০৬ এপ্রিল ২০২০

মানুষের নিরাপত্তা

-

মহান আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত মানুষের সহজাত অধিকারকে বলা হয় মানবাধিকার। মানবাধিকার মূলত মানুষের নৈতিক অধিকারের সমষ্টি। বিংশ শতাব্দীর চলমান এ সময়ে বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো মানব অধিকার রক্ষায় নির্দিষ্ট কিছু নীতি প্রণয়ন করেছে। উল্লেখ্য যে, এসব নীতিই মানুষের অধিকার রক্ষার সহায়ক না হয়ে বরং তা মানব অধিকার হরণ করছে। আল্লাহ সুবহানা ওয়া তায়ালা প্রকৃতিবহির্ভূত সমস্যাদির সমাধান প্রত্যেক যুগে ও কালে প্রত্যেক জাতির কাছে সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেছেন।
মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় রাসূলে আকরাম সা: ‘দিবাকরের উজ্জ্বল কিরণময় একটি দিন। দুই বন্ধু মিলে খোলা আকাশের নিচে আড্ডারত, এমন সময় তাদের সামনে দিয়ে অতিক্রম করছিল একজন গর্ভবতী নারী। এই নারীটির গর্বের শিশুটি ছেলে না মেয়ে এ নিয়ে তাদের মধ্যে দেখা দিলো মতবিরোধ। ব্যাস, চাক্ষুস প্রমাণের জন্য তৎক্ষণাৎ তরতাজা নারী দেহটির পেট হায়েনার মতো চিরে ফেরে বাস্তবায়িত করল তাদের আকাক্সক্ষা।’ অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে হয়তো যে মানুষ এত নিচে নামতে পারে? তবে জেনে রাখা দরকার যে, যেই সন্তান পিতা-মাতার সবচেয়ে দামি ও আদরের, সেই নিষ্পাপ কন্যাসন্তানকে পর্যন্ত তারা জীবন্ত মাটি চাপা দিত, এমনকি অতিথি মেহমানের উট অন্যের জায়গায় ঢুকে পড়ার মতো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে প্রায় অর্ধশত বছর যুদ্ধ, নারীজাতি তথা মায়ের জাতিকে ভোগ-বিলাসের পণ্য মনে করা আর নিজেদের সর্ব প্রকার জঘন্য ও বীভৎস কাজকে জনসম্মুখে প্রচার করাকে বীরত্ব মনে করা জাহেলি যুগের অতি সাধারণ ব্যাপার হয়ে গিয়েছিল। এমনকি এগুলো না করা অসাধারণ বিষয় ছিল।
মানুষের নিরাপত্তা : ইসলামপূর্ব যুগে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি ছিল না বললেই চলে। অবস্থা এমন ছিল যে, জোর জার মুল্লুক তার। চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি ইত্যাদি ছিল তখনকার নিত্যনৈতিক ব্যাপার। অতি ক্ষুদ্র ও সামান্য ঘটনা নিয়ে হরহামেশাই লড়াই বেধে থাকত এবং মানুষদের পাইকারিভাবে হত্যা করা হতো। তাদের এই জঘন্য কাজকে রাসূল নিষিদ্ধ করে দেন এবং ঘোষণা করেন, সবচেয়ে জঘন্য ব্যাপার হলো আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা এবং মানুষে হত্যা করা।
এ ছাড়াও বর্ণিত আছে, যে বিনা কারণে একজন মানুষকে হত্যা করল (হোক সে বিধর্মী) সে যেন পুরো মানবজাতিকে হত্যা করল।
