১০ জুলাই ২০২০

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির নামে নজিরবিহীন দুর্নীতি

সরেজমিন রংপুর-১
-

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ১০ টাকা কেজির খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির নামে নজিরবিহীন দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে মাঠপর্যায়ে। খোদ স্পিকারের নির্বাচনী আসন রংপুরের পীরগঞ্জের শানেরহাট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সেই দুর্নীতির মডেল। এখানে এক ব্যক্তির আইডি কার্ড বিভিন্ন ব্যক্তির নামে ব্যবহার, ব্যক্তি না থাকলেও নাম ব্যবহার, মৃত ব্যক্তির নামে বরাদ্দ, ভুয়া আইডি কার্ড নম্বর ব্যবহার, কখনো এনআইডি কার্ড নম্বরের ডিজিট বেশি কখনো কম, এনআইডি কার্ড নম্বরবিহীন ব্যক্তি, সম্পদশালীদের বরাদ্দ, নাম একজনের এনআইডি কার্ড নম্বর অন্যজনের, একই ব্যক্তির নামে একাধিক কার্ডসহ অন্তত ১৯ ধরনের অনিয়মের সত্যতা মিলেছে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে। বিষয়টি নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে উপজেলা প্রশাসন। আর জেলা প্রশাসন বলছে, অনিয়মের ঘটনায় কেউ পার পাবে না।
২০১৬ সালে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় উপজেলার শানেরহাট ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডে ১০ টাকা দরে চাল বরাদ্দ দেয়া হয় এক হাজার ৩৫০ জনের নামে। এর আওতায় প্রতিটি উপকারভোগী বছরে পাঁচ দফায় ৩০ কেজি করে চাল পান; কিন্তু শানেরহাট ইউনিয়নের নৌকা প্রতীকে নির্বাচিত চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান মন্টু ১৯ ধরনের নজিরবিহীন অনিয়মের মাধ্যমে পুরো খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
গত তিন দিন অনুসন্ধান চালিয়ে পাওয়া গেছে ১০ টাকার চালের অনিয়মের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। অনিয়মে দেখা গেছে মৃত ব্যক্তির নামে বরাদ্দ দিয়ে সেই চাল তুলে পুরো টাকাটাই আত্মসাৎ করা হয়েছে। মৃত ব্যক্তির নামে বরাদ্দ দেয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছে ১ নং ওয়ার্ডের পার্বতীপুর গ্রামের রহিম মণ্ডল (কার্ড নং ১১৯০), শহিদুল (১০), সৈয়দ আলী (২৮), সামাদ (২১২), রহিম (১৯৮), দামোদারপুরের আনারুল (১১৭), ৩ নং ওয়ার্ডের ঘোষপুরের মহির (৩৩৩), ৪ নং ওয়ার্ডের মেস্টাগ্রামের রাশেদুল (৪৪৮), মিঠু (৩৫০), বারি মণ্ডল (৪০২), রওশন আরা (৪৭৬), গোলাপ (৪৬১), এন্তাজ (৪৮২), লাবলু (৪৫৪), ৫ নং ওয়ার্ডের রাউতপাড়ার রাজেকা (৪৯৩), ৬নং ওয়ার্ডের পবনপাড়ার হক মণ্ডল (৬৮২), পালানু সাহাপুরের সাত্তার মিয়া (১২৯৪) ও সপুর (৫৭৭), ৭ নং ওয়ার্ডের ধরলাকান্দির শিবধারী রাম (৮৫২), ৮ নং ওয়ার্ডের প্রথম ডাঙ্গা গ্রামের জোহরা (৯৭৩), মনছুর (৯৮৮), ছোট পাহাড়পুর গ্রামের ফুলমতি (৮৬৩), ৯নং ওয়ার্ডের বড়পাহাড়পুর গ্রামের ছাবাত (১০৮৮), মনোরঞ্জন (১১২৩), পাহাড়পুর গ্রামের সাহা (৯৪৮) ও সুখী চন্দ্র (১০৬১) অন্যতম। এ ২৬ মৃত ব্যক্তির নামে তিন বছর ধরে ১০ টাকার ১১ টন ৭০০ কেজি চাল বরাদ্দ নিয়ে তা আত্মসাৎ করা হয়। যার বাজারমূল্য (১০ টাকা দরে ক্রয় মূল্য বাদে) প্রায় এক লাখ ৭৫ হাজার ৫০০ টাকা। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর গত ১৯ সেপ্টেম্বর চেয়ারম্যান এসব মৃত ব্যক্তির নামের জায়গায় নতুন নাম প্রতিস্থাপন করেন।
