১৪ মে ২০২১
`

চাঁদের বুকে পা রেখেছিলেন সবশেষ যে নভোচারীরা

চাঁদের বুকে পা রেখেছিলেন সবশেষ যে নভোচারীরা -

 

চাঁদের বুকে শেষবার মানুষ নেমেছিল ১৯৭২ সালে। মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার ওই শেষ মুন মিশনে ছিলেন তিনজন নভোচারী। তাদের দু'জন চাঁদের মাটিতে নেমেছিলেন, আর একজন মূল চন্দ্রযান নিয়ে চাঁদ প্রদক্ষিণ করছিলেন।

চাঁদে অবতরণকারীদের একজন ছিলেন ভূতত্ত্ববিদ হ্যারিসন শ্মিট। চাঁদের বুকে তারা কিভাবে হেঁটে বেড়িয়েছিলেন, কী কী আবিষ্কার করেছিলেন- ওই গল্প হ্যারিসন শ্মিট শুনিয়েছেন বিবিসির লুইস হিদালগোকে ।

মার্কিন মহাকাশ সংস্থা চাঁদের বুকে শেষবারের মতো মানুষ পাঠিয়েছিল যে রকেটে করে, তার নাম ছিল এ্যাপোলো ১৭। তাতে ছিলেন তিনজন নভোচারী। রন এভান্স, কম্যান্ডার ইউজিন সারনান, এবং ভূতত্ত্ববিদ হ্যারিসন শ্মিট।

এখন পর্যন্ত তারাই চাঁদের বুকে পা-রাখা সর্বশেষ মানুষ।

চাঁদে মানুষের শেষ মিশনের পর এ্যাপোলো-১৭’র কম্যান্ড মডিউল প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করেন ১৯৭২ সালের ১৯ ডিসেম্বর।

হ্যারিসন শ্মিট বলেন, ‘আমার মনে হয় আমরা ‘প্রশান্ত মহাসাগরে নামার’ আগে পর্যন্ত একটুও চাপমুক্ত বোধ করতে পারিনি। নৌবাহিনীর যে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈনিকরা আমাদের উদ্ধার করে তাদের বলা হতো ফ্রগম্যান। সেখান থেকে আমাদের তোলা হলো হেলিকপ্টারে তার পর বিমানবাহী জাহাজে।’

‘সেখানে আমাদের অভিনন্দন জানানো হলো। তার পর আমাদের কেবিনে ঢুকে, এক গ্লাস পানি না খাওয়া পর্যন্ত আসলে রিল্যাক্স করা সম্ভব হয় না। কারণ তখনই আপনি অনুভব করবেন যে আপনি আর ওজনহীন পরিবেশে নেই।’

হ্যারিসন শ্মিট এবং তার সঙ্গী নভোচারীরা মোট ১৩ দিন কাটিয়েছিলেন মহাশূন্যে। সেটা ছিল এমন এক মিশন, যাতে খুব কম মানুষেরই এর আগে যাওয়া হয়েছে। আর তাদের পরে আর কারো যাবার সৌভাগ্য হয়নি।

‘পৃথিবীতে ফিরে আসার পর প্রথম বিশ্বাসই হতে চায় না যে মাত্র সাত দিন আগেই এ্যাপোলো-১৭ অবতরণ করেছিল ৪ লাখ কিলোমিটার দূরে, চাঁদের বুকে।’

আমেরিকার পূর্ব উপকুলে সময় তখন সন্ধ্যা ৫টা ৫৫ মিনিট, ঠিক ওই মুহূর্তে চাঁদের মাটিতে প্রথম পা রাখেন কম্যান্ডার জিন সারনান।

তিনি তার প্রথম বার্তায় বলেছিলেন, ‘চাঁদের মাটিতে এ্যাপোলো সেভেনটিনের প্রথম পদক্ষেপ। আমি এটা উৎসর্গ করতে চাই তাদের সবাইকে যারা এটা সম্ভব করেছেন। অবিশ্বাস্য!’

জিম সারনান শুরু করলেন চাঁদের বুকে তার পদচারণা। তাকে অনুসরণ করলেন হ্যারিসন শ্মিট। নাসার অন্য সব সহকর্মীর মতোই তিনি হ্যারিসন শ্মিটকে ডাকতেন জ্যাক বলে।

মজা করে জিম সারনান বললেন, জ্যাক যেন চন্দ্রযানটিতে তালা মেরে না দেন।

‘জ্যাক, ওটাতে আবার তালা মেরে দিও না। আমাদের আবার ফিরে যেতে হবে। তুমি যদি চাবিটা হারিয়ে ফেলো, তাহলে আমরা বিপদে পড়ে যাবো।’

জ্যাক জবাব দিলেন, ‘আমি তালা লাগাচ্ছি না।’

