২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

খিলাফত ও খুলাফায়ে রাশেদিন

-

‘খিলাফত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রতিনিধিত্ব করা, অন্য কারো স্থানে স্থলাভিষিক্ত হওয়া। আর ‘খলিফা’ শব্দের অর্থ প্রতিনিধি, স্থলাভিষিক্ত। ‘খলিফা’ শব্দের বহুবচন ‘খুলাফা’ এবং ‘খালাইফ’। ইসলামে ‘খিলাফত’ এমন একটি শাসনব্যবস্থার নাম যা মহান আল্লাহর বিধান ও মহানবী সা:-এর সুন্নাহ দ্বারা পরিচালিত। এই শাসনব্যবস্থায় সার্বভৌমত্বের অধিকারী একমাত্র মহান আল্লাহ। তিনিই বিশ্বজগতের স্রষ্টা এবং সর্বোচ্চ শাসক। মানুষের মর্যাদা হলো, সে সর্বোচ্চ শাসকের প্রতিনিধি বা খলিফা এবং তার রাজনৈতিক ব্যবস্থা হবে সর্বোচ্চ শাসকের বিধানের অধীন। খলিফার কাজ হলো, সর্বোচ্চ শাসক আল্লাহর আইনকে তাঁর প্রকৃত লক্ষ্য অনুযায়ী কার্যকর করা এবং তাঁর নির্দেশিত পথে রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা।
খিলাফত সম্পর্কে খুলাফায়ে রাশেদিন এবং রাসূলুল্লাহ সা:-এর সাহাবিদের সর্বসম্মত অভিমত ছিল, খিলাফত একটি নির্বাচনভিত্তিক পদমর্যাদা। মুসলমানদের পারস্পরিক পরামর্শ এবং তাঁদের স্বাধীন মতামত প্রকাশের মাধ্যমেই তা কায়েম করতে হবে। বংশানুক্রমিকভাবে বা বল প্রয়োগের দ্বারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া কিংবা নেতৃত্ব দেয়া তাদের মতে খিলাফত নয়, বরং তা রাজতন্ত্র। খিলাফত ও রাজতন্ত্রের যে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ধারণা সাহাবিরা পোষণ করতেন, হজরত আবু মূসা আল-আশ‘আরি রা: তা ব্যক্ত করেছেন এভাবে ‘খিলাফত হচ্ছে তাই, যা প্রতিষ্ঠা করতে পরামর্শ নেয়া হয়েছে। আর তরবারির জোরে যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা হচ্ছে বাদশাহী বা রাজতন্ত্র।’
ইসলামের এই খিলাফত ব্যবস্থা সর্বজনীন। আল্লাহর এই প্রতিনিধিত্বের অধিকার বিশেষ কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা বিশেষ কোনো শ্রেণীর জন্য নির্দিষ্ট বা সংরক্ষিত নয়। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাসী এবং তাঁদের বিধান ও আইন মান্যকারী সব মানুষই আল্লাহর দেয়া এই প্রতিনিধিত্বের সমান অধিকারী। এ প্রসঙ্গে কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার ও সৎকর্মশীল আল্লাহ তাঁদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তিনি অবশ্যই তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন।’ (সূরা আন নূর : ৫৫)। ইসলামে নবুওয়াতের পদমর্যাদার পর এই খিলাফত ব্যবস্থাই সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন এবং এ পদটি পবিত্র দায়িত্বপূর্ণ পদ। বস্তুত ইসলামে খিলাফতের দায়িত্ব ও কর্তব্য অত্যন্ত ব্যাপক ও সর্বাত্মক। যাবতীয় বৈষয়িক, ধর্মীয় ও তমদ্দুনিক উদ্দেশ্যের পূর্ণতা বিধান এরই ভিত্তিতে হয়ে থাকে। রাসূলের কার্যাবলিকে চালু ও প্রতিষ্ঠিত রাখা এবং যেকোনো প্রকার মিশ্রণ বা ভেজাল থেকে তা সংরক্ষণ ও উৎকর্ষ সাধন করা খিলাফতের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
কুরআন ও হাদিস হতে খলিফার যোগ্যতা ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যা কিছু জানা যায়, সে আলোকে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ‘খুলাফায়ে রাশেদিনই ছিলেন মুসলিম জাহানের খলিফা হওয়ার সর্বাধিক উপযুক্ত। কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত গুণ ও বৈশিষ্ট্য তাঁদের মধ্যে পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান ছিল।

