২১ জানুয়ারি ২০২২, ০৭ মাঘ ১৪২৮, ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪৩
`

স্ত্রীকে ভালোবাসা

-

বিয়ে ভালোবাসার এক অটুট বন্ধনের নাম। ভালোবাসা ভালো লাগা দুটোই মানুষের মনের সাথে সম্পর্ক। তবে দুটোর ক্ষেত্রেই ইসলামী নির্দেশনার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। পবিত্র ভালোবাসা একমাত্র আল্লাহর পক্ষ হতে আসে।
আর অপবিত্র ভালোবাসা বা ভালো লাগা শয়তানের পক্ষ হতে আসে। বান্দাকে ক্ষতি করার জন্য। আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি জিনিস জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন। দিয়েছেন তাদের মধ্যে অগাধ ভালোবাসা আর ভালো লাগা। আমরা লক্ষ করলে দেখতে পারব কি সুন্দর লাগে যখন দু’টি পাখি গাছের একই ডালে বসে খুনসুটি করে। একে অপরের মাঝে ভালোবাসা ভাগ করে নেয়। একজন অপরজনকে ছাড়া বাঁচে না বা দূরে চলে যায় না। বাঘের খাঁচায় বাঘ থাকে না বাঘিনীকে ছাড়া। সিংহ থাকে না সিংহীকে ছাড়া। পশু-পাখি হতে শুরু করে সব প্রাণীকেই মহান আল্লাহ তায়ালা জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন। আর তাদের মাঝে অন্যতম হলো মানুষ।
যার শুরু হয়েছিল সর্বপ্রথম জান্নাতে হজরত আদম আ:-এর জন্য মা হাওয়া আ:-কে দিয়ে। তারই ধারাবাহিকতায় কিয়ামত পর্যন্ত এভাবেই চলবে পৃথিবী। একজন পুরুষ একজন নারী ছাড়া জীবনযাপন করতে পারে না। তদ্রুপ একজন নারী একজন পুরুষ ছাড়া জীবনযাপন করতে পারে না। তাই তো রাসূল সা: নারীকে পুরুষের অর্ধাঙ্গিনী বলেছেন। একজন সফল পুরুষ হতে হলে অবশ্যই একজন নারীর প্রয়োজন রয়েছে। নারী হলো মায়ের জাতি। তাই ইসলামে তাদের মর্যাদা অনেক উপরে। রাসূল সা: বলেন, কুরআনে কারিমের একটি আয়াত, যাতে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের মাঝে প্রীতি ও করুণা সৃষ্টি করেছেন।’ এই ভালোবাসা মূলত আল্লাহ তায়ালার দান।
ভালো স্বামী বা স্ত্রী যখন তাদের মধ্যে ভালোবাসা থাকে তখন একে অপরের জন্য দুনিয়াতেই জান্নাতস্বরূপ। আর যখন ভালোবাসার বদলে ঝগড়া আর হিংসা প্রতিহিংসা তাদের মনে সবটুকু জায়গা ঘিরে বসে তখন দুনিয়াটাই জাহান্নাম মনে হয়। যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা তীব্র হয়, একে অপরকে মন থেকে ভালোবাসে তখন তাদের সংসারটি হয়ে ওঠে সুখের দুর্গ। সংসার সুখী হয় ভালোবাসা দিয়ে। স্ত্রীকে ভালোবাসা প্রসঙ্গে হাদিসে হজরত রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে তারাই উত্তম যারা তাদের স্ত্রীদের জন্য উত্তম। আর আমি আমার স্ত্রীদের জন্য তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি। (তিরমিজি) হজরত আয়িশা রা: হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সা: আমার কোলে হেলান দিয়ে কুরআন তেলাওয়াত করতেন। (সহিহ বুখারি-২৯৭) তিনি আরো বলেন, আমি এবং রাসূল সা: একই সাথে একই পাত্র হতে গোসল করতাম। (সহিহ বুখারি-২৫০)