‘চল, হেঁটে হেঁটে জায়গাটা দেখি।’

শ্মিট বলেন, ‘আমরা যেখানে অবতরণ করেছিলাম সেটা প্রায় সাত কিলোমিটার চওড়া। এটা একটা উপত্যকা যার নাম দেয়া হয় ভ্যালি অব টরাস লিট্রো। এটা গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের চেয়েও গভীর। চার পাশে যে পর্বতগুলো, সেগুলো একেকটা দু'হাজার মিটার উঁচু। একটা বিস্ময়কর জায়গা।’

‘আমরা দেখলাম পাহাড়ের গায়ে ও শৃঙ্গগুলোয় সূর্যের আলো পড়ে সেগুলো ঝলমল করছে। দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের পাহাড়গুলোর ওপরের আকাশে পৃথিবীকে দেখা যাচ্ছে।’

চাঁদে দিনের বেলাও আকাশের রঙ কালো দেখায় কেন তা বলছিলেন শ্মিট।

‘সবচেয়ে অস্বাভাবিক ব্যাপার হলো, আকাশটার রং একেবারেই কালো। কারণ, চাঁদের তো কোনো বায়ুমণ্ডল নেই।’

‘আমরা আগে থেকেই জানতাম যে চাঁদ থেকে আকাশকে কালো দেখাবে। কিন্তু তবু উজ্জ্বল সূর্য, আর কালো আকাশ এরকম একটা দৃশ্যে অভ্যস্ত হওয়া বড় কঠিন।

হ্যারিসন শ্মিট হচ্ছেন বিশ্বের একমাত্র ভূতত্ত্ববিদ যিনি চাঁদে গিয়েছেন।

তিন দিন ধরে তারা চাঁদের বুকে নানা অনুসন্ধান কাজ চালালেন। তারা যেসব নমুনা সংগ্রহ করলেন, তা ছিল যেকোনো এ্যাপোলো মিশনের সংগ্রহের মধ্যে সবচেয়ে সমৃদ্ধ।

প্রথম দিনে তারা চাঁদের বুকে সাত ঘণ্টা কাটিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে চাঁদে তাদের অনুসন্ধানের স্থায়িত্বকাল ছিল ২২ ঘণ্টা।

‘লুনার মডিউল চ্যালেঞ্জার থেকে আমরা যতবারই বের হয়েছি, ওই সময়টা আমরা কী কী করবো তার খানিকটা ছিল পরিকল্পিত, আর বাকিটা তাৎক্ষণিকভাবে ঠিক করা। কারণ আপনি জানেন না ওখানে কি আছে।’

‘আমরা লুনার মডিউল থেকে তিনবার বের হয়েছি। আমরা বের করার চেষ্টা করেছি যে চাঁদের বুকে কী কী আছে, এবং অনেক সময়ই আমরা যা দেখতে পেয়েছি তা আমাদের বিস্মিত করেছে।’

তারা যা পেয়েছিলেন তার একটি ছিল এ্যাপোলো মিশনগুলোর প্রাপ্তির তালিকায় সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেটা ছিল কমলা রঙের মাটি।

চাঁদে যে একসময় সক্রিয় আগ্নেয়গিরি ছিল এটা তারই প্রমাণ।

‘তা ছাড়া, জ্বালামুখগুলোর একটির মধ্যে আমরা অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সৃষ্টি হওয়া কাচ পেয়েছি। আমাদের মনে হয়েছিল ওটা একটা আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ, তবে দেখে মনে হচ্ছিল যেন কিছু একটা এসে আঘাত করাতেই গর্তটা তৈরি হয়েছে।’

এসব কাচ সৃষ্টি হয়েছিল ৩০ হাজার কোটি বছর আগেকার অগ্ন্যুৎপাতের ফলে। এটা ছিল চাঁদ থেকে নিয়ে আসা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ নমুনাগুলোর একটি।

‘আমরা ভেবেছিলাম ওই জ্বালামুখে আমরা রঙিন কিছু দেখতে পাবো। কিন্তু বাস্তবে আমরা যা পেলাম তা ছিল অনেক অন্যরকম। তার পরেও এটা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

‘আজও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সাম্প্রতিক কয়েক বছরের গবেষণা এবং উন্নততর বিশ্লেষণী প্রযুক্তির মাধ্যমে ওই জিনিসগুলোর ভেতরে পানির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। সেটা ঠিক পৃথিবীর পানির মতো নয়। তাকে লুনার ওয়াটার বলা যায়।’

হ্যারিসন শ্মিট বলছেন, তিনি চাঁদে যাবার আগে সেখানে গিয়ে কী দেখতে পাবেন তা নিয়ে অনেক কিছু কল্পনা করেছিলেন।

