অর্থায়নের প্রক্রিয়া চলমান আছে। এ লাইনটি ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেল ট্র্যাকের পাশ দিয়ে যাবে।
সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ঢাকা মহানগরী ও তৎসংলগ্ন পার্শ্ববর্তী এলাকার যানজট নিরসন ও পরিবেশ উন্নয়নে আধুনিক গণপরিবহন হিসেবে মেট্রোরেলের পরিকল্পনা নিয়ে তা বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলছে। সরকার ছয়টি মেট্রোরেলে বা রুটের সমন্বয়ে ১২৮ দশমিক ৭৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ বিশিষ্ট একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কর্মপরিকল্পনা আগামী ২০৩০ সালে সম্পন্ন করতে চায়। এখানে ৬৭ দশমিক ৫৬৯ কিলোমিটার উড়াল এবং ৬১ দশমিক ১৭২ কিলোমিটার পাতাল লাইন হবে। ১০৪টি স্টেশনের মধ্যে উড়াল লাইনে থাকবে ৫১টি এবং পাতালে ৫৩টি ।
এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ও বর্তমানে পরামর্শক ড. জাহিদ হোসেনের সাথে আলাপকালে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, রাজধানীর যানজট নিরসনের জন্য অবশ্যই এসব উদ্যোগ ভালো ও প্রশংসনীয়। তবে চলমান লাইন-৬ এর কাজ শেষপর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পর পরবর্তী রুটগুলোর কাজ নেয়া উচিত। এর মধ্যেও আরো দু’টি লাইনের কাজ শুরু করা হয়েছে। তিনি বলেন, এ প্রকল্পগুলো অনেক বড়মাপের কমপ্লেক্স প্রকল্প। সব কাজ একসাথে হাতে নিলে পুরো প্রকল্পই ধীরগতিসম্পন্ন হয়ে পড়বে। এমনকি লেজেগোবরে হয়ে যাওয়ার এক ধরনের আশঙ্কাও থাকে। সেই সাথে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়টিও খেয়াল রাখতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ে বাস্তবায়ন শেষ করার একটা চ্যালেঞ্জও রয়েছে।


আরো সংবাদ