৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ন ১৪২৯, ৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

হেপাটাইটিসকে জানুন

হেপাটাইটিসকে জানুন -

হেপাটাইটিস বি-ভাইরাস জনিত রোগ ও এর সংক্রামন এখন বিশ্বের অন্যতম বিপদজ্জনক রোগ হিসাবে চিন্নিহিত। প্রতি ১২ জনে ১ জন হেপাটাইটিস ‘বি’ বা ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত। আক্রান্ত ব্যক্তিদের অনেকে জানেনা তাদের শীররে এই ভাইরাস আছে কিনা বা থাকলেও তা কি অবস্থায় আছে। বিশ্বের প্রায় ৫০ কোটি মানুষ হেপাটাইটিস ‘বি’ বা ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত, যা শুনতে প্রায় অবিশ্বাস্য মনে হয়। প্রতি বছর ১৫ লাখ বা তার চাইতে বেশী মানুষ হেপাটাইটিস ‘বি’ বা ‘সি’ ভাইরাসের জটিলতায় যেমন লিভার ফেইলর, লিভার সিরোসিস, লিভার ক্যান্সার এ মারা যায়।
কারণ
হেপাটাইটিস এর অনেক কারণ রয়েছে, তারমধ্যে অন্যতম হলো ভাইরাস জনিত, মদ্যপান জনিত, মদ্যপান ছাড়া অন্য অন্য কারণে এবং ঔষধ যা লিভারের কোষকে নষ্ট করে। আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশী দেখা যায় ভাইরাস জনিত হেপাটাইটিস। আর ভাইরাসের মধ্যে অন্যতম হলো হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ই ভাইরাস। এর মধ্যে ‘এ’ এবং ‘ই’ ভাইরাস পানি বাহিত আর ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস রক্তবাহিত। ‘এ’ ভাইরাস ও ‘ই’ ভাইরাস স্বল্প মেয়াদী অর্থাৎ ‘একিউট’ সক্রামন করে যার কোন দীর্ঘ মেয়াদী প্রতিক্রিয়া নাই। আর ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস একিউট ই্নফেকশন করলেও এর মূল ক্ষতিকারক দিক হলো এরা যখন ক্রনিক পর্যায়ে যায় তখন লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
সংক্রমণ
হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস মারাত্মক সংক্রামক যা এইচ আই ভি (এইডস) এর চেয়ে প্রায় ১০০ গুণ সংক্রামক। সংক্রামিত ব্যক্তির দেহ থেকে রক্ত, বীর্য, এমনকি বুকের দুধেও ভাইরাস পাওয়া যায়।
ভাইরাস যুক্ত রক্ত গ্রহন করলে, আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত সিরিঞ্জ অন্য কারো শরীরে ব্যবহার করলে, ডাক্তার বা নার্সরা যখন আক্রান্ত ব্যক্তিকে অপারেশন বা ইনজেকশন দেয় আসাবধানতাবসত সেই সুচ ডাক্তার বা নার্সের শরীরে ঢুকে গেলে ছড়াতে পারে, আক্রান্ত মা থেকে শিশু ভূমিষ্ট হবার সময় শিশুর শরীরে এই ভাইরাস সংক্রমন হবার সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া একই সেভিং রেজার টুথব্রাস শেয়ার করলে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে।
আক্রান্ত হবার ঝুকি যাদের
হেপাটাইটিস বি ভাইরাস সংক্রামিত ময়ের গর্ভে জন্ম নেওয়া শিশু।
ড্রাগ সেবন কারী যারা ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করে।
বিপরীত বা একই লিঙ্গের সংঙ্গে অনিরাপদ যৌন মিলনকারীদের বা বহুগামী লোকদের মাধ্যমে।
কিডনী ডায়ালাইসিস এর রোগীদের।
হিমোফিলিয়া বা রক্ত রোগ জনীত রোগী যাদের রক্ত গ্রহন করতে হয় বার বার।
পরীক্ষা ছাড়া রক্ত গ্রহনকারী।
জীবানুমুক্ত না করে সার্জিক্যাল বা ডেন্টাল অস্ত্রোপাচার করলে।
হেপাটাইটিস এর লক্ষণ
শরীরের কোন লক্ষণ ছাড়াই যেমন হেপাটাইটিস হতে পারে আবার জন্ডিস বা চোখ, শরীর বা প্রশাব হলুদ হয়ে যেতে পারে, তাছাড়া হঠাৎ বমি বমি ভাব, বমি হওয়া, দুর্বলতা, ক্লান্তি বোধ করা, খাবারে অরুচী, অনীহা কিংবা তীব্র দুর্বলতা। শরীরে চুলকানি, কখনো জ্বরজ্বর ভাব বা জ্বরের মাধ্যমে সুত্রপাত হতে পারে। এমনকি পায়ে বা পেটে পানি চলে আসতে পারে । এছাড়া তীব্র ভাবে আক্রান্ত হয়ে রোগী অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারে।
কিভাবে রোগ নির্ণয় করা যায়?
লিভারের কার্য পরীক্ষা করে যেমন এসজিপিটি,এসজিওটি,সিরাম বিলিরুবিন, প্রথমবিন টাইম পরীক্ষার মাধ্যমে বুঝা যায় হেপাটাইটিস হয়েছে কি না। কি ভাইরাস দ্বারা সংক্রামন হয়েছে তা বুঝার জন্য ভাইরাসের এন্টিজেন বা এন্টিবডি পরীক্ষা করে ভাইরাস নিরুপন করা যায়।
হেপাটাইটিস ‘বি’ এর সারফেস এন্টিজেন পজিটিভ হলে বি ভাইরাস দ্বারা সংক্রামন হয়েছে বলে বুঝা যাবে। আর হেপাটাইটিস ‘সি’ এর এন্টিবডি পজিটিভ হলে বুঝা যায় সি ভইরাস দ্বারা হেপাটাইটিস হয়েছে।
চিকিৎসা
হেপাটাইটিসের লক্ষণ দেখা দিলে সংঙ্গে সংঙ্গে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নিশ্চিত হওয়া উচিৎ যে এটা হেপাটাইটিস এর লক্ষণ কিনা? যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হেপাটাইটিস শণাক্ত করে এর কারন জেনে চিকিৎসা শুরু করলে লিভারের বিকলতা বা মৃত্যুর হাত থেকে বা আশংকা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
প্রতিরোধের উপায়
১। হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসের টিকা শিশু থেকে সব বয়সের মানুষের অবশ্যই নেয়া উচিত।
২। রক্ত গ্রহণের আগে অবশ্যই পরীক্ষা করে নিতে হবে যে এই রক্ত ভাইরাস মুক্ত।
৩। ডিসপসিবল সুচ ও সিরিঞ্জ ব্যবহার করতে হবে।
৪। হেপাটাইটিস ‘বি’ পজিটিভ মায়ের শিশু জন্মের সাথে সাথে বাচ্চাকে টিকা ও এন্টিবডি দিতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে।
৫। ঝুকিপূর্ণ এবং অনৈতিক শারীরিক সম্পর্ক বা আচরণ পরিহার করতে হবে।
৬। ব্যক্তিগত ব্যবহার করা ট্রুথব্রাস, রেজর, নেইল কাটার ইত্যাদি অন্যকে অন্যকে ব্যবহারে নিষেধ করতে হবে।
৭। সেলুন, বিউটি পার্লারে নাক, কান ফোঁড়ানোর সময় বা চুল কাটার সময়, শেভ করা জীবানুমুক্ত জিনিসপত্র ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
৮। বাচ্চাদের হেপাটাইটিস ‘এ’ ভাইরাসের টিকা দিতে হবে।
৯। বিশুদ্ধ পানি ও খাবার গ্রহণ করতে হবে।
১০। মদ্যপান ও অন্যান্য নেশা জাতীয় দ্রব্য পরিহার করতে হবে।
১১। শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে।
১২। ডায়বেটিস ও হাইপারটেনশন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
১৩। চবিৃযুক্ত খাবার কম খেতে হবে আর শাক-সবজি ও ফল-মুল বেশী খেতে হবে এবং তা অবশ্যই হতে হবে ফরমালিন মুক্ত।

শেষ কথা ও বাংলাদেশ পেক্ষাপট
মানুষের শরীরে একটাই মাত্র লিভার যা একটা ভাইটাল বা অপরিহার্য অঙ্গ। এই অংগের অসুস্থাতার ফলাফল যেমন হতে পারে ভয়াবহ আবার লিভারের অসুখ যেমন হেপাটাইটিস ‘বি’ বা ‘সি’ সংক্রামন হলে সব কিছু শেষ হয়ে গেছে এমন ভাবার কোন কারণ নেই। সঠিক সময়ে এবং সঠিক চিকিৎসকের পরামর্শে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে সম্পূর্ন নিরাময় ও জটিলতা মুক্ত মোটামুটি স্বাভাবিক জীবন যাপন করা সম্ভব। এবং আশার কথা হলো বাংলাদেশেই এখন হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ এর বিশ্বমানের চিকিৎসক যেমন রয়েছে তেমন উন্নত বিশ্বের মত চিকিৎসা এখন দেশে বসে দেয়া সম্ভব হচ্ছে।

লেখক : জুনিয়র কনসালটেন্ট, আহছানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতাল, উত্তরা, ঢাকা


আরো সংবাদ


premium cement