এ ব্যাপারে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার আব্দুল মান্নান মণ্ডল জানান, মৃত ব্যক্তির নামের তালিকা আমার কাছে আসার পর আমি সেসব তালিকা ফেরত দিয়েছিলাম। সেই তালিকায় চাল দেইনি। কিন্তু পরবর্তীতে চেয়ারম্যান সুপারিশ করে আমাকে বাধ্য করেছে মৃত ব্যক্তির নামে চাল দিতে। সে কারণে আমি তিন বছর থেকে মৃত ব্যক্তির নামেও চাল দিতে বাধ্য হয়েছি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একই ব্যক্তির এনআইডি কার্ড বিভিন্ন গ্রামের বিভিন্ন ব্যক্তির নামে ব্যবহার করে এই চাল উত্তোলন করা হয়েছে। পাওয়া তথ্য মতে, ১নং ওয়ার্ডের দামোদারপুর গ্রামের আবুল কাশেমের স্ত্রী ফজিলার এনআইডি (নং ৮৫১৭৬৮৮৫৪০০১০) ব্যবহার করে ৬নং ওয়ার্ডের পালানুসাহাপুর গ্রামের চম্পা (কার্ড নং ৫৭২), লোকমান (৫৯৯), রায়তী সাদুল্যাপুর গ্রামের সুমি (৬৭১), ৫নং ওয়ার্ডের রাউৎপাড়া গ্রামের প্রাণেশ্বরীর (৫৩০) নামে চাল বরাদ্দ দিয়ে তা তোলা হয়েছে। একইভাবে ১নং ওয়ার্ডের দামোদারপুর গ্রামের তাজরুলের এনআইডি (নং ৮৫১৭৬৮৮৫৫৪০০১) ব্যবহার করে ৬নং ওয়ার্ডের রায়তী সাদুল্যাপুর গ্রামের বিজলী (৬২৪), ৩নং ওয়ার্ডের ঘোষপুর গ্রামের খারামোহন (৩০০), ৫নং ওয়ার্ডের দিগদারি গ্রামের মকিম খান (৩২২), ৪নং ওয়ার্ডের মেস্টা গ্রামের সাহেব (৪২১), ১নং ওয়ার্ডের দামোদারপুর গ্রামের আলম (৭২); ৬নং ওয়ার্ডের পবনপাড়া গ্রামের রবি মিয়ার স্ত্রী শম্পার এনআইডি (নং ৮৫১৭৬৮৮৫৫৫০০২) ব্যবহার করে ৬নং ওয়ার্ডের ধল্যাকান্দির নিরঞ্জন (৮০২), ৮নং ওয়ার্ডের ছোট পাহাড়পুর গ্রামের আমজাদ (৮৫৮) এবং ৩নং ওয়ার্ডের ঘোষপুরের দছিম উদ্দিনের ছেলে সৈয়দ আলীর এনআইডি (নং ৮৫১৭৬৮৮৫৪১৬২৬) ব্যবহার করে ১নং ওয়ার্ডের সৈয়দ আলী (২৮) ও দামোদারপুর গ্রামের সামাদ (৪৬) নামে বরাদ্দ দিয়ে চাল উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়েছে। এভাবে ১৩ ব্যক্তির নামে তিন বছর ধরে যে চাল তুলে আত্মসাৎ করা হয়েছে তার বাজার মূল্য (১০ টাকা দরে ক্রয়মূল্য বাদে) প্রায় ৮৭ হাজার ৭৫০ টাকা। এ ঘটনার সভ্যতা স্বীকার দামোদারপুর গ্রামের আবুল কাশেমের স্ত্রী ফজিলতা জানান, আমি কোনো দিন ইউনিয়ন পরিষদে আমার এনআইডি কার্ড ও ছবি জমা দেইনি। তারপরেও তালিকায় আমার এনআইডি কার্ড ব্যবহার করে চারজন তিন বছর ধরে ১০ টাকার চাল উত্তোলন করছেন। বিষয়টি অমার্জনীয় অপরাধ। আমার এনআইডি কার্ড দিয়ে কেন একাধিক মানুষ চাল পাবে। এ ব্যাপারে আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার দাবি করছি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে ইউনিয়নটির ১৭টি গ্রামেই ভুয়া নাম ও আইডি ব্যবহার করে চাল উত্তোলন করে তা আত্মসাৎ করা হয়েছে। অথচ ওই নামে ওই গ্রামে কোনো লোকই