খুলাফায়ে রাশেদিনের মর্যাদা
মহান আল্লাহ মানব জাতির হেদায়াতের লক্ষ্যে পৃথিবীতে যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। মহানবী মুহাম্মদ সা: তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। তিনি তাঁর আনীত আদর্শ দ্বারা জগতের শ্রেষ্ঠ একদল মানুষ বিশ্ববাসীকে উপহার দিতে পেরেছিলেন। ‘খুলাফায়ে রাশেদিন’ অর্থাৎ চারজন সাহাবি তাঁদের অন্যতম। মহানবী সা:-এর পর এই চারজন সাহাবির বিশেষ মর্যাদা সংরক্ষিত। তাঁদের সুমহান মর্যাদা সম্পর্কে কিছু পবিত্র বাণী উদ্ধৃত করা হলো।
* আবদুল্লাহ ইবন ‘উমর রা: বলেন, রাসূলুল্লাহ সা:-এর জামানায় আমরা লোকদের মধ্যে পরস্পরকে প্রাধান্য দিতাম। আমরা হজরত আবু বকর রা:কে সবার উপরে প্রাধান্য দিতাম, তারপর হজরত ‘উমর ইবনুল খাত্তাব রা:কে এবং অতঃপর হজরত ‘উসমান ইবনে আফফান রা:কে। (সহিহ বুখারি)।
* আনাস ইবন মালিক রা: বলেন, ‘নবী সা: একদা হজরত আবু বকর, হজরত ‘উমর ও হজরত ‘উসমান রা:-সহ উহুদ পাহাড়ে আরোহণ করলে পাহাড় তাঁদের নিয়ে (আনন্দে) দুলতে থাকে। তখন নবী সা: বললেন, ‘হে উহুদ! স্থির থাক। কেননা তোমার উপরে একজন নবী, একজন সিদ্দিক ও দু’জন শহীদ আছে।’ (সহিহ বুখারি)।
* হজরত উকবা ইবন আমের রা: বলেন, মহানবী সা: বলেছেন, ‘আমার পরে যদি কেউ নবী হতো তাহলে উমর ইবনুল খাত্তাবই নবী হতো’ (তিরমিজি)।
* হজরত ‘আলী রা: বলেন, মহানবী সা: বলেছেন, ‘হজরত আবু বকর এবং হজরত ‘উমর রা: নবী-রাসূলগণ ছাড়া পৃথিবীর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত জান্নাতবাসী বয়স্ক লোকদের নেতা হবেন।’ (জামে তিরমিজি)।
* হজরত সাদ ইবন আবু ওয়াক্কাস রা: বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: ‘আলী রা:কে লক্ষ্য করে বলেছেন, হজরত মূসা আ:-এর কাছে হজরত হারুন আ:-এর যে মর্যাদা ছিল, তুমিও আমার কাছে সেই মর্যাদায় অভিষিক্ত। তবে আমার পরে কোনো নবী নেই।’ (সহিহ বুখারি)।