কিন্তু তিনি চাঁদে যাবার পর যা দেখেছেন, তা তার সব কল্পনাকে ছাড়িয়ে গেছে। তারা অনেক মজাও করেছেন। চাঁদের বুকে হাঁটতে হাঁটতে গান গেয়েছেন।

শ্মিট বলছিলেন, ‘চাঁদের বুকে অবস্থানের অনুভূতিটা অনেকটা একটা বিরাট ট্রাম্পোলিনের ওপর হাঁটার মতো। সেখানে আপনার ওজন হয়ে যাবে পৃথিবীর তুলনায় ৬ ভাগের এক ভাগ। কারণ চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি হচ্ছে পৃথিবীর তুলনায় ৬ ভাগের এক ভাগ।’

‘কিন্তু আপনার শরীরের মাংসপেশী পৃথিবীতে ছাড়ার সময় যেরকম শক্ত ছিল সেরকমই থাকে। একারণে অনুভূতিটা হয় একটা বিরাট ট্রাম্পোলিনের ওপর হাঁটার মতো।’

‘চাঁদের বুকে দৌড়ানোর সময় অনুভূতিটা হয় অনেকটা স্কিইংএর মতো। যেন কেউ আপনাকে মাটি থেকে ঠেলে তুলে দিচ্ছে, বা আপনি লম্বা লম্বা করে পা ফেলে, মাটির ওপর দিয়ে ভেসে ভেসে যাচ্ছেন।’

চাঁদের বুকে সব নভোচারীই একই গন্ধ পেয়েছেন। গন্ধটা পোড়া বারুদের মতো।

যখন চাঁদ ছেড়ে যাবার সময় হলো, শ্মিটই প্রথম লুনার মডিউলে ঢুকেছিলেন।

তার পেছনে পেছনে ঢোকেন জিম সারনান। তিনি ঢোকার আগে চাঁদের বুকে দাঁড়ানো শেষ মানুষ হিসেবে এই বার্তা দেন।

‘চাঁদ থেকে বিদায় নেবার আগে বলছি, আমরা যেভাবে এসেছিলাম সেভাবেই চলে যাচ্ছি। ঈশ্বর যদি চান তাহলে আমরা আবার ফিরে আসবো। আমরা সমগ্র মানবজাতির পক্ষ থেকেই এ কথা বলছি।’

যখন লুনার মডিউল চাঁদের মাটি ছেড়ে শেষবারের মতো পৃথিবীর উদ্দেশে আকাশে উড়লো, হ্যারিসন শ্মিট তখন ইতিহাসের কথা ভাবেননি।

তিনি বলছেন, তিনি শুধু তার কাজের কথাই ভাবছিলেন। নিরাপদে আকাশে ওঠা, নিরাপদে বাড়ি ফেরা, একমাত্র ভাবনা ছিল এটাই।

‘তখন আমাদের ভাবনা ছিল, সবগুলো প্রক্রিয়া যথাযথভাবে করা হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করা। ইতিহাসের ভাবনা মনে এসেছে আরো অনেক পরে।’

‘যখন আমি কেবিনে নির্ভাবনায় আমার ডিনার খাচ্ছি, তখনই আসলে এটা ভাবার সময় হয় যে - এটাই শেষ মিশন। হয়তো তা না হলেই ভালো হতো, কিন্তু এটাই সিদ্ধান্ত হয়েছে।’

‘আমাদের এখন অপেক্ষা করতে হবে হয়তো কোনো এক সময় অন্য এক প্রজন্ম আবার চাঁদে যাবার সুযোগ পাবে।’
সূত্র : বিবিসি



আরো সংবাদ


গাজার তৃতীয় টাওয়ার ধ্বংসের পর আরো বেশি রকেট নিক্ষেপ হামাসের (১৭৫৬০)এবারের মতো ক্ষতির শিকার ইসরাইল আর কখনো হয়নি : হামাস (১৪১১৮)দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পাকিস্তানে ঈদ হচ্ছে আজই (১১০৩১)ইসরাইলের পক্ষে দাঁড়াল ভারত, জাতিসঙ্ঘে ফিলিস্তিনের ‘বিশেষ নিন্দা’ (১০২৩৭)ফিলিস্তিনিদের আরো শক্তিশালী সমর্থন দেবে ইরানের আইআরজিসি (৯৭০৭)এবার র‌্যামন বিমানবন্দরে হামাসের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা (৯৫৩২)ইসরাইলের পরমাণু কেন্দ্রের কাছে হামাসের ১৫ রকেট নিক্ষেপ (৮০৭০)ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ বন্ধে যে উদ্যোগ নিচ্ছে জাতিসঙ্ঘ (৬৪৭৭)হামাসের রকেট হামলায় বিমান চলাচলের পথ পরিবর্তন ইসরাইলের (৫৯৫১)এখনো মূল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করিনি : হামাস (৫৮৪৪)