বসবাস করেন না। সরেজমিন দেখা গেছে ৮নং ওয়ার্ডের ছোট পাহাড়পুর গ্রামের ফুল মিয়া ( ৬১৯), কাশেম মিয়া (৮০১৩), আকমল (৮০৪), আনিছা (৮০৫), জরি বেগম (৮০৬), মালতী রানী (৮০৯), সাজু (৮১১), হেরেন (৮১২), আকলিমা (৮১৩), রমিও বালা (৮১৪), শাহীন (৮১৫), শাহের আলী (৮১৬), কুলসুমা (৮১৭), তাসমা (৮১৮), হাসনা (৮১৯), মিন্টু (৮২০), সেতারা (৮২১), মোখলেছার (৮২২), ছাকা (৮২৩), লুৎফর (৮২৪), শহিদুল (৮২৫), জুয়েল (৮২৬), মাহাবুল (৮২৭), দেলওয়ার (৮২৮), গিনিমাই (৮২৯), জোসনা (৮৩০), রাবেয়া (৮৩১) নিয়ে ২৭ জন ; ৫ নং ওয়ার্ডের রাউৎপাড়া গ্রামের কুলসুমা (৫২৪), তারাজুল (৫২৫), মমেনা (৫২৬), আব্দুল ওয়াদুদ (৫২৭), আনজুয়ারা (৫২৮, হালিমা (৫২৯), প্রাণেশ্বরী (৫৩০), শেফালী (৫৩১), অনিতা রানী (৫৩২), আসতারা (৫৩৩), শিপন (৫৩৬), সাজু (৫৩৭), দেবেন (৫৩৮), মিজানুর (৫৩৯), বিনয় (৫৪০), ইমরান (৫৪১), হামিদা (৫৪২), আইয়ুব(৫৪৩), রফিক(৫৪৪) নিয়ে ১৯ জন এবং ৩নং ওয়ার্ডের জয়নাল (৩২১), নুরমল হক (৩২৩), মকিম খান (৩২২), জোলেখা (৩২৪), মজিদুল (৩২৫), হাজির (৩২৬), হোসনে আরা (৩২৭), জাহানারা (৩২৮), মোসলেমা (৩২৯), সাবেরা (৩৩০), শামসুল (৩৩১), আশরাফুল (৩৩২), মহির (৩৩৩), আফসার (৩৩৪), মোশাররফ (৩৩৫), মোহাম্মদ আলী (৩৩৬), আশরাফুল (৩৩৭) এবং বাদল (৩৩৮) নামে ১৮ জন নিয়ে তিন গ্রামের ৬৪ জন লোকের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ওই তিন গ্রামে তাদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ ৬৪ জন না থাকলেও তাদের নামে চাল তোলা হয়েছে। তিন বছরের হিসাবে এই ৬৪ জনের নামে উত্তোলনকৃত চালের বর্তমান বাজার দর ( ১০ টাকা হারে ক্রয়মূল্য বাদে) ৪৩ লাখ কুড়ি হাজার টাকা।
এ ব্যাপারে ৩নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মো: কলিম উদ্দিন জানান, আমার দিগদাড়ি গ্রামে যে ১৮ জনের নাম দিয়ে চাল তোলা হচ্ছে ওই সব নাম ভুয়া। এই গ্রামে ওই নামে কোনো ব্যক্তি নেই। প্রধানমন্ত্রীর খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিকে বিতর্কিত করতেই ইউপি চেয়ারম্যান প্রতিটি গ্রামেই ভুয়া নাম দিয়ে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির তালিকা তৈরি করে তা আত্মসাৎ করছেন। এ বিষয়ে এখনই তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নিতে হবে।
অন্য দিকে ৫নং ওয়ার্ডের রাউৎপাড়া গ্রামের বাসিন্দা, শানেরহাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এবং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য মো: মেজবাহুর রহমান জানান, বর্তমান চেয়ারম্যান আমার রাউৎপাড়া গ্রামে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির যে তালিকায় চাল বরাদ্দ দিচ্ছেন, সেই তালিকার ১৮ জন ব্যক্তি আমার গ্রামের নন। ওই নামে আমার গ্রামে কিংবা ভোটার তালিকায় কোনো নাম নেই। সম্পূর্ণ ভুয়া নাম ব্যবহার করে এসব ব্যক্তির নামে চেয়ারম্যান সিন্ডিকেট চাল উত্তোলন করে আত্মসাৎ করছেন। বিষয়টি এলাকায় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

 


আরো সংবাদ