‘আয়িশা রা: বর্ণনা করেছেন রাসূল সা: যখন ইতিকাফ করতেন তখন আমার দিকে তাঁর মাথা ঝুঁকিয়ে দিতেন। আমি তা আঁচড়ে দিতাম। (সহিহ মুসলিম-৫৭১)। ‘আয়িশা রা: বর্ণনা করেছেন তিনি বলেন, আমি ঋতুবতী অবস্থায় পানি পান করতাম এবং পরে নবী সা:-কে অবশিষ্টটুকু দিলে আমি যেখানে মুখ লাগিয়ে পান করতাম তিনিও পাত্রের সে স্থানে মুখ লাগিয়ে পান করতেন। আবার আমি ঋতুবতী অবস্থায় হাড় খেয়ে তা নবী সা:-কে দিলে আমি যেখানে মুখ লাগিয়েছিলাম তিনি সেখানে মুখ লাগিয়ে খেতেন। (সহিহ মুসলিম-৫৭৯)। হজরত আয়িশা রা: বলেন, রাসূল সা: আমার মন খুশি রাখার জন্য আমার সাথে খেলায় দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন। (ইবনে মাজাহ : ১৯৭৯, আবু দাউদ : ২৫৭৮)। হজরত আয়িশা রা: বলেন, রাসূল সা: বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি আদর করে তার স্ত্রীর মুখে নিজ হাতে খাবার তুলে তাকে খাইয়ে দেয় তাহলে প্রতিটি লোকমার বিনিময়ে সে সদকার সওয়াব পাবে। (আবু দাউদ ২৮৬৪)
হজরত আয়িশা রা: বলেন, রাসূল সা: আমাকে আদর করে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নামে ডাকতেন। (বুখারি)। হজরত আয়িশা রা: বলেন, আমার মুখের খাবার রাসূল খেতেন। আমি গোশত খেয়ে হাড় রেখে দেয়ার পর রাসূল সে হাড়গুলো চুষে চুষে খেতেন। (মুসলিম : ৫৭৯)। হজরত আয়িশা রা: বলেন, রাসূল সা: কখনো তার স্ত্রীদের গায়ে হাত তুলতেন না। তাদের সাথে রাগারাগি করতেন না। (বুখারি : ৫২০৪, বুখারি : ৬১২৬)। হজরত আয়িশা রা: বলেন, রাসূল সা: আমাদের সব কাজকর্মে সহযোগিতা করতেন। (বুখারি : ৬৭৬)। স্ত্রীর ব্যবহার করা মেসওয়াক দিয়ে মেসওয়াক করা সুন্নাত। রাসূল সা: যখন মৃত্যু সজ্জায়, তখন রাসূল সা: আয়িশা রা:-এর কোলে শুয়ে ছিলেন এবং রাসূল সা: বারবার মেসওয়াকের দিকে তাকাচ্ছিলেন; কিন্তু রাসূল সা: এতটাই অসুস্থ ছিলেন যে মেসওয়াক চিবাতে পারবেন না, তাই আয়িশা রা: মেসওয়াক চিবিয়ে দেন এবং রাসূল সা: ওই মেসওয়াক দিয়ে মেসওয়াক করেন। হাদিসে এভাবে লালা একত্রিত হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। (বুখারি : ৫২২৬)
হজরত আয়িশা রা: বলেন, স্ত্রীর রাগ-অভিমান ভেঙে দেয়া সুন্নত। তিনি বলেন, রাসূল সা: আমাকে বলেন, হে আয়িশা তুমি আমার ওপর রেগে থাকলে আমি বুঝতে পারি। আয়িশা রা: বলেন, হে আল্লাহর রাসূল কিভাবে বোঝেন আপনি? রাসূল সা: বলেন, তুমি যখন আমার ওপর রেগে থাকো তখন বলো ‘হে ইবরাহিম আ:-এর প্রভু’ আল্লাহকে এভাবে ডাকো, আর যখন খোশ মেজাজে থাকো তখন বলো, ‘হে মুহাম্মদ সা:-এর প্রভু’ আল্লাহকে এভাবে ডাকো। (বুখারি : ৫২২৮)
রাসূল সা: বলেন, তোমরা কখনো স্ত্রীদের কষ্ট দিয়ো না। কারণ তারা নিজের পিতা-মাতা আর আত্মীয়স্বজনদের পরিত্যাগ করে তোমার কাছে চলে এসেছে। তাকে ভালোবাসতে শিখো, তার ভুলগুলোকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখতে শিখো। এক হাদিসে রাসূল সা: বলেন, আল্লাহ তায়ালা মেয়েদের একটু বক্র স্বভাবে তৈরি করেছেন, তাই তারা একটু উলটাপালটা করাটাই স্বাভাবিক। যারা তাদের স্ত্রীর এ বক্রতাকে মেনে নিয়ে ঝগড়া বিবাদের পরিবর্তে তাদের ভালোবাসতে পারবে তারাই প্রকৃত সুখী হতে পারবে।
আর প্রকৃত সুখ ভালোবাসার মাঝেই নিহিত রয়েছে, ঝগড়া বিবাদের মাঝে নয়। তাই আসুন আজ থেকে আমরা আমাদের স্ত্রীদের মুন খুলে ভালোবাসতে শিখি। বুকের মাঝে আগলে রাখতে শিখি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মিল-মোহাব্বত আর ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন। আমিন।
খতিব, মসজিদে বাইতুন নূর


আরো সংবাদ


premium cement