শাসক-প্রজাদের অবস্থা : প্রজারা ছিল শাসকদের জন্য শোষণের ক্ষেত্রস্বরূপ আর শাসকরা নিজেদের সব ক্ষমতার অধিকারী বলে মনে করত এবং যা ইচ্ছে তাই করত। তাদের আত্মতুষ্টির জন্য এহেন অপকর্ম নেই যা তারা করত না। নিজেদের ভোগবিলাসের জন্য জনগণের ওপর চালানো হতো নির্যাতনের স্টিমরোলার। অথচ নবী করীম সা: আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন যে, শাসক মানে প্রজাদের প্রভু নয় বরং তারা জনগণের খাদেম, তাদের কাজ রাজ্যে ভোগবিলাস, উচ্ছৃঙ্খলা ও অন্যায় কাজের বিস্তার নয় বরং এগুলো দূর করা, রাজ্যের সব ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, মানবাধিকার নিশ্চিত করা এবং সততা ও ন্যায়বিচার তথা ইনসাফের সাথে রাজ্য পরিচালনা করা। করের বোঝা হালকা করা। খুলাফায়ে রাশেদার সোনালি যুগ রাসূল সা:-এর আদর্শেই গড়ে উঠেছিল বলে তা এত সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠেছিল যে পূর্বের বা পরের সব দৃষ্টান্তকে হার মানায়। হজরত আবুবকর রা:, মুহাম্মদ বিন কাসেম, তারেক বিন যিয়াদ, গাজী সালাহুদ্দীন আইউবী, শাহজালাল র:-সহ এ রূপ মহৎ ব্যক্তিদের জীবন পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাবো যে, তরবারি আর গায়ের জোর নয় বরং প্রকৃতপক্ষে রাসূলের দেখানো মহিমান্বিত আদর্শই ইসলামকে সমগ্র পৃথিবীতে বিস্তার করতে সাহায্য করেছে।
শিশু অধিকার : জাহেলি যুগে কন্যাসন্তারদের জীবন্ত প্রথিত করার রেওয়াজ চালু ছিল। কেননা, ওই কন্যাসন্তান বড় হলে অসুস্থ সমাজ ব্যবস্থার কারণে তাকে বিভিন্ন বাধা-বিপত্তিতে পড়তে আর পিতা-মাতাকে অসম্মানিত এবং ধিক্কার ও জঘন্য সমালোচনার পাত্র হতে হয়। এসব কারণে বিশেষ করে সম্ভ্রান্ত লোকেরা তাদের জীবন্ত কন্যাশিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করত। এ ছাড়াও অনেক গরিব ও অসহায় লোকেরা তাদের সন্তানদের দারিদ্রের ভয়ে মেরে ফেলত। ইসলাম এসব কু রেওয়াজকে নিষিদ্ধ ও গর্হিত ঘোষণা করে।
অর্থনৈতিক অধিকার : জাহেলি সমাজে মানুষের নিরাপত্তাই যেখানে পাওয়া দুষ্কর সেখানে অর্থনৈতিক অধিকারের বিষয়টি যে কত আবহেলিত ছিল তা কল্পনাতীত। মানুষের ধন-সম্পদের ছিল না প্রকৃত নিরাপত্তা। সুদ-ঘোষ ইত্যাদি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিস্তৃত ছিল। অনেক সময় সুদের চরম কশাঘাতকে অনেকেই কাটিয়ে উঠতে পারত না। ফলে পাওনাদার জোর-জবরদস্তি করে তার সব কিছু আত্মসাৎ করত। ব্যবসায়ীদের ব্যঙ্গাত্মক নামে ডাকা হতো। ইসলাম সুদি কারবারকে হারাম করে দেয় এবং ব্যবসায়কে করেন হালাল।
নারী অধিকার : ইসলাম-পূর্ব যুগে নারীদের অবস্থান ছিল খুবই করুণ। তাদের কেবল ভোগ-বিলাসের পণ্যের মতো মনে করা হতো। দিন-দুপুরে অকারণে নারী নির্যাতন এমনকি হত্যাও করা হতো। তাদের সাথে অবৈধ সম্পর্ক ছিল তখন সাধারণ ঘটনা। নারীদের অকল্যাণের কারণ মনে করা ও কণ্যাসন্তান ও তাদের পিতা-মাতাদের সাথে অসদাচরণ করা তাদের অভ্যাস ছিল। বিয়ে প্রচলিত থাকলেও কখনো একজন মহিলার একাধিক স্বামী থাকত বিধায় সন্তান নির্ধারণ নিয়ে ঝগড়া ফাসাদ লেগেই থাকত। সম্পদের ভাগ হতে বিরত রাখা হতো নারীকে। অতঃপর রাসূল সা: নারীকে দিলেন মায়ের মর্যাদা, বিয়ের মাধ্যমে পবিত্র সম্পর্কের দ্বারা পারিবারিক বন্ধনকে দৃঢ় করলেন।
রাসূল সা:-এর নিকট এক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করেছিল, আমার সহচর্যের অধিক হকদার কে? তখন রাসূল সা: পরপর তিনবার তার জবাবে মায়ের কথা বলেছেন এবং চতুর্থবার বলেছেন বাবার কথা। এ ছাড়া বলেন, ‘মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত।’
এ ছাড়া কন্যাসন্তানকে উত্তমভাবে লালন-পালনকে জান্নাত পাওয়ার উসিলা বলেছেন।
সম্পদের ভাগ, দেনমোহর প্রাপ্তি, ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়ে দেয়া, জ্ঞান অর্জন করা, কাজ-কর্ম, স্বাধীনভাবে শালীনতা ও নিরাপত্তার সাথে জীবনযাপন করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারীকে তার প্রাপ্ত পূর্ণ অধিকার দিয়েছে ইসলাম।
দাস-দাসি বা কর্মচারীদের সাথে আচরণ : ইসলাম মানুষকে মানুষের বা মূর্তি, সূর্য প্রভৃতির পূজা করতে নিষেধ করে এবং সুমহান আল্লাহর ইবাদত করার আহ্বান করে। এই পৃথিবীতে কেউ কারো দাস নয়। সবাই এক আল্লাহর বান্দা। তবে কারো অধীনে যদি কেউ থাকে তবে তাকে তার অধিকারের দিকে লক্ষ রাখতে হবে। নিজে যা খাবে ও পরবে তাকেও তাই খাওয়াতে ও পরাতে হবে। অতিরিক্ত বোঝা দেয়া যাবে না বরং প্রয়োজনে তাকে সাহায্য করতে হবে। সর্বদা তার সাথে উত্তম আচরণ করতে হবে। এ ছাড়া হাদিসে কর্মচারীর ঘাম শুকানো আগে পাওনা পরিশোধ করার কথা বলা হয়েছে।
ব্যক্তিগত অধিকার : কারো ঘরে প্রবেশের পূর্বে অনুমতি চাওয়া। হুট করে কারো কক্ষে প্রবেশ না করা ইত্যাদি।
সামাজিক জীবন : রাসূল সা: ঘোষণা করেছিলেন, সব মুসলমান ভাই-ভাই। তিনি আত্মীয়স্বজনদের খোঁজখবর নেয়ার জন্য জোর তাগিদ দিয়েছেন। প্রতিবেশীর হক আদায় করার জন্য উৎসাহিত করেছেন।
রাসূল সা: নিজের শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত দীর্ঘ ৫৩ বছর ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে চেষ্টা করে করে দুর্গন্ধময় সমাজকে সর্বজনীন কল্যাণকর সমাজে পরিণত করেছিলেন।
সুতরাং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ চূড়া সাইয়েদুল মুরসালিন হজরত মুহাম্মদ সা:-এর অনুসরণ করা শুধু ধর্মীয় দায়িত্ব নয় বরং তা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার একমাত্র পরিপূর্ণ পথ। এ পথ বলে দিবে কিভাবে মানুষ আন্তরিক আগ্রহ ও আকর্ষণ নিয়ে নীতিসম্পন্ন কাজের দিকে ধাবিত হতে পারে এবং নিভৃতে নিজ অন্তরের উষ্ণতায় ও আত্মার মহিমায় সমাজে শান্তির নীড় প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
লেখক : নিবন্ধকার

 


আরো সংবাদ

সব আদালতে সাধারণ ছুটি বাড়ল ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত ‘গার্মেন্ট মালিকরা দেড় কোটি ঢাকাবাসীকে হুমকির মুখে ফেলেছে’ প্রণোদনা প্রদানের উদ্দেশ্য যেন দূর্নীতির কারণে ব্যাহত না হয় : জাসদ করোনাভাইরাসে মারা যাওয়া দুদক পরিচালকের দাফন সম্পন্ন দলীয়করণ-দুর্নীতির ঊর্ধ্বে উঠে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের আহবান জামায়াতের জাপানে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা টাঙ্গাইলে অর্ধশত নমুনার মধ্যে ২২ জনের ফলাফল নেগেটিভ `করোনা থেকে দেশকে রক্ষা করতে ১৪৪ ধারার বিকল্প নেই' মসজিদের মাইকে ঘরে নামাজ পড়ার আহবান পাংশায় করোনার লক্ষণে ১ জনের মৃত্যু, পুরোগ্রাম লকডাউন ইউপি সদস্যের বাড়ি থেকে আড়াই টন ত্রাণের চাল জব্দ

সকল