০৪ এপ্রিল ২০২০

ঈমান-আমলের পরিচয়

-

পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার ঈমান ও আমলের ওপর তাগিদ দেয়া হয়েছে। সেসবের মধ্যে সূরা আরাফের ৪২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেÑ ‘যারা ঈমান এনেছে এবং সৎ কাজ করেছে, আমি (তাদের) কারো ওপর তাদের সাধ্যের বাইরে দায়িত্বভার অর্পণ করি না। এ লোকেরাই হচ্ছে জান্নাতের অধিবাসী, তারা সেখানে চিরদিন থাকবে’। একই প্রসঙ্গে সূরা আসরে বলা হয়েছেÑ ‘সময়ের শপথ; মানুষ অবশ্যই ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত আছে, সেসব মানুষ বাদে যারা ঈমান এনেছে, নেক আমল করেছে; সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকেছে এবং ধৈর্য ধারণ করেছে।’ ইবাদ সম্পর্কে সূরা বাকারার ২১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেÑ ‘হে মানুষ, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো যিনি তোমাদের এবং তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তাদের সবাইকে সৃষ্টি করেছন; আশা করা যায় তোমরা সঙ্কট থেকে মুক্ত থাকতে পারবে’। পবিত্র কুরআনের উল্লিখিত আয়াতে ঈমান, আমল ও ইবাদতের ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশ লক্ষ করা যাচ্ছে।
ঈমান, আমল ও ইবাদত, এই তিনটি শব্দই আরবি শব্দ এবং কুরআনেরও শব্দ বটে। ‘বন্দেগি’ শব্দটি ফারসি ভাষার শব্দ যার অর্থ বান্দার আনুগত্য, দাস্যভাব বা গোলামের কাজ। আসলে বন্দেগি শব্দটি ইবাদত শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ যা ইবাদত তা-ই বন্দেগি। ভারত উপমহাদেশের মুসলিমদের মধ্যে ঈমান সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা লক্ষ করা যায়, কিন্তু আমল ও ইবাদতের সীমা-পরিসীমা ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে বিশদভাবে তারতম্য পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। আমল ও ইবাদতের ধারণা অবগত হওয়ার আগে ‘ঈমান’ কি সেটা উল্লেখ করা যেতে পারে। আগেই বলা হয়েছে ‘ঈমান’ শব্দটি আরবি। অর্থ বিশ্বাস বা বিশ্বাস স্থাপন করা। অর্থাৎ গায়েব বা অদৃশ্যের ওপর বিশ্বাস রাখা। ইসলামী পরিভাষায় আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সা:, কুরআন ও হাদিসের মাধ্যমে যেসব বিষয় অবতারণা করেছেন, সেসব বিষয়কে মুখে স্বীকার করে অন্তরে স্থাপন করার মধ্য দিয়ে কার্যে পরিণত করার নাম ‘ঈমান’। আর যখন কোনো একজন মানুষ ঈমানদার হয়ে ওঠেন, তখন তার জন্য আমল ও ইবাদত অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, ইসলামের বৈশিষ্ট্যগুলোকে ধারণ, লালন-পালন ও প্রচার করার নামই ‘ঈমান’। এখন একজন ঈমানদার ব্যক্তি নিজে ‘আমল’ ও ‘ইবাদত’ বলতে কী বুঝতে পারেন তা আলোচনা করা যেতে পারে। ‘আমল’ শব্দটি আরবি। আর আরবি শব্দের বৈশিষ্ট হলোÑ একটি শব্দের অসংখ্য প্রতিশব্দ ব্যহার হয়ে থাকে। সে জন্য ‘আমল’ শব্দের বাংলা প্রতি শব্দ করতে গিয়ে দেখা গেছে ‘আমল’ শব্দের অর্থ দাঁড়ায় ‘কাল’ বা সময়, যেমন জাহেলি আমল কিংবা আব্বাসীয় আমল। ‘আমল’ এর দ্বিতীয় অর্থ হলো ধনসম্পদ; যেমন সূরা নিসার ২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেÑ ‘এতিমের ধনসম্পদ তাদের কাছে দিয়ে দাও, ভালো জিনিসের সাথে খারাপ জিনিস বদল করিও না। এ আয়াতে ‘আমল’কে সম্পদ হিসেবে অর্থ করা হয়েছে। ‘আমল’ এর তৃতীয় অর্থ হলোÑ মূল্যায়ন বা গুরুত্ব দেয়া; যেমন বিষয়টাকে আপনি আমলেই নিলেন না? ‘আমল’ এর চতুর্থ অর্থ হলোÑ কাজ বা কর্তব্য। যেমন সূরা আসরে বলা হয়েছেÑ ‘যারা ঈমান এনেছে এবং সৎ কাজ করেছে। এখানে সূরা আসরে যে ‘আমল’-এর কথা বলা হয়েছে, এই আমলের অর্থ হলোÑ আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল সা: যা যা করতে বলেছেন, সেসব করা আর যা যা নিষেধ করেছেন, সেসব না করাকে বোঝানো হয়েছে। আর ইবাদত শব্দের অর্থ হলোÑ গোলামি বা দাসত্ব করা। অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা: যা করতে বলেছেন ও যা নিষেধ করেছেন, সেসব করা না করাকেই ইবাদত বোঝায়। আবার এভাবেও বলা যায়, ইবাদত হচ্ছে শরিয়তের পন্থায় নিজেকে ও নিজের পরিবার-পরিজনকে পরিচালিত করার নামই ইবাদত। নামাজ পড়া যেমন ইবাদত, তেমনি প্রতিবেশীর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়াও ইবাদত। হজ করা যেমন ইবাদত, তেমনি জুলুম, অত্যাচার ও বৈষম্যের বেড়াজাল থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করাও ইবাদত। জাকাত দেয়া যেমন ইবাদত, তেমনি দুর্বল মানুষকে আর্থিক ও মানবিক সাহায্য করাও ইবাদত। এসব ইবাদত একটি বাদে অন্যটি অসম্পন্ন। ইবাদত ও আমল শব্দ দুটি একে অন্যের পরিপূরক। দুঃখের সাথে লক্ষ করা যাচ্ছে, ‘ইবাদত’ ও ‘আমল’ বলতে এখন কিছু সংখ্যক মুসলমান বুঝতে চাইছেন, মসজিদে-মক্তবে নামাজান্তে বসে বসে তসবিহ পড়া, ওজুর আগে-পরে তসবি পড়া, রাসূল সা:-এর শিখিয়ে দেয়া পন্থায় নখ কাটা, গোঁফ ছাঁটা, দাড়ি রাখা, লম্বা জামা পরা, টুপি পরা, আতর মাখা, ডান কাতে শোয়া, শোয়ার আগে তাসবিহ পড়া, মেঝেতে বসে খানাপিনা করা, প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর বসে বসে হিসাব করে করে পরিমাণ মতো তাসবিহ পড়া, রাতের গভীরে বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া ইত্যাদিকে। এসবকে একমাত্র আমল হিসেবে গুরুত্ব দেয়ার চেষ্টা চলছে। মানুষ এ-ও ধারণা করা শুরু করেছে যে, ফজরের নামাজের পর এশার ফরজ নামাজের পর, সবে কদরের রাতে, গভীর রাতে তাহাজ্জুদ পড়ে এই এই ‘আমল’ করতে পারলে ইহকাল ও পরকালের সব বালা-মুসিবত ও অপ্রত্যাশিত সঙ্কট থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। অথচ শরিয়ত নির্দেশিত আমল সম্পর্কিত ছয়টি বিষয়কে বুঝতে পারলে আমল সম্পর্কে একটি ধারণা পূর্ণাঙ্গ লাভ করতে পারা যায়। যথাÑ ১.ইবাদত বা প্রার্থনা : যেমন সালাত, রোজা, হজ, জাকাত ইত্যাদি; ২. মুআমালাত বা লেনদেন : সততা, বিশ্বস্ততা, ওয়াদা রক্ষা করা, হারাম উপার্জন বন্ধ করা; ওজনে কম না দেয়া, অন্যের হককে সম্মান করা; আমানত নষ্ট না করা ইত্যাদি; ৩. মুআশারাত বা আচার-আচরণ : শিষ্টাচার, সম্প্রীতি ও কল্যাণমূলক কাজ করা; ৪. সিয়াসাত বা রাষ্ট্রনীতি : কুরআন-হাদিস নির্দেশিত রাষ্ট্রনীতি প্রবর্তনে কাজ করা; ৫. ইকতিসাদিয়াত বা অর্থনীতি : কুরআন-হাদিস মোতাবেক অর্থব্যবস্থার সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়া এবং ব্যবসাবাণিজ্য নীতি অনুসরণ করা; ৬. দাওয়াত ও জিহাদ : আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা ও শরিয়া পরিপন্থী সংস্কৃতি উৎখাত করতে প্রয়োজনে লড়াই সংগ্রাম করা। দুঃখের বিষয়, এসবকে রেখে ‘আমল’কে এখন তাসবিতে পরিণত করা হচ্ছে। প্রত্যেকটি মসজিদে ‘ফাজায়েলে আমল’ নামে একটি বই দেখা যায়। নামাজান্তে সে বই থেকে পাঠ করে বুঝতে চেষ্টা করা হয় যে, নফল এই ‘আমল’গুলোর ভেতর কী পরিমাণে উপকারিতা রয়েছে; অথচ যখন প্রত্যেক মুসলমানের জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে। সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা প্রচলিত হওয়া যে হারাম ফাজায়েলে আমল পাঠকারীরা এটিকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন। এ ব্যবস্থা থেকে উদ্ধার হওয়ার প্রচেষ্টাও যে একটা বড় আমল সেটা ফাজায়েলে আমল পাঠের আসরে গুরুত্ব পাচ্ছে না। মুসলিমদের উচিত হবে, অর্থব্যবস্থা থেকে সুদকে উৎখাত করা। সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় যেমন প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, তেমনি করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই এটিকে উৎখাত করতে হবে। সে জন্য দরকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। রাজনীতিতে সুদকে অ্যাজেন্ডা হিসেবে গ্রহণ করতে না পারলে এ হারামকে মুসলমানরা গলধঃকরণ করতে বাধ্য থাকবে সমস্ত জীবন।
তসবিতে যে উপকার নেই তা অস্বীকার করারও উপায় নেই। পবিত্র কুরআনের সূরা আহযাবে বলা রয়েছেÑ ‘হে ঐসব লোক, যারা ঈমান এনেছো বেশি বেশি করে আল্লাহর জিকির করো এবং সকাল-সন্ধ্যা তার তাসবিহ করতে থাকো’ (৪১-৪২ সূরা আহযাব)। তবে এই সব তাসবিহ নিয়ম করে পড়ার গুরুত্ব হাদিস দ্বারাও স্বীকৃত। এর গুরুত্ব বাড়ে সব প্রকার ফরজ আমল সম্পন্ন করার পর। মানুষ যখন নামাজ, রোজা ও হজের মতো ফরজ আমল করার পর অন্যান্য ফরজ আমল ব্যতিরেকে তাসবিহ পড়া আমলের গুরুত্ব নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে থাকবে তখন সমাজ থেকে অনাচার-ব্যভিচার, অবিচার, চুরি-ডাকাতি, জুলুম, অত্যাচার, দখলদারিত্ব, লুটপাট, খুন-যখমসহ নানাবিধ অপকর্ম মুসলিম সমাজ থেকে বিতাড়িত হওয়ার পরিবর্তে তা সমাজের বুকে আরো জেঁকে বসতে চাইবে। এরকম হতে দেয়া মুসলমানদের ঈমান পরিপন্থী। সমাজকে পরিচ্ছন্ন করে রাখার নিমিত্তে মুসলিমদের যে তৎপরতা দেখা যাবে সেটাও একটা বড় ‘আমল’। এই আমাল অতি গুরুত্বপূর্ণ। সে জন্যই আল্লাহ সূরা আল ইমরান ১০৪ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেছেনÑ ‘তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল থাকা উচিত যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে সত্য ও ন্যায়ের আদেশ করবে; অন্যায় আর অসত্য থেকে বিরত রাখবে; সত্যিকার অর্থে এরাই হচ্ছে সাফল্যমণ্ডিত’। এ প্রসঙ্গে সূরা নিসায় বলা হয়েছে ‘তোমাদের কি হলো যে, তোমরা ওই সব অসহায় পুরুষ, নারী ও শিশুর খাতিরে লড়াই করছ না, যাদেরকে দাবিয়ে রাখা হয়েছে এবং যারা ফরিয়াদ করছে যে, হে আমাদের রব! আমাদেরকে জালিমদের এ বস্তি থেকে উদ্ধার করো, আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য কোনো অভিভাবক ও সাহায্যকারীর ব্যবস্থা করো’ (সূরা নিসা, আয়াত-৭৫)। এসব আয়াতের আহ্বান সকাল-সন্ধ্যা শুধু তাসবিহ পড়া আমল দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়; যা বিগত বছরগুলোতেও সম্ভব হয়নি। হয়নি বলেই শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সের নারীকেই ধর্ষণের শিকার হতে হচ্ছে। প্রায় বিনা কারণে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। নানাবিধ অজুহাতে অসহায় মানুষ জুলুম-নির্যাতন, অন্যায়-অত্যাচার-অবিচারে অতিষ্ঠ হয়ে কোনো রকমে বেঁচে রয়েছেন। দেশ হারা, সহায়সম্বল হারা, বাস্তু ভিটেমাটি হারা হয়ে বহু মানুষ পৃথিবীর অনেক দেশে শরণার্থী হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এ মানুষদের জন্যই সূরা নিসার এই আয়াতের আহ্বান ‘তোমাদের কি হলো যে, তোমরা ওই সব অসহায় পুরুষ, নারী ও শিশুর খাতিরে লড়াই করছ না, যাদেরকে দাবিয়ে রাখা হয়েছে এবং যারা ফরিয়াদ করছে যে, হে আমাদের রব! আমাদেরকে জালিমদের এ বস্তি থেকে উদ্ধার করো, আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য কোনো অভিভাবক ও সাহায্যকারীর ব্যবস্থা করো’। এই আহ্বান তাসবিহ নামক আমলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহর রাসূল সা: হেরা পর্বতের পাদদেশে বসে মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং কোন পন্থার সাহায্যে মানুষে মানুষে শান্তি নিশ্চিত করা যায় সে পন্থার বাস্তবায়নকেই তিনি বড় আমল হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
গড়লধভভধৎয৪০@মসধরষ.পড়স

 


আরো সংবাদ

আত্মহত্যার আগে মায়ের কাছে স্কুলছাত্রীর আবেগঘন চিঠি (১৩৫৩০)সিসিকের খাদ্য ফান্ডে খালেদা জিয়ার অনুদান (১২৬০৬)করোনা নিয়ে উদ্বিগ্ন খালেদা জিয়া, শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল (৯৩১৫)ভারতে তাবলিগিদের 'মানবতার শত্রু ' অভিহিত করে জাতীয় নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ (৮৪৯০)করোনায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল ইতালির একটি পরিবার (৭৮৬৪)করোনার মধ্যেও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আরেক যুদ্ধ (৭১৪০)করোনায় আটকে গেছে সাড়ে চার লাখ শিক্ষকের বেতন (৬৯৩১)ইসরাইলে গোঁড়া ইহুদির শহরে সবচেয়ে বেশি করোনার সংক্রমণ (৬৮৯০)ঢাকায় টিভি সাংবাদিক আক্রান্ত, একই চ্যানেলের ৪৭ জন কোয়ারান্টাইনে (৬৭৬১)করোনাভাইরাস ভয় : ইতালিতে প্রেমিকাকে হত্যা করল প্রেমিক (৬২৯৬)