২৬ মে ২০২০

অর্থনৈতিক মন্দা ও মানবিক বিপর্যয়ের মুখে বিশ্ব

দুশ্চিন্তায় স্বল্প আয়ের দেশগুলো
-

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় মৃত্যুর সংখ্যা যেমন বাড়ছে তেমনি অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে উঠেছে ছোট বড় সব রাষ্ট্রই। বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে আক্রান্ত দেশগুলোর অর্থনৈতিক দুরবস্থা কাটাতে এবং জরুরি সাহায্য হিসেবে ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে আক্রান্তের সংখ্যায় বিচলিতবোধ করে বলেছেন, মৃত্যুর হার ২ লাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখতে পারলে এটি তার সবচেয়ে বড় সফলতা হিসেবে তিনি মনে করবেন। তিনি করোনা পরিস্থিতিতে আসন্ন বিপর্যয় সম্পর্কে উদ্বিগ্ন। পরিস্থিতি কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে তা কেউ বলতে পারছেন না। কোভিড-১৯ এর কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কারের বিষয়টিও এখনো অজানা রয়েছে। ওয়ার্ল্ডোমিটারের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী গতকাল বিশ্বের ১৭৮টি দেশে আক্রান্তের সংখ্যা ৮ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে নতুন সংক্রমিতের সংখ্যা ৫ লাখ ৯০ হাজার। মৃতের সংখ্যা প্রায় ৩৯ হাজার। প্রতি মুহূর্তে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। এই মুহূর্তে আমেরিকা, ইতালি, ফ্রান্স, ব্রিটেন, ইরান ও স্পেন সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এসব দেশে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের করোনা আক্রান্ত সব দেশই এখন কার্যত লকডাউনে চলে গেছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ। উন্নয়নশীল দেশগুলো অভ্যন্তরীণভাবে এ সঙ্কট দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি সামলাতে পারবে না বলে জানিয়েছে। তারা নতুন করে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকিও মোকাবেলা করতে পারবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ এই সঙ্কট মোকাবেলা করার সামর্থ্য নেই। ফলে তাদেরকে দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কটে পড়তে হতে পারে। কোভিড-১৯ এ যে হারে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে তা কয়েক লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আন্তর্জাতিক মহল হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। এই রোগে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যও মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। বিশ্বের আক্রান্ত দেশগুলোর বয়স্ক প্রবীণরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী হওয়ায় এই প্রাণঘাতী রোগ ভিন্ন ধরনের মানবিক সঙ্কট তৈরি করেছে। ইতালিতে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃতদের শতকরা ৮৫ ভাগই সত্তোরোর্ধ্ব। অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলায় ধনী দেশগুলো নিজস্ব তহবিল থেকে প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছে। তবে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানের মতো অপেক্ষাকৃত অনুন্নত দেশগুলো এই সঙ্কট কিভাবে মোকাবেলা করবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। দক্ষিণ-ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এখনো করোনা মহামারী আকারে ছড়িয়ে না পড়লেও উদ্বিগ্নতার ভাঁজ পড়েছে সবার কপালেই।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি শিগগিরই আমেরিকার সব কিছু আবার সচল করতে চান। তার মতে মৃতের সংখ্যা বাড়বে। গত মঙ্গলবার মধ্যরাতের পর আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নাগরিক সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছেন মি. ট্রাম্প। ২ লাখ কোটি ডলারের এ নাগরিক সহযোগিতায় ৭৫ হাজার ডলারের নিচে বার্ষিক আয়ের লোকজনকে ১ হাজার ২০০ ডলারের এককালীন চেক দেয়া হবে। চার মাসের জন্য বেকার ভাতা দেয়া হবে সব কর্মহীনদের জন্য। তিনি তার দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সাহায্য করবেন। বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও সাহায্য করা হবে।
ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী করোনাভাইরাসের মহামারী মোকাবেলায় ১ হাজার ৪৫০ কোটি ডলারের পুনরুদ্ধার প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিকে বাঁচাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য ৩৩ হাজার কোটি ডলারের প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। ব্রিটেন করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় হাসপাতালের ৭০ হাজার ওয়ার্ড প্রস্তুত রেখেছে। দেশটিতে বয়স্ক মানুষের গড় হার বেশি।
করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব প্রথম শুরু হয় চীনের উহানে। গত ডিসেম্বর মাস থেকে দেশটি মূলত এক ধরনের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে পড়ে। কিছুটা স্থিতিশীলতার মধ্যে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ৩৯ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের অবকাঠামোগত ব্যয়ের পরিকল্পনা নিয়েছে দেশটি। দেশটি করোনার ধাক্কা কিছুটা কাটিয়ে উঠলেও চীনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, তারা এখনো নিজেদেরকে পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত মনে করেন না।
বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারত আর্থিক অবস্থা পুনরুদ্ধারে ১ দশমিক ৭ লাখ কোটি রুপির আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এ আর্থিক সাহায্যের একটি বড় অংশ করোনায় লকডাউনের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ব্যবসায়ী সংস্থাগুলোর কাছে পাঠানো হবে। এ ছাড়া চিকিৎসা, স্বাস্থ্যসহ জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত মানুষের জন্য আগামী তিন মাস মাথাপিছু ৫০ লাখ রুপির বীমা ঘোষণা করা হয়েছে।
করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো বাঁচাতে ১ হাজার ৫০ কোটি ডলারের আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সুইজারল্যান্ড সরকার। ৭৩০ কোটি ডলারের পুনরুদ্ধার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে নিউজিল্যান্ড। ভোক্তার ব্যয় ও পর্যটন খাত রক্ষায় প্রাথমিকভাবে ইন্দোনেশিয়ার সরকার ৭২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের পুনরুদ্ধার প্যাকেজ ঘোষণা করে। পরে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে আরো ৮০ কোটি ডলারের আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। ২ হাজার ৭২০ কোটি ডলারের পুনরুদ্ধার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। থাই মন্ত্রিসভা ১ হাজার ৭৬০ কোটি ডলারের প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার আর্থিক প্যাকেজের আকার ৯৮০ কোটি ডলারের। মালয়েশিয়ার সরকার বরাদ্দ দিয়েছে ৬৬০ কোটি ডলারের। পাকিস্তানের ইমরান খানের সরকার ১ কোটি লোকের জন্য ১২ হাজার কোটি রুপির অর্থ সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত করোনা সঙ্কট মোকাবেলায় প্রস্তুতি জোরদারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম প্রধান খাত তৈরী পোশাক শিল্পে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে।
এ দিকে বিশ্বব্যাংক বলেছে, করোনা সঙ্কট মোকাবেলায় ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের একটি অর্থসহায়তা তহবিল তারা গঠন করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ ৫০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল বরাদ্দ রেখেছে যার মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলার পাবে স্বল্প আয়ের দেশগুলো। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক করোনা সঙ্কটে সহায়তায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য ৬৫০ কোটি মার্কিন ডলার বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছে। কোভিড-১৯ কবলিত ১৭৮টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ইতালি, আমেরিকা, চীন, স্পেন, ইরান, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের। এই দেশগুলোতে মৃতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সঙ্কট দীর্ঘায়িত হলে সেখানে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে।


আরো সংবাদ