৩০ মার্চ ২০২০

৭৮৭ দিন পর দলীয় কার্যালয় ছাড়লেন রিজভী

-

২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ২৬ মার্চ। মধ্যখানে ৭৮৭ দিন। দেশের রাজনীতির এক ক্রান্তিকালে বাসা ছেড়ে দলের কেন্দ্রীয় কার্র্যালয়ে অবস্থান নেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রহর গুণে অবশেষে দীর্ঘ ৭৮৭ দিন পর দলীয় কার্যালয় ছেড়ে বাসায় উঠেছেন তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ২টা ৪২ মিনিটে দলীয় কার্যালয় ছাড়ার সময় রিজভী বলেন, এখন থেকে আর অফিসে সেভাবে রাতে অবস্থান করা হবে না। তবে দলীয় প্রয়োজনে যতটুকু সময় দরকার ততটুকু সময় কার্যালয়ে থাকবেন তিনি। ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি দেশের রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান নেন রিজভী। সে সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা ছিল খুবই প্রতিকূল। বিশেষ করে বিএনপির নেতাকর্মীরা ছিলেন ভয়ঙ্কর আতঙ্কে। ওই সময় দলের চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী সদ্য কারামুক্ত বেগম খালেদা জিয়ার মামলা বিচারাধীন থাকায় রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল উত্তেজনাপূর্ণ। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় রায়ের দিন ধার্য করেছিলেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫। সে দিন আদালত খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের সাজা দিলে ওই দিনই পুরান ঢাকার সাবেক পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে একমাত্র বন্দী হিসেবে খালেদা জিয়াকে রাখা হয়। তার আগে ও পরে বিএনপির নেতাকর্মীদের নামে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় বহু মামলা দায়ের হয়। ফলে দলটির নেতাকর্মীদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছিল। অবশ্য সেই বছরই ৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর হোটেল লা-মেরিডিয়ানে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির নেতাদের সাথে মতবিনিময় সভা করেন খালেদা জিয়া। এরপর একই বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি গুলশানে নিজ কার্যালয়ে সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন তিনি। এহেন পরিস্থিতিতে বেগম খালেদা জিয়ার রায়কে ঘিরে শঙ্কা তৈরি হয়। সেই আশঙ্কা হতেই রিজভী প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন যে, খালেদা জিয়ার মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তিনি দলীয় কার্যালয়েই অবস্থান করবেন।
সেই ব্রত থেকেই ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের তিনতলায় ছোট একটি রুমে (সাড়ে ৪ বাই সাড়ে ৯ ফুট) নির্জন কক্ষে রাত্রি যাপন করে আসছিলেন রিজভী। সেখানে দলীয় নেতাকর্মীরা তার সাথে নিয়মিত কুশলবিনিময় ও প্রয়োজনীয় কাজের জন্য যাতায়াত করতেন তিনি। সেখানে দলীয় কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা নেতাকর্মীদের বিভিন্ন সমস্যার কথা শুনেছেন তিনি। সার্বক্ষণিক লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও সংবাদপত্রে রাজনৈতিক ইস্যুতে বিভিন্ন প্রবন্ধও লিখেছেন। ওই সব প্রবন্ধের সঙ্কলনে ‘সময়ের স্বরলিপি’ গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন এই অফিসে থেকেই। যার প্রকাশনার অনুষ্ঠান হয় কার্যালয়ের নিচতলায় গত ৬ মার্চ। রিজভীর এই দীর্ঘ সময়ের অবস্থানকালে মাঝে মধ্যে তার সহধর্মিণী আনজুমান-আরা আইভি কার্যালয়ে এসে কিছু সময় স্বামীর দেখভাল করতেন। এই দীর্ঘ সময়ের অবস্থানকালে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যবৃন্দ, ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টারা, যুগ্ম মহাসচিবরা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদসহ অনেক পেশাজীবী নেতারা এসে রিজভীর ছোট কক্ষে গিয়ে তার খোঁজখবর নিয়েছেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকেই দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করে গণমাধ্যমে বক্তব্য রেখেছেন রিজভী। খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিচ্ছিন্নভাবে অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে রাজধানীতে বিভিন্ন সড়কে ছোট-বড় পরিসরে হলেও শতাধিক মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। মিছিল করতে গিয়ে একাধিকবার সরকারি দলের লোকজন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা নির্যাতিত ও দু’বার আহত হয়েছেন। তবুও হাল ছাড়েননি রিজভী। অবশেষে সরকারের নির্বাহী আদেশে গত ২৫ মার্চ (বুধবার) ছয় মাসের জন্য কারাগার থেকে মুক্তি পান বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এর পরই রিজভী সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি আর দলীয় কার্যালয়ে রাত্রিযাপন করবেন না। অতঃপর গতকাল ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের দিন নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয় ছেড়ে রাজধানীর ভাড়া বাসায় যান রিজভী। দীর্ঘ সময়কালে তার যেসব বইপত্র ছিল তা কয়েকটি বস্তায় ভরে নিজের ছোট গাড়িতে তুলে আদাবরের বাসায় নেয়া হয়েছে। অফিসকর্মী রফিকুল ইসলাম ও শামীম হোসেনও তাকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বিদায় জানান। রিজভী কার্যালয়ের প্রধান ফটকে নিরাপত্তা কর্মীসহ অফিস কর্মকর্তা-কর্মীদের সাথে কুশলবিনিময় করে বিদায় নেন। কার্যালয়ের কর্মকর্তা কমচারীরা রিজভীর জন্য বিশেষভাবে দোয়া ও শুভ কামনা করেন।
দলীয় কার্যালয় হতে চলে যাওয়ার সময় রিজভী নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম যে, অবৈধ সরকারের কারাগার থেকে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত দলীয় কার্যালয়েই থাকব। কষ্ট করে থেকেছি। এ সময়ের মধ্যে আমি দলের হয়ে বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত থেকেছি। দেশনেত্রী কারাগারে বন্দী থাকাবস্থায় আমি চেষ্টা করেছি নেতাকর্মীদের পাশে থাকতে। তারা দলীয় কার্যালয়ে এসে যেন বিমুখ হয়ে চলে না যান। তিনি বলেন, দীর্ঘ দিন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ছিলাম। আমার অনেকটা সময় কেটেছে। এখানে থাকাবস্থায় আতঙ্ক বিরাজ করত আমার মনে। তার পরও বুকে সাহস নিয়ে অবস্থান করেছি। যেতে খুব কষ্ট হচ্ছে। তবে দলীয় কার্যক্রমের প্রয়োজনে যাতায়াত থাকবেই। দেশনেত্রীর মুক্তিতে কিছুটা হলেও স্বস্তি লাগছে। আরো ভালো লাগত বিনা শর্তে মুক্তি দিলে।


আরো সংবাদ