খিলাফতে রাশেদার বৈশিষ্ট্য
খিলাফতে রাশেদার ৩০ বছর শাসনকাল (৬৩২-৬৬১ খ্রি.) পর্যালোচনা করলে যে বৈশিষ্ট্যগুলো মানবজাতিকে বিমোহিত করে তা হচ্ছে :
(ক) খুলাফায়ে রাশেদিনের আমল বিশ্বনবী সা:-এর পবিত্র জীবনাদর্শ উজ্জ্বল প্রদীপে পরিণত হয়েছিল এবং তা সমগ্র পরিমণ্ডলকে নির্মল আলোকচ্ছটায় উদ্ভাসিত করে রেখেছিল। খলিফাগণের প্রতিটি কাজে ও চিন্তায় তার গভীর প্রভাব বিদ্যমান ছিল। চারজন খলিফাই মহানবী সা:-এর একান্ত প্রিয়পাত্র ও বিশিষ্ট সাহাবি ছিলেন। তাঁরা ছিলেন তাঁর সর্বাপেক্ষা বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত এবং তাঁর উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত প্রাণ। হজরত ‘আলী রা: ছাড়া আর তিনজন খলিফাই মহানবী সা:-এর দ্বিতীয় কর্মকেন্দ্র ও শেষ শয্যাস্থল মদিনায় রাজধানী রেখেই খিলাফতের প্রশাসনব্যবস্থা পরিচালনা করেছিলেন।
(খ) তাঁরা ছিলেন মুসলিম উম্মাহর সর্বাপেক্ষা অধিক আস্থাভাজন। আধুনিককালের পদ্ধতিতে নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচন হলেও তখন কেবল তাঁরাই যে সর্বাধিক ভোটে নির্বাচিত হতেন তাতে কোনো সন্দেহ ছিল না।
(গ) খিলাফতে রাশেদার আমলে আইন প্রণয়নের ভিত্তি ছিল কুরআন ও সুন্নাহ। যে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশ পাওয়া যেত না, সে বিষয়ে ইজতিহাদ করে সুষ্ঠু সমাধান বের করার চেষ্টা করা হতো এবং এ ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহয় পারদর্শী প্রত্যেক নাগরিকেরই মতামত দেয়ার সমান অধিকার স্বীকৃত ছিল।
(ঘ) খুলাফায়ে রাশেদিনের আমলে রাজকীয় ভোগবিলাস, জাঁকজমক ও শান-শওকতের কোনো স্থান ছিল না। খলিফাগণ একান্তই সাধারণ নাগরিকদের মতো জীবনযাপন করতেন। তাঁদের কোনো দেহরক্ষী ছিল না। লোকজন যখন ইচ্ছা খলিফার কাছে উপস্থিত হতে পারত।
(ঙ) খুলাফায়ে রাশেদিন বায়তুল মাল বা রাষ্ট্রের সরকারি কোষাগারকে জাতীয় সম্পদ ও আমানতের ধন মনে করতেন। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মঞ্জুরি ছাড়া নিজের জন্য একটি কপর্দকও কেউ ব্যয় করতেন না।
(চ) তাঁরা নিজেদেরকে জনগণের খাদিম মনে করতেন। কোনো ক্ষেত্রেই তাঁরা নিজেদেরকে জনসাধারণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ধারণা করতেন না। তাঁরা কেবল রাষ্ট্রীয় পর্যায়েই জননেতা ছিলেন না, নামাজ ও হজ প্রভৃতি ধর্মীয় ব্যাপারেও যথারীতি তাঁরাই নেতৃত্ব দিতেন।
মোটকথা, ধর্ম ও রাজনীতির পৃথকীকরণ এবং ধর্মীয় কাজ ও রাষ্ট্রীয় কাজে দ্বৈতবাদ যেমন আধুনিক পাশ্চাত্য গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য, অনুরূপভাবে এতদুভয়ের একত্রীকরণ ও সর্বতোভাবে একমুখীকরণই ছিল খিলাফতে রাশেদার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
হজরত আবু বকর রা: খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পর জাতির উদ্দেশে যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন তাতে তিনি বলেন, ‘হে মানবমণ্ডলী! আমি অপনাদের খলিফা নির্বাচিত হয়েছি, অথচ আমি আপনাদের কারো অপেক্ষা উত্তম ব্যক্তি নই। আমি ভালো কাজ করলে আপনারা আমার সহযোগিতা করবেন এবং বিচ্যুত হলে সহজ সরল পথে দাঁড় করিয়ে দেবেন। সত্য হলো আমানত এবং মিথ্যা হলো খিয়ানত। আপনাদের মধ্যকার দুর্বল ব্যক্তি আমার কাছে সবল যতক্ষণ আমি তার অধিকার পৌঁছে দিতে না পারি। আর আপনাদের মধ্যকার সবল ব্যক্তি আমার কাছে দুর্বল যতক্ষণ আমি তার কাছ থেকে অপরের অধিকার আদায় করে দিতে পারি। আপনাদের কেউ জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর কাজ ছেড়ে দেবেন না, এরূপ করলে সে জাতিকে আল্লাহ অপছন্দ করবেন। কোনো সম্প্রদায়ের ভেতরে অশ্লীলতার প্রসার ঘটানো যাবে না, তাহলে সবার ওপর আল্লাহ বিপদ চাপিয়ে দেবেন। আমি যতক্ষণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করি ততক্ষণ আমার আনুগত্য করবেন। আর যদি আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হই, তবে আমার আনুগত্যের প্রয়োজন নেই। আপনারা নামাজ আদায় করবেন। আল্লাহ আপনাদের প্রতি অনুগ্রহ করবেন।’
আমাদের উচিত তাদের আদর্শে আদর্শবান হওয়া।
লেখক : গবেষক


আরো সংবাদ