০৬ জুন ২০২০
মানবেতর জীবন যাপন করছে অনেকেই

ঢাকা শহরের ৫ লাখ রিকশাচালক বেকার

-

অলিতে গলিতে কিছু রিকশার টুংটাং শব্দ শোনা গেলেও ঢাকা শহর এখন অনেকটাই ফাঁকা। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে চলমান সাধারণ ছুটির মধ্যে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ আর এখন ঘর থেকেই বের হচ্ছে না। এতে ঢাকা শহরের পাঁচ লাখেরও বেশি রিকশা চালক বেকার হয়ে পড়েছে। দিন যতই গড়াচ্ছে দিন আনে দিন খাওয়া এসব মানুষের মানবেতর জীবন যাপনের ঝুঁকি ততই বাড়ছে। এই পাঁচ লাখ মানুষের মাধ্যমে তাদের পরিবারের অনন্ত ২৫ লাখ মানুষের দু’মুঠো খাবার জুটত। সরকারি-বেসরকারি সাহায্য না পাওয়ায় এখন তারা অসহায় হয়ে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে ওই সমস্ত পরিবারে ভয়াবহ দুর্গতি নেমে আসবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নগরীতে রিকশার সংখ্যা কত এর কোনো সঠিক হিসাব নেই কারো কাছে। তবে রাজউকের মাস্টার প্লান অনুযায়ী ঢাকায় রিকশার সংখ্যা পাঁচ লাখ। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ও ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী নগরীতে রিকশার সংখ্যা পাঁচ লাখেরও বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা ও এর আশপাশে এক কোটি ৭০ লাখ বা তার কিছু বেশি মানুষের বসবাস। এক সমীক্ষার হিসাবে, ঢাকায় রিকশার যাত্রী ১৭ লাখ ৬০ হাজার। রিকশায় দৈনিক যাতায়াতের সংখ্যা দুই কোটি ৯৩ লাখ। মহানগরীর দুই হাজার ২৮৯ কিলোমিটার সড়ক আছে। রাজধানীর প্রধান সড়ক, বাইলেনসহ বিভিন্ন অলিতে গলিতে রিকশা চলাচল করে। যা থেকে একজন রিকশা চালক প্রতিদিন ৩০০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত রোজগার করে থাকে। যা দিয়ে তাদের পরিবারের যাবতীয় খরচ চলে।
গত ২৬ মার্চ থেকে দেশে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ছুটি ঘোষণার সাথে সাথে অনেক রিকশাচালক পরিবারপরিজন নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। অনেকেই রাজধানীতে রয়ে গেছে। যারা রাজধানীতে অবস্থান করছে তাদের কেউ কেউ শুধুমাত্র অলিতে গলিতে রিকশার চাকা ঘুরিয়ে কোনোমতে জীবন চালানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু আগের মতো রিকশায় এখন আর কেউ উঠতে আগ্রহী হচ্ছে না। তা ছাড়া রাজধানীর বেশির ভাগ মানুষ গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে। এতে তাদের রোজগার একেবারে কমে গেছে। এই মানুষগুলো আগে যেখানে দিন রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করত এখন তাদের ১০০ থেকে ১৫০ টাকাও রোজগার করতে সারা দিন চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকতে হয়। হিসাব মতে, রাজধানীতে পাঁচ লাখ রিকশাচালক থাকলে তাদের পরিবারে স্বামী-স্ত্রী ও এক সন্তান মিলে ১৫ লাখ লোক আছে। আর স্বামী-স্ত্রী, দুই সন্তান ও পিতা-মাতা যদি থাকে তাহলে এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৩০ লাখে। অনেকেই বলছে, ঢাকা শহরে রিকশা চালকের সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি। যদি এমন হয় তাহলে করোনাভাইরাসের মধ্যে ঢাকা শহরে রিকশা চালকদের বেকারের সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণ পর্যায়ে রয়েছে। ফলে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে তারা ঘরের মধ্যে আটকা থাকলে না খেয়ে কাটাতে হবে। এ ছাড়াও রাজধানীতে এক লাখ লোকেরও বেশি মানুষ ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। তাদের পরিবারের লোকজনের জীবনও বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এখনো পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি সাহায্য সহযোগিতা না পাওয়ায় তাদের অনেকেই মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
জাতীয় রিকশা-ভ্যান শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক মো: ইনসুর আলী জানান, শুধু ঢাকা শহরে রিকশা-ভ্যান চালিয়ে সংসার চালায় এমন সংখ্যা প্রায় ছয় লাখ। এরমধ্যে পাঁচ লাখেরও বেশি রিকশা চালক রয়েছে। ছুটির মধ্যে তাদের অনেকেই বাড়িতে চলে গেছে। ১০ শতাংশের মত রিকশা চালক রয়েছে যারা রাজধানীর অলিতে গলিতে রিকশা চালিয়ে জীবন চালানোর চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, দেশের এই পরিস্থিতিতে তারা কিভাবে সংসার চালাবে এ নিয়ে আমরাও শঙ্কিত। অনেকেই আছে তিন দিন পর্যন্ত চলতে পারবে। এর পর কিছুতেই চলবে না। এখনো পর্যন্ত সাহায্য সহযোগিতা না পাওয়ায় ইতোমধ্যে অনেকেই কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। তবে সরকারিভাবে ১০ টাকা কেজি চাল দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। রাজধানীর প্রতি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে তালিকা করা হচ্ছে। এ সহযোগিতা পেলেও তারা অনেকটা উপকৃত হবে।
গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টির সাধারণ সম্পাদক মো: জাকির হোসেন বলেন, এই দুর্যোগের মধ্যে শ্রমিক মেহনতি মানুষ কাজ করতে না পেরে পরিবারপরিজন নিয়ে অনেক কষ্টে জীবন যাপন করছে। বিত্তবানদের আহ্বান জানাব, তাদের পাশে এসে দাঁড়ানো। সরকারের প্রতি অনুরোধ, গরিব অসহায় খেটে খাওয়া মানুষের কাছে খুব শিগগিরই সাহায্য সহযোগিতা পৌঁছে দেয়া।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এই রাষ্ট্র হলো উচ্চবিত্তদের রাষ্ট্র, এই রাষ্ট্র হলো লুটেরাদের, এই রাষ্ট্র হলো সুবিধাভোগীদের। এই রাষ্ট্র থেকে সুবিধাভোগীরা সব সুবিধা ভোগ করছে, লুটেরাগোষ্ঠী সব কিছু লুট করে নিচ্ছে। আর খেটে খাওয়া মানুষ অতি কষ্টে দিন পার করছে। তিনি বলেন, এই দেশটা স্বাধীন করেছে সাধারণ মানুষ। এখন তাদের স্বার্থ দেখতে হবে। তারা যাতে অন্তত খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে সরকারের উচিত হবে সেই ব্যবস্থা করা।


আরো সংবাদ





justin tv