২২ মে ২০২২
`

চতুর্মুখী পরকীয়া : পুষ্পেন্দু হত্যায় মামলা করে নিজেই জেলে স্ত্রী অনুভা

নিহত পুষ্পেন্দু বিকাশ বাবু - ছবি : নয়া দিগন্ত

খুলনার পাইকগাছায় চতুর্মুখী পরকীয়ার জেরে পুষ্পেন্দু বিকাশ (বাবু) হত্যা মামলার বাদী নিহতের স্ত্রী অনুভা মণ্ডল নিজেই এখন কারাগারে। নিজের ছোটবোন স্মৃতিকণার সাথে নিজের স্বামী ও আরো দু’জনের প্রেমের চতুর্ভুজে হত্যার ষড়যন্ত্রে সৃষ্টি হয় এক গোলমেলে অবস্থা। মূল ঘটনা ফাঁস হওয়ায় এখন মামলা করেও ফেঁসে যাচ্ছেন নিহতের স্ত্রী অনুভা।

চলতি মাসের ১০ জানুয়ারি পাইকগাছার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলার ধার্য্য দিনে শুনানিতে বিজ্ঞ বিচারক বাদীকে জেল হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন।

ইতোমধ্যে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় অন্য আসামিদের সাথে অনুভার জড়িত থাকার অভিযোগে সিআইডি তার বিরুদ্ধে আদালতে সম্পূরক অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করলে তা গৃহীত হয়।

এর আগে থানা পুলিশের তদন্তসহ ডিবি পুলিশ তদন্তপূর্বক দোষীদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট প্রদান করেন। এ হত্যা মামলার আসামি পবিত্র মণ্ডল, সুজন রঞ্জন, এজাহার নামীয় একরামুল, শামিম ও নিহতের শ্বাশুড়ি নীলা জামিনে মুক্ত রয়েছেন ও অপর আসামি গৌর বাইন পালাতক রয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ সালের ২৯ নভেম্বর রাত আনুমানিক ৮টার দিকে পুষ্পেন্দু বিকাশ বাবু উপজেলার সুড়িখালী বাজার থেকে মোটরসাইকেলে করে নিজ বাড়ি বগুড়ারচকের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এক পর্যায়ে তিনি রহিম হাজীর ঘের সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছলে পিছন থেকে মোটরসাইকেলে এসে ভাড়াটিয়া খুনি কয়রার চান্নিরচকের শামিম গাজী (২৪), একরামুল গাজী (১৭), পাটনীখালীর সুজন রঞ্জন (৩০) পুষ্পেন্দুর মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে তাকে নির্মমভাবে খুন করে পালিয়ে যান।

তাকে হত্যার পর শামিম ও একরামুল মোটরসাইকেলে চান্নিরচকের দাইপাড়ায় পৌঁছলে মোটরসাইকেলের চেইন ছিঁড়ে য়ায়। এ সময় তারা গাড়ি রেখেই পালিয়ে যান তারা। পুলিশ পরের দিন গাড়িটি উদ্ধার করে।

এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী অনুভা মণ্ডল বাদী হয়ে শামিম, একরামুলসহ অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে পাইকগাছা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। খুনের একদিন পর স্থানীয়দের সহায়তায় কয়রার নারায়ণপুর বাজারের একটি সেলুন থেকে শামিমকে গ্রেফতার করেন ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন এসআই স্বপন কুমার রায়। শামিমের দেয়া তথ্যানুযায়ী অপর আসামি একরামুল গ্রেফতার হয়। এরা দু’জনই খুনের সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

তদন্তের এক পর্যায়ে আলোচিত মামলাটি ৩১-৮-১৭ সালে গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) হস্তান্তর করে আদালত। ডিবি’র ইন্সপেক্টর এসএম আলমগীর কবির তদন্তে প্রাপ্ত পলাতক আসামি কয়রার পাটনিখালী গ্রামের পবিত্র মণ্ডলকে (৩০) গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জবানবন্দি রেকর্ড করান। তদন্তের এক পর্যায়ে তিনি বদলি হয়ে গেলে ডিবি’র ৩য় তদন্তকারী পুলিশ পরিদর্শক গোপাল চন্দ্র রায় উক্ত মামলার তদন্তভার পান। পরে এক পর্যায়ে আলোচিত ওই হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটিত হয়।

যে কারণে খুন হন পুষ্পেন্দু

থানা পুলিশ, ডিবি ও সিআইডি’র পুলিশ পরিদর্শক খান গোলাম ছরোয়ারের দেয়া সম্পূরক অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে—

বিয়ের পর পুষ্পেন্দু বিকাশ বাবু ( ৪০) ও স্ত্রী অনুভা মণ্ডলের দাম্পত্য জীবন সুখের ছিল। তাদের সাংসারিক জীবনে ছেলে ত্রিদিপ ও কন্যা অর্নির জন্ম হয়।

এরই মধ্যে বাবু’র শ্যালিকা স্মৃতিকণা মণ্ডল ও পশ্চিম বাইনবাড়িয়ার গৌরপদ বাইনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। ঘটনা জানাজানির এক পর্যায়ে পুষ্পেন্দু ও গৌর বাইনের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও হাতাহাতি হলে শাশুড়ির অনুরোধে শ্যালিকা স্মৃতিকণাকে পুষ্পেন্দু নিজের বাড়িতে নিয়ে আসে। সেখানে কিছুদিন যেতে না যেতেই পুষ্পেন্দু ও শ্যালিকা স্মৃতিকণার মধ্যে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ ঘটনায় পুষ্পেন্দু ও স্ত্রী অনুভা’র দাম্পত্য জীবনে অশান্তি ও সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

এদিকে পুষ্পেন্দুর বন্ধু পাটনিখালীর পবিত্র মণ্ডল বগুড়ারচকে পুষ্পেন্দুর বাড়িতে আসলে শ্যালিকার সাথে পরিচয় হয়। পরিচয়ের এক পর্যায়ে পবিত্র ও স্মৃতিকণা দু’জনে নতুন করে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে।

স্মৃতিকণাকে ঘিরে চর্তুমুখী সম্পর্কের জেরে পুষ্পেন্দু-অনুভা দম্পতির সংসারে চরম সংকট দেখা দেয়। তিক্ততার এক পর্যায়ে পুষ্পেন্দুর শাশুড়ি নীলা, স্ত্রী অনুভা, শ্যালিকার পূর্ব প্রেমিক গৌরপদ ও পবিত্র মণ্ডল মিলে পুষ্পেন্দুকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

যেভাবে খুন করা হয়

খুনের ১ সপ্তাহ আগে পবিত্র’র চায়ের দোকানের পিছনে শামিম, একরামুল, গৌরপদ ও সুজন একত্রে বসে হত্যার পরিকল্পনা করেন। এ সময় পুস্পেন্দুকে খুন করার জন্য বন্ধু পবিত্র শামিম ও একরামুলকে ৫০ হাজার টাকার প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবে রাজি হয়ে ঘটনার দিন অর্থাৎ গত ২০১৬ সালের ২৯ নভেম্বর শামিম ও একরামুল সন্ধ্যার পুর্বে শুড়িখালী ব্রীজের কাছে পরিকল্পনা অনুযায়ী অবস্থান নেয়। এরপর বাবু একদিন শুড়িখালী বাজারের কাজ শেষে রাত ৮টার পর মোটরসাইকেল যোগে বাড়ি ফেরার সময় পথিমধ্যে পবিত্র মোবাইলে শামিম ও একরামুলকে জানিয়ে দিলে তারাও একটি মোটরসাইকেলে পুষ্পেন্দু বাবুর পিছু নেন।

বাবু পাতড়াবুনিয়া রহিম হাজীর ঘের সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছলে শামিম, একরামুল গংরা তার গতিরোধ করে ধারালো অস্ত্র ও হাতুড়ি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে মারাত্মক রক্তাক্ত জখম করে মৃত্যু নিশ্চিত জেনে পালিয়ে যায়। এরপর স্থানীয়রা তাৎক্ষণিক বাবুকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়ার সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে পুষ্পেন্দুর মৃত্যু হয়।

মামলার সর্বশেষ

এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের স্ত্রী অনুভা মণ্ডল বাদী হয়ে শামিম, একরামুলসহ অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেন। সর্বশেষ এ মামলার বাদী অনুভা মণ্ডল স্বামী হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে আদালতের নির্দেশে তাকে জেল-হাজতে পাঠান। এ সময় তার ছেলে ত্রিদিপকে কে বা কারা হুমকি দিচ্ছে মর্মে থানায় একটি জিডি হয়েছে।

এ ব্যাপারে পাইকগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো: জিয়াউর রহমান জানান, স্বামী হত্যায় জড়িত থাকায় স্ত্রী অনুভাকে আদালতের নির্দেশে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। অপরদিকে ছেলেকে হুমকির ঘটনায় জিডি’র বিষয়েও গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।


আরো সংবাদ


premium cement