২৩ জানুয়ারি ২০২২, ০৯ মাঘ ১৪২৮, ১৯ জমাদিউস সানি ১৪৪৩
`

রোগ প্রতিরোধে ড্রাগন ফল

-


পুষ্টিগুণে ভরপুর সুস্বাদু দেখতে খুবই সুন্দর, আকর্ষণীয় ও অত্যন্ত পুষ্টিকর ফল ড্রাগন। ছোট বড় সবার কাছে খুবই মজাদার একটি ফল। এ ফলটি খাদ্যকে শক্তিতে রূপান্তর, পেশি সংকোচন, হাড়ের গঠন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় এবং দেহের ডিএনএ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াগুলোতে অংশ নেয়। এটি খুবই স্বাদযুক্ত, প্রয়োজনীয় পুষ্টি, প্রিবায়োটিক ফাইবার সমৃদ্ধ ফল। এতে ভিটামিন বি, সি, ই, আঁশ, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম শর্করা ও খাদ্যশক্তি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। তাছাড়া এতে ক্যারোটিন লাইকোপিনের মতো অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট পাওয়া যায়। ড্রাগন বিদেশী ফল হলেও আমাদের দেশে প্রচুর চাষ হচ্ছে এবং বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
পরিচিতি : ড্রাগন ফল এক ধরনের ফণীমনসা (ঈধপঃঁং) প্রজাতির ফল। ড্রাগন ফলের গাছ দেখতে ক্যাক্টাসের মতোই। গাছ ১.৫ -২.৫ মিটার লম্বা হয়। ড্রাগন গাছে শুধুমাত্র রাতে ফুল ফুটে। ফুল লম্বাটে সাদা ও হলুদ রঙের। ফল ডিম্বাকৃতির উজ্জ্বল গোলাপি রঙের। ফলের ভিতর কালিজিরার মতো ছোট ছোট নরম বীজ থাকে। ড্রাগন ফলের ইংরেজি নামÑ চরঃধুধ বৈজ্ঞানিক নাম Ñ ঐুষড়পবৎবঁং ঁহফধঃঁং.
পুষ্টি উপাদান : প্রতি ১০০ গ্রাম খাবার উপযোগী ড্রাগন ফলের পুষ্টি উপাদান নিম্নরূপ : জলীয় অংশ ৮৭ গ্রাম, প্রেটিন ১.১ গ্রাম, চর্বি ০.৪ গ্রাম, শর্করা ১৩ গ্রাম, আঁশ ৭ গ্রাম, ভিটামিন সি ২১ মিলি গ্রাম, ভিটামিন বি-১ ০.০৪ মিলি গ্রাম, বি-২ ০.০৫ মিলি গ্রাম, বি-৩ ০.০১৬ মিলি গ্রাম, আয়রন ১.৯ মিলি গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৮.৫ মিলি গ্রাম, ফসফরাস ২২.৫ মিলি গ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম ১৮ মিলি গ্রাম, ভিটামিন ই ৪ মিলি গ্রাম, খাদ্যশক্তি ৬০ গ্রাম। তা ছাড়া এতে ওমেগা-৩ এবং ওমেগা-৯ পাওয়া যায়। জাত ও মাটির গুণাগুণের ওপর পুষ্টি উপাদান কম বেশি হতে পারে।
উপকারিতা : পুষ্টিগুণে ভরা সুস্বাদু ড্রাগন ফল। এ ফলের পুষ্টি উপাদান আমাদের দেহকে নানা রোগ নিরাময়ে সাহায্য করে সুস্থ ও সবল রাখে। ড্রাগন ফলে উচ্চ মাত্রায় ম্যাগনেসিয়াম আছে। যা হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমিয়ে রাখে। হাড়ের গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এর ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি পাওয়া যায়। যা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। তাছাড়া আরো যেসব রোগ নিরাময় সাহায্য করে তা নিম্নরূপ।
কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে : একটি ড্রাগন ফলে যে পরিমাণ আঁশ থাকে তা শরীরে জন্য খুবই উপকারী। এতে হজম শক্তি বৃদ্ধি পায় পাকস্থলীর কার্যকারিতা বাড়ে। এটি অন্ত্রের বর্জগুলোকে নরম করে পাকস্থলীকে পরিষ্কার রাখে। যাদের পায়খানা শক্ত হয় তাদের জন্য এ ফলটি খুবই উপকারী।
হার্টের উপকার করে : ড্রাগন ফলের শাঁস ও বীজ হার্টের জন্য খুবই উপকারী। এতে থাকা ওমেগা-৩, ওমেগা-৯, ফ্যাটি এসিড থাকে। এ উপাদানগুলো ব্যথা-ব্যথা নাশ করে। ফলে হার্টের রোগের ঝুঁকি ও জয়েন্টের ব্যথা কমে যায়।
হাড় গঠনে সাহায্য কারে : ড্রাগন ফলে ম্যাগনেসিয়াম বেশি থাকে। এ উপাদানটি হাড়ের ঘনত্ব বাড়ায় এবং হাড়ক্ষয় রোগ প্রতিরোধ করে। হাড়ের স্বাস্থ্য ঠিক রাখে ও শক্ত রাখে। যেসব মহিলার মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে বা মেনোপজ হয়ে গেছে তাদের হাড় ক্ষয়রোগ বেশি হয়। তাদের জন্য এ ফলটি খুবই উপকারী।
রক্ত সঞ্চালন ঠিক রাখে : ড্রাগন ফলে প্রচুর আয়রন পাওয়া যায় আয়রন দেহে হিমোগ্লোবিন তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। যা শরীরের কোষ কলাগুলোতে অক্সিজেন পৌঁছাতে লোহিত রক্ত কনিকাকে সাহায্য করে। ফলে দেহে রক্ত সঞ্চালন ভালো থাকে।
চুল পড়া প্রতিরোধ করে : দেহে আয়রনের অভাবে অনেক সময় মাথার চুল পড়ে যায়। নিয়মিত পরিমাণে ড্রাগন ফল খেলে দেহে আয়রনের পরিমাণ ঠিক থাকে এবং চুল পড়া সমস্যা কমে যায়।
রক্তশূন্যতা দূর করে : দেহ আয়রন অভাব দেখা দিলে শরীর রোগা রোগা ভাব দেখা দেয়। দেহ অত্যধিক দুর্বল হয়ে পড়ে, অলসতা দেখা দেয়, মাথা ব্যথা, হাত-পা ঠাণ্ডা থাকা ইত্যাদি রোগ দেখা দেয়। দেহে আয়রনের অভাবে এনিমিয়া রোগ দোখা দেয়। ড্রাগন ফল নিয়মিত খেলে রক্তশূন্যতা কমে যায় শরীর বলিষ্ঠ হয়।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় : ড্রাগন ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি পাওয়া যায়। এটি এন্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে তোলে। তাছাড়া ভিটামিন সি মুখের ঘা, দাঁতের মাড়ির সমস্যা কমিয়ে চর্মরোগ প্রতিহত করে। নানা ভাইরাসের হাত থেকে দেহকে বাঁচিয়ে রাখে।
ওজন কমায় : ড্রাগন ফলে যে পরিমাণ প্রোটিন বা আমিষ থাকে তা দেহের ওজন বাড়তে দেয় না, শরীরের জমা চর্বি গলিয়ে মেদ জমতে দেয় না।
ক্যান্সার প্রতিরোধ করে : ড্রগন ফলে প্রচুর পরিমাণে আঁশ, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন বি থাকে। এ ছাড়া এমন সব উপাদান এতে থাকে যা দেহের বিষাক্ত টক্সিন পদার্থগুলো দেহ থেকে বের করে দেয়। ফলে দেহে ক্যান্সার কোষ সৃষ্টি হয় না।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে : ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে সুগার বা চিনির পরিমাণ বেড়ে যাওয়াটা একটা বিরাট সমস্যা। ড্রাগন ফলের ভিটামিন ও খনিজ উপাদান রক্তের শর্করার পরিমাণ বা চিনিকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। শরীরে ইনসুলিন তৈরিতে সাহায্য করে।
ম্যাগনেসিয়ামের জোগান দেয় : এক কাপ ড্রাগন ফলে যে পরিমাণ ম্যাগনেসিয়াম থাকে তা দেহের প্রতিটি কোষে উপস্থিত মধ্যকার ৬০০টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নেয়। এ উপাদানটি খাদ্যশক্তিতে রূপান্তরিত করে। পেশি সংকোচন, হাড়ের গঠন, ক্রমোজমের গঠন ও দেহের বি এন এ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিক্রিয়াগুলোতে সাহায্য করে।
সতর্কতা : ড্রাগন ফল মজা পেয়ে বেশি খাবেন না। এতে ডায়রিয়া হতে পারে। কারো কারো ক্ষেত্রে ড্রাগন ফল খেলে পায়খানা পাতলা হতে পারে। এ ফল খাওয়ার দরুন যদি কোনো সমস্যা দেখা দেয় তাহলে এই ফল আর খাবেন না।
লেখক : শিক্ষক, ফুলসাইন্দ দ্বিপাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, গোলাপগঞ্জ, সিলেট


আরো সংবাদ


premium cement