৩০ নভেম্বর ২০২১, ১৫ অগ্রহায়ন ১৪২৮, ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরি
`

ক্যান্সার : নির্ণয় করুন শুরুতে

-

কার্সিনোমা (ক্যান্সার) শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার চিকিৎসাবিজ্ঞানী হিপোক্রিটাস। ক্যান্সার সম্বন্ধে জানা যায়, প্রাচীন মিসরের প্যাপিরাস নামক একটি কাগজে যাতে আটটি স্তন ক্যান্সারের বিবরণ ছিল। তখন থেকে মানুষ মনে করত ক্যান্সার দেব-দেবীর অভিশাপের ফসল। প্রাচীনকাল থেকেই ক্যান্সার মানুষের প্রাণঘাতী রোগ হিসেবেই পরিচিতি পেয়ে আসছে। প্রতি বছর ৭৬ লাখ লোকের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্যান্সার, যা মোট মৃত্যুর ১৩ ভাগ। প্রতিদিন বাড়ছে ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ জানে ক্যান্সার হলে মৃত্যু অবধারিত। কিন্তু সময়ের সাথে এগিয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞান। আবিষ্কৃৃত হয়েছে নিত্যনতুন চিকিৎসাপদ্ধতি। এখন ক্যান্সারের আছে অ্যানসার। ১৯৯০ সালের পর থেকে বিশ্বব্যাপী ক্যান্সার নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এমনকি তারা স্বাভাবিক জীবনযাপনও করছেন। এ জন্য প্রয়োজন মানসিক শক্তি, বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছা ও ক্যান্সার সম্বন্ধে সচেতনতা।
যেকোনো ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থভাবে কত দিন বেঁচে থাকবেন তা কতকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো টিউমারটি যে অঙ্গে প্রথম হয়েছে সেখানেই আছে নাকি অন্যত্র ছড়িয়ে পড়েছে। ২০০৪ সালে বিশ্বব্যাপী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে পাঁচ লাখ ১৯ হাজার নারী মৃত্যুবরণ করেন, যা মোট মৃতের শতকরা ১ ভাগ। অথচ এ ক্যান্সারটি শুরুতে নির্ণয় করতে পারলে মৃত্যুর হাত থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন নারীরা। গবেষণায় দেখা গেছে, স্তন ক্যান্সারের টিউমারটি যদি অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ার আগেই নির্ণয় করা সম্ভব হয় তবে রোগীর ১০ বছর বেঁচে থাকার হার শতকরা ৯৮.১ ভাগ, যদি আশপাশের লিম্ফনোডে ছড়িয়ে পড়ে তবে ৮৩.১ ভাগ আর যদি দেহের বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে তবে মাত্র ২৬ ভাগ। ক্যান্সার যত তাড়াতাড়ি নির্ণয় করা যায় ততই ভালো। শুরুতে নির্ণয় করতে পারলে ক্যান্সারের চিকিৎসা দিয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে পুরোপুরি সুস্থ করা সম্ভব হয়। কিন্তু রোগ নির্ণয়ে দেরি হয়ে গেলে চিকিৎসা করানো হলেও ভালো ফল পাওয়া যায় না। ফুসফুসের ক্যান্সারটি তার প্রমাণ। এ রোগটি নির্ণয় হয় একেবারেই শেষ সময়ে। তখন চিকিৎসকের করার কিছুই থাকে না। ১৯৯০ সালের আগেও এ ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তি রোগ নির্ণয় করার কয়েক মাসের মধ্যেই মারা যেত। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যাণে শুরুতে নির্ণয় করা গেলে এ ক্যান্সার আক্রান্ত ৫০ শতাংশ ব্যক্তি ৫ বছরের বেশি বাঁচতে পারে।
কোনো রোগকে অবহেলা করে বসে থাকা ঠিক নয়। অবহেলা করে রাখা রোগটি যে ক্যান্সার না সে ব্যাপারে নিশ্চয়তা নেই। এ জন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে দেরি করবেন না।

আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটি ক্যান্সারের জন্য সাতটি বিপদচিহ্ন ঘোষণা করেছে। এগুলো হলোÑ
১. স্তনে শক্ত চাকা বা শরীরের অন্য কোনো স্থানে শক্ত চাকা
২. শরীরের কোনো স্থানের ঘা যেটা সহজেই সারছে না
৩. হঠাৎ করে তিল বা আঁচিলে পরিবর্তন দেখা দেয়া
৪. দীর্ঘ দিন ধরে কাশি বা ভগ্ন কণ্ঠ
৫. মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা মাসিকের সময় ছাড়া অন্য কোনো সময় রক্তক্ষরণ ও মুখ, মলদ্বার বা অন্য কোনো স্থান দিয়ে নিয়মিত রক্তক্ষরণ
৬. দীর্ঘ দিন ধরে পেটের হজমে সমস্যা বা খাবার গলাধকরণে কষ্ট হওয়া
৭. প্রস্রাব-পায়খানায় পরিবর্তন।
এ সমস্যাগুলো দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়ার তাগিদ দিয়েছে তারা।

ক্যান্সার প্রতিরোধ করাই শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা। স্তন ক্যান্সার, জরায়ুমুখ ক্যান্সারের মতো প্রাণহারী ক্যান্সারগুলো কিন্তু স্ক্রিনিং পরীক্ষা করে নির্ণয় করে ক্যান্সারের হাত থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সম্ভব। জরায়ুমুখ ক্যান্সারে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস আক্রান্ত কোষগুলো ক্যান্সার কোষে পরিবর্তিত হতে কমপক্ষে আট বছর সময় লাগে। এ সময়ের মধ্যে ক্যান্সার নির্ণয় করা গেলে ক্যান্সার আক্রান্তরা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠা সম্ভব। ভায়ার মাধ্যমে এটি নির্ণয় করা যায়। ক্যান্সার থেকে রক্ষা পেতে হলে যৌনক্ষমতা বা যৌনমিলন শুরুর পর থেকে তিন বছরের মধ্যে প্রতিটি মহিলাকে একবার ভায়া করার সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারি সদর হাসপাতাল, মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও নির্বাচিত ইউনিয়ন সাব-সেন্টারে এ পরীক্ষা একেবারেই বিনামূল্যে করা হয়। এ ছাড়া প্যাপ স্মেয়ার করা যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মহিলা প্রতি বছর একবার প্যাপ স্মেয়ার করান তাদের এ ক্যান্সারে মারা যাওয়ার ঝুঁকি ৪১ শতাংশ কমে যায়।
স্তন ক্যান্সার নির্ণয়ে আপনি একজন চিকিৎসকের ভূমিকা পালন করতে পারেন। প্রতি মাসে মাসিক শুরুর ৭-১০ দিন পর বা মাসিক শেষ হওয়ার তিন দিন পর নিজে নিজে স্তন পরীক্ষা স্তন ক্যান্সার শুরুতে নির্ণয়ে অনেক ভূমিকা পালন করে। স্তন পরীক্ষার সময় স্তনে কোনো অস্বাভাবিকতা, স্তনে শক্ত চাকা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। মলের অকাল্ট ব্লাড টেস্ট, কোলনোস্কোপি কোলন ক্যান্সারের শুরুতে নির্ণয়ে সক্ষম।
ভ্যাকসিন ক্যান্সার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যকৃতের ক্যান্সারে প্রতি বছর প্রায় সাত লাখ লোক মারা যায়। এদের অর্ধেকই মারা যায় হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের কারণে যকৃতের ক্যান্সারের কারণে। অথচ শুধু হেপাটাইটিস টিকা দিয়েই এ ক্যান্সার প্রতিরোধ করা যায়। ১৯৯২ সালে চীনে এক কোটি ২০ লাখ লোক হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। এ ভাইরাসের কারণে চীনে ক্যান্সারের তালিকায় প্রথমে ছিল যকৃত ক্যান্সার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) চীনে এ ভাইরাসের টিকা ব্যাপকভাবে চালু করে। এখন চীনে যকৃত ক্যান্সার কমে গেছে অনেকাংশে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় দেখা গেছে, তিনটি টিকা দেয়ায় বিশ্বব্যাপী জরায়ুমুখ ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যা দুই-তৃতীয়াংশ কমে গেছে। ৯-২৫ বছর বয়সী নারীদের এ টিকা দেয়া হয়। তবে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের আগেই এ ভ্যাকসিন নেয়া দরকার, এতে ভ্যাকসিন ভালো কাজ করে। আমাদের দেশে ৪৫ বছর পর্যন্ত টিকা নেয়ার ব্যাপারে চিকিৎসকরা সুপারিশ করেন।
ধূমপান এখন তারুণ্যের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। ক্যান্সারের জন্য দায়ী কিন্তু এই ধূমপান। গবেষণায় দেখা গেছে ক্যান্সারের যত কারণ জানা গেছে তার মধ্যে ৩৩ ভাগই ধূমপান। এমন কোনো ক্যান্সার নেই যার সাথে ধূমপানের সম্পর্ক নেই। বিশ্বে ১৩ লাখ লোক মারা যায় ফুসফুসের ক্যান্সারে, বাংলাদেশে মোট ক্যান্সার রোগীর ২৫ ভাগ। এ ক্যান্সারের শতকরা ৯০ ভাগই ধূমপায়ী। সিগারেট-বিড়িতে ৬৫ রকমের বেশি ক্যান্সার করতে পারে এমন পদার্থ থাকে। অধূমপায়ীরা ধূমপায়ীদের মাধ্যমে ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। মদপানে বাড়ছে মুখ, গলা, যকৃত, খাদ্যনালী ও স্তনের ক্যান্সার। ৪ ভাগ ক্যান্সারের জন্য দায়ী মদপান। পান-সুপারি, জর্দা, তামাকপাতা বাংলাদেশে মুখ, গলা ক্যান্সারের অন্যতম কারণ। এ ক্যান্সার দেশের প্রধান পাঁচটি ক্যান্সারের একটি। শারীরিক পরিশ্রমের অনীহা, ফাস্টফুড, ছোটবেলা থেকে খেলাধুলার প্রতি অনাগ্রহে বাড়ছে মুটিয়ে যাওয়ার সংখ্যা। শুধু মুটিয়ে যাওয়ার কারণেই নারীর শরীরে দেখা দিচ্ছে জরায়ুর ক্যান্সার, স্তন ক্যান্সার, খাদ্যনালী ও পায়ুর ক্যান্সারসহ আরো ক্যান্সার। খাবারে ভেজাল, প্রিজারভেটিভ ও রঙিন খাবার, কম পরিমাণে ফলমূল ও শাকসবজি, আঁশজাতীয় খাবার খাওয়া ও অধিক পরিমাণে চর্বিজাতীয় খাবার ও ফাস্টফুডের কারণে বেড়ে যায় ক্যান্সারের ঝুঁকি। মোট ক্যান্সারের ৩০ ভাগই খাবারের সাথে জড়িত। পেশাগত কারণে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে আসার কারণে বিশ্বব্যাপী দুই লাখ লোক ক্যান্সারে মারা যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ, যৌনরোগ, বায়ুদূষণের কারণে বেড়ে যায় ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। এগুলো থেকেও নিজেকে রক্ষা করতে হবে।



আরো সংবাদ