০৫ এপ্রিল ২০২০

এপ্রিলের অপেক্ষায় বিনিয়োগকারীরা বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় কাটছে না

-

ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ব্যাংকে নতুন ঋণ নিতে গিয়েছিলেন মিজানুর রহমান (ছদ্ম নাম)। শাখা ব্যবস্থাপকের সাথে এ নিয়ে দীর্ঘ সময় তার আলোচনা হয়। তার কথা শুনে শাখা ব্যবস্থাপক তাকে একটি ‘সদুপদেশ’ দিয়েছেন। আর সেই ‘সদুপদেশ’ হলো, এখনই ঋণ না নিয়ে মাস খানেক তাকে অপেক্ষা করতে বলেছেন। এর কারণ জানতে চান মিজানুর রহমান। শাখা ব্যবস্থাপক উত্তরে জানিয়েছেন, ১ এপ্রিল থেকে ঋণের সুদহার এক অংকের ঘরে নেমে আসবে। তখন ঋণ নিলে বিনিয়োগ ব্যয়ও কমবে। এ কারণে তিনি নতুন করে আর ঋণ নিচ্ছেন না। অপেক্ষায় আছেন এপ্রিলের জন্য।
মিজানুর রহমানের মতো আরো অনেকেই গত মাস খানেক ধরে নতুন করে ঋণ নিচ্ছেন না। কেউ ব্যাংকারদের নিরুৎসাহে, আবার কেউ নিজেরাই নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করছেন। হঠাৎ নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হওয়ার কারণ সম্পর্কে ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, গত মাসে ঘোষণা আসে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে আমানতের সুদহার ৬ শতাংশ এবং ১ এপ্রিল থেকে ঋণের সুদহার এক অংকে অর্থাৎ ৯ শতাংশ কার্যকর হবে। এ কারণেই সুদহারে ছাড় পেতে বিনিয়োগকারীরা এপ্রিলের জন্য অপেক্ষা করছেন।
জানা গেছে, দীর্ঘ প্রায় তিন বছর ধরে ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে বিনিয়োগকারীদের নানা প্রলোভন দেয়া হচ্ছে। আর এ প্রলোভন দেখিয়ে ব্যাংক উদ্যোক্তারা সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে প্রায় এক ডজন সুবিধা নেন। পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবার থেকে দু’জনের পরিবর্তে চারজন রেখে ব্যাংকে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা, পরিচালকের মেয়াদ একাধারে দুই মেয়াদের পরিবর্তে তিন মেয়াদ অর্থাৎ ৯ বছর করা, ব্যাংকের মুনাফার ওপর করপোরেট কর আড়াই শতাংশ কমিয়ে নেয়া, আমানতকারীদের আমানত সুরক্ষা করতে আমানতের বিপরীতে বিধিবদ্ধ সংরক্ষণ সিআরআর এক শতাংশ কমিয়ে সাড়ে ৬ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশ করা, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার নিতে সুদহার কমিয়ে নেয়া (রেপোর হার), সরকারি আমানতের অর্ধেক ভাগ নেয়াসহ (২৫ শতাংশের পরিবর্তে ৫০ শতাংশ) প্রায় এক ডজন সুবিধা নেন ব্যাংক উদ্যোক্তারা। এক একটি সুবিধা নিতে প্রতিবারই উদ্যোক্তারা ঋণের সুদহার এক অংকে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী থেকে বর্তমান অর্থমন্ত্রী সব আমলেই সুবিধা নিতে প্রতিশ্রুতি দিতে ভুলেননি উদ্যোক্তারা। কিন্তু শুধু একটি কাজই তারা করেননি, আর তা হলোÑ নানা অজুহাত দেখিয়ে প্রতিশ্রুতি রাখেননি, অর্থাৎ ঋণের সুদহার এক অংকের ঘরে নামিয়ে আনেননি।
সর্বশেষ অর্থমন্ত্রী গঠিত কমিটির সুপারিশের আলোকে গত ২৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠক হয়। ওই বৈঠক শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে বৈঠকের ফলাফল জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো: সিরাজুল ইসলাম। তিনি জানান, উৎপাদনশীল শিল্প খাতের এক অংকের সুদহার আগামী ১ জানুয়ারি থেকেই কার্যকর করা হবে। জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এ বিষয়ে অনুমোদন দিয়েছে।
বৈঠক সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক নির্বাহী পরিচালক আবু ফারাহ মো: নাছের ওইদিন জানান, নতুন পুরাতন সবক্ষেত্রেই উৎপাদনীল শিল্প ঋণের সুদহার এক অংকে অর্থাৎ ৯ শতাংশ কার্যকর করা হবে। কিন্তু পয়লা জানুয়ারির পর পয়লা ফেব্রুয়ারিও পার হয়েছে। কিন্তু ঋণের সুদহার এক অংকের ঘরে নেমে আসেনি। তবে ঋণের সুদহার এক অংকের ঘরে নেমে না আসলেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে আমানতের সুদহার ঠিকই ৬ শতাংশ কার্যকর করেছে বেশিরভাগ ব্যাংক। আর ঋণের সুদহার ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর করার ঘোষণা দেয়া হয় উদ্যোক্তা ও ব্যাংকারদের পক্ষ থেকে।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, ব্যাংক ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিট অর্থাৎ ৯ অংক কার্যকর করতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যাবে ব্যাংকগুলো। বিভিন্ন মেয়াদে যাদের কাছ থেকে আমানত নেয়া হয়েছিল তাদের সুদহার কমানো যাবে না। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে নতুন পুরাতন মিলে উৎপাদনমুখী শিল্প ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে, এটাই বাস্তবতা। কিন্তু নতুন ঋণের ক্ষেত্রে যতটা সমস্যা দেখা না দেবে, তারচেয়ে বেশি সমস্যা দেখা দেবে পুরনো ঋণের সুদহার কমানোর ক্ষেত্রে।
এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, ৯ শতাংশে সুদে ঋণ দিতে গেলে ৪ শতাংশে সুদে আমানত সংরক্ষণ করতে হবে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি রয়েছে ৫ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ ৪ শতাংশে আমানত রেখে গ্রাহক কোনো মুনাফা পাবেন না বরং মূল্যস্ফীতির বিবেচনায় তার মূলধন হারাবেন। এ কারণে ব্যাংকে কেউ আমানত রাখবেন না। তিনি বলেন, এমনিতেই ব্যাংকে আমানত সঙ্কট, এর ওপর সুদহার কমে গেলে ব্যাংক আরো আমানত হারাবে। সুতরাং, এ সিদ্ধান্ত অতীতে যেমন বাস্তবায়ন হয়নি, সামনেও হবে না বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, ব্যাংকিং খাতে বড় সমস্যা হলো খেলাপি ঋণ। এটা কমে গেলে সুদহার আপনা আপনিই কমে যাবে। সুতরাং ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের ব্যবস্থাগ্রহণ করতে হবে।

 


আরো